১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য এশিয়ায় প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ৯১ বছর পর চুরি হয়ে যায় এ সম্মানজনক পুরস্কারের পদক। পুনরুদ্ধারের শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দেড় যুগেও সম্ভব হয়নি রবীন্দ্র নোবেল পদক উদ্ধার। নোবেল পদকের রহস্যাবৃত চুরি নিয়ে লিখেছেন বিপুল জামান
নোবেলপ্রাপ্তি
১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাহাজযোগে লন্ডন যাওয়ার কথা। কিন্তু অর্শ রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে পরিকল্পনা বাদ দিয়ে পদ্মা নদীতে নৌকায় বিশ্রাম নিতে শুরু করেন। এ সময় তিনি তার গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ থেকে কিছু কবিতা সহজ ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেন। পরে গীতাঞ্জলির ৫৩টি এবং গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়াসহ আরও নয়টি কাব্যগ্রন্থ থেকে ৫০টি সর্বমোট ১০৩টি কবিতার অনুবাদ নিয়ে একটি পা-ুলিপি তৈরি করেন। সেই পান্ডুলিপি সঙ্গে করে রবীন্দ্রনাথ ২৭ মে ১৯১২ বোম্বাই বন্দর থেকে বিলেত যাত্রা করেন। যাত্রাকালে আরও কিছু কবিতা অনুবাদ করে সংযোজন করেন। তিনি লন্ডনে পৌঁছান ১৬ জুন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় চিত্রশিল্পী স্যার উইলিয়াম রদেনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে। তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্পর্কে অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই ভ্রমণে শিল্পী রদেনস্টাইনের সঙ্গে দেখা ও আলাপের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই হয়তো তিনি কবিতাগুলো অনুবাদ করেছিলেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে লন্ডনে ইন্ডিয়া সোসাইটি গ্রন্থটি প্রকাশ করে। রদেনস্টাইন মারফত কিছু কবিতা পড়ে কবি ইয়েটস ভূয়সী প্রশংসা করেন। সং অফারিংস-এর ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং কবি ইয়েটস। এ ভূমিকাটি ছিল একই সঙ্গে আন্তরিক ও যথেষ্ট প্রশস্তিমূলক। গ্রন্থটি প্রকাশের আগে তিনি সম্পাদনা ও প্রুফেও সহযোগিতা করেছিলেন। কবিতাগুলো অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ বেশ স্বাধীনতা নিয়েছিলেন। আক্ষরিক তো নয়ই বরং ভাবানুবাদের ওপরই জোর দিয়েছেন বেশি। লেখক ও অনুবাদক একই ব্যক্তি হওয়ায় স্বাধীনতাও ছিল। কখনো কবিতাংশ সংক্ষেপিত করা হয়েছে কখনো বা স্রেফ ভাবার্থ করা হয়েছে; কেবল কবিতার ভাবসম্পদ অক্ষত রাখা হয়েছিল। ৩০ জুন রদেনস্টাইন তার বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের এই কবিতাগুলো পাঠের ব্যবস্থা করেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রদেনস্টাইন ও ইয়েটস ছাড়াও মে সিনক্লেয়ার, আর্নেস্ট রাইস, চার্লস ট্রেভেলিয়ান ও চার্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুজ প্রমুখ। এরপরে কয়েকটি নৈশভোজের ব্যবস্থা হয় এবং রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিত হন। এদের মধ্যে জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ জি ওয়েলস, বার্ট্রান্ড রাসেল, জন গলসওয়ার্দি, রবার্ট ব্রিজেস, জন মেস ফিল্ড, স্টার্জ মুর, ডাব্লিউ এইচ হাডসন ছিলেন উল্লেখযোগ্য। ইয়েটস গীতাঞ্জলি থেকে কয়েকটি কবিতা পড়েছিলেন যা উপস্থিত সবাইকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এর পরে রবীন্দ্রনাথকে উপলক্ষ করে কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ১০ জুলাইয়ের ট্রুকেডেরো রেস্টুরেন্টের আয়োজনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রদেনস্টাইন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ডব্লিউ বি ইয়েটস। এতে আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন এইচ জি ওয়েলস, জে ডব্লিউ ম্যাকেইল (অক্সফোর্ডের প্রফেসর), হার্বার্ট ট্রেনচ (আইরিশ কবি ও নাট্যকার), জে ডি এন্ডারসন (কেমব্রিজের বাংলা প্রভাষক), টি ডব্লিউ আরনল্ড (ইন্ডিয়া অফিসে কর্মরত এবং ইংল্যান্ডে ভারতীয় ছাত্রদের উপদেষ্টা), আর ভন উইলিয়ামস (রয়্যাল কলেজ অফ মিউজিকের প্রফেসর), টি ডব্লিউ রলস্টন (ডাবলিন ইউনিভার্সিটি রিভিউয়ের এডিটর) প্রমুখ। সেখানে রবীন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সবাই গভীরভাবে প্রভাবিত হন। ১৩ নভেম্বর ১৯১৩-তে তাকে নোবেল প্রাইজে ভূষিত করা হয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সে খবর পান দুইদিন পরে। ১৫ নভেম্বর, ১৯১৩ তারিখে তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনে, বোলপুরে। দিনেন্দ্রনাথ ও রথীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবি চৌপাহাড়ির শালবনে ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এমন সময় কলকাতা থেকে তারবার্তা মারফত খবর এলো রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ সং অফারিংস-এর জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন! এই নোবেল পুরস্কার শুধু সাহিত্যেই নয়, পুরো উপমহাদেশ নয় বরং এশিয়া মহাদেশের জন্যই ছিল প্রথম নোবেল!
নোবেল চুরি
নোবেল প্রাপ্তির ৯১ বছর পরে বাঙালির এই গর্বের ধন বিশ্বকবি নির্মিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা থেকে চুরি যায়। ২৫ মার্চ ২০০৪, বৃহস্পতিবার। বুধবার বন্ধ থাকে বিশ্বভারতী। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় খুলতেই সবার চোখে পড়ল নোবেল প্রাইজ নেই, নেই আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
প্রতিদিনের মতো কর্মচাঞ্চল্যে মেতে উঠেছিল শান্তিনিকেতন। যথারীতি ক্লাস করছিল ছাত্ররা। হঠাৎ বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়ল নোবেল চুরি হয়েছে। সবাই ছুটল রবীন্দ্রনাথের বাড়ি উত্তরায়নের দিকে। উত্তরায়নেই ছিল এ রবীন্দ্র সংগ্রহশালা। সংগ্রহশালার কর্মচারীরা যখন ভবনের দ্বার খোলেন তখনই সবার চোখে পড়ে ব্যাপারটা। শুরু হয় হৈচৈ। গোটা রবীন্দ্র ভবন ঘিরে ফেলে পুলিশ। কিন্তু তাতে লাভ কী? ততক্ষণে হয়েছে গেছে যা হওয়ার। চুরি গেছে নোবেল পুরস্কারের পদক, ওঁ লেখা সোনার আংটি, রবীন্দ্রনাথের প্রিয় সোনার পকেটঘড়ি, জামার সোনার বোতাম, কাফ লিঙ্ক, মৃণালিনী দেবীর বালুচরি শাড়ি, সোনা-বাঁধানো নোয়া, রুপোর রেকাবি, রুপোর কফি কাপ, সামুরাই তরবারি, কফি কাপ রাখার তেপায়া, চৈনিক চামচ, কোবে শহর থেকে পাওয়া হাতির দাঁতের ঝাঁপিসহ আরও ৩৭টি মূল্যবান স্মারক। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কবির ৭০তম জন্মদিনে ৪৯২ গ্রামের স্বর্ণফলক দিয়েছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। ফলকটির ডিজাইন করেছিলেন নন্দলাল বসু। লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখার্জির মেয়ে কমলাদেবীর নামে ছিল স্বর্ণপদক। সামুরাই তরবারিটি রবীন্দ্রনাথের ভাইপো সুরেন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন জাপানি শিল্পী কাকুজাও কাকুরা।
মুহূর্তেই সাড়া পড়ে গেল সমগ্র ভারতে। ক্ষোভে ফেটে পড়ল সবাই। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি জনসম্মুখে গভীর দুঃখপ্রকাশ করে জানালেন যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পদক পাওয়া যাচ্ছে না। বিরোধীদলীয় নেত্রী মমতা ব্যানার্জি দাবি জানালেন, নোবেল প্রাইজ চাই! প্রখ্যাত লেখক নবনীতা দেব সেন বললেন, আমি বিস্মিত, বিমূঢ়। এমন যে হতে পারে সে তো কল্পনার বাইরে। যেখানে ছিল যে প্রতিষ্ঠানে ছিল সেখানে যে এমন তীব্র নিরাপত্তার অভাব পড়েছিল, সেখান থেকে যে, যে কেউ চুরি করে নিয়ে যেতে পারে এ ঠিক ভাবা যায় না। কবি, ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, নোবেল চুরির কলঙ্ক আমাদের বুকে ভার হয়ে রয়েছে। কোনো উচ্চস্তরের ষড়যন্ত্র এর জন্য দায়ী বলে মনে হয়। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার গৌতম ঘোষ বললেন, রবীন্দ্রনাথই তো চুরি হয়ে গেছেন অনেকদিন আগে বা তার আদর্শ বা তার চিন্তাভাবনা। নোবেল পদকটা তো একটা প্রতীক। কিন্তু কোথায় গেলেন রবীন্দ্রনাথ, তার চিন্তাভাবনা তার আদর্শ। অনেকেই বিশ্বভারতীর তৎকালীন উপাচার্য সুজিত কুমার বোস ও প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির পদত্যাগের দাবিও তুলেছিলেন। কবি শঙ্খ ঘোষ এ ঘটনাকে ‘জাতীয় সর্বনাশ’-এর অভিধা দিলেন। অমর্ত্য সেন, মহাশ্বেতা দেবী ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে উদ্ধারের দাবি জানান। বিশ্বভারতী আচার্য ও প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে তৃণমূল কর্মীরা অনশনে বসেন। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এ চুরির ঘটনাকে ভয়ংকর হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। তিনি বললেন, ‘আমরা অবশ্যই এই কালপ্রিটদের গ্রেপ্তার করে নোবেল প্রাইজ ফেরত আনব। তা যেকোনো মূল্যেই হোক!’ রাষ্ট্রপতি আবুল কালাম আজাদ উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। চলল নানা তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ। কিছুদিন পর যখন তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখা গেল না তখন পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সব স্বর্ণকারদের অনুরোধ জানানো হয় তারা যেন নোবেল গলিয়ে না ফেলেন। বিশ্বভারতীর উপাচার্য সুজিত কুমার বসু চোরদের কাছে আবেদন জানালেন, ‘ওরা ওই সব মূল্যবান বস্তু আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিক ওদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। ওদের পরিচয় গোপন রাখা হবে, এটা জাতীয় লজ্জা।’
যেভাবে চুরি হলো
চুরির দিন ২৫ মার্চ ২০০৪ বুধবার ছিল শান্তিনিকেতনের ছুটির দিন। মঙ্গলবার দুপুর ১টায় বন্ধ হয়ে যায় শান্তিনিকেতন। বৃহস্পতিবার রবীন্দ্র ভবন খুলতেই ধরা পড়ে চুরির ঘটনা। মঙ্গলবার বিশ্বভারতী বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই চোরেরা ভেতরে ঢুকে অবস্থান নেয়। সারা রাত ধরে মালপত্র সরাতে থাকে।
রবীন্দ্র ভবনের পেছনের জানালা ভেঙে ফেলে চোর, দেয়ালের নিচে পাওয়া যায় ভাঙা গ্রিল। এই জানালা দিয়ে মালপত্র সরিয়ে নেয়। পুলিশ বলে, চোর জানালা দিয়ে ঢোকেনি। কারণ, সে ক্ষেত্রে জানালার পাল্লা ভেঙে ফেলতে হতো। উত্তরায়নের এই বিশাল এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র দুজন এনডিএফ কর্মী। পাওয়া গেছে ২৮ জোড়া পায়ের ছাপ। তার মধ্যে আবার দুজনের পায়ে চটি ছিল। ২৮ জোড়া পায়ের ছাপ। তার মধ্যে আবার দুজনের পায়ে চটি ছিল। সিআইডি আইজি ভুপেন্দর সিং বলেন, চোর একজন না একাধিক, আর চটি প্রমাণ করে এরা স্থানীয়।
তদন্ত
২০০৪ সালে ঘটা এই চুরির রহস্য আজও খোলাসা হয়নি। দীর্ঘদিন এই কেসের তদন্ত করে সিবিআই। দীর্ঘ নয় বছর তদন্ত করেও কোনো সুরাহা করতে না পারায় আদালত তাদের তীব্র ভর্ৎসনা করে। কেস সমাধানে অপারগতা স্বীকার করে তারা ক্ষান্ত দেয়। এরপরে রাজ্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু সেখানেও কোনো আশার আলো দেখা যায়নি। চুরি যাওয়া জিনিসপত্র বা চোরের কোনো তথ্য দিতে পারলে যেহেতু পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল তাই প্রচুর ভুয়া ফোনকল আসত। সে সবের সাক্ষীপ্রমাণ যাচাই বা তদন্ত করতে হতো। এমনও দেখা যেত যে, প্রতিহিংসাবশত কেউ হয়তো অন্য কারও নাম দিয়ে দিল। পুলিশ তদন্ত করতে শুরু করল। কিছুদিন পরে দেখা গেল, না, এ চোর নয়, চুরির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। নষ্ট হতো মূল্যবান সময়। সেই ফাঁকে চোর হয়তো চলে গেছে হাতের বাইরে।
প্রায় ১২ বছর পর নোবেল চুরির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল সিবিআই, সিআইডি এবং রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের গঠিত সমন্বিত সেল। ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরির বিষয়ে সমন্বিত সেলের তথ্যের বরাত দিয়ে এ সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া। পত্রিকাটি সিআইডি সূত্রের বরাতে জানায়, নোবেল পাচারের ‘নাটের গুরু’ ছিলেন বাংলাদেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ী মুহাম্মদ হোসেন শিপলু এবং ভারতীয় ব্যবসায়ী জীবন সিং। এ ছাড়া ওই দুজনের সঙ্গে এক ইউরোপীয় পাচারকারীরও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল বলে জানান ওই সিআইডি কর্মকর্তা। এ ছাড়া টেলিফোন রেকর্ড এবং অন্যান্য সূত্রে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন শান্তিনিকেতনে বসে চুরির ছক কষে ওই ‘নাটের গুরু’ চোরাচালান চক্রের অন্যদের জানায়।
প্রাথমিকভাবে ওই ব্যক্তি জার্মানি বা ইউরোপের অন্য কোনো দেশের নাগরিক বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের। ওই আন্তর্জাতিক পাচারকারী দলের লক্ষ্য ছিল, চোরাপথে নোবেল এবং অন্য প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো পাচার করে প্রথমে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া। সেখান থেকে নোবেল চোরাপথে ইতালি বা জার্মানির মতো ইউরোপের কোনো দেশে পাচার হয়েছে বলে ধারণা ভারতের গোয়েন্দাদের।
২০১৬ সালের নভেম্বরে কলকাতার পত্রিকাগুলোয় ‘‘অবশেষে রবীন্দ্রনাথের ‘নোবেল চোর’ গ্রেপ্তার’’ শিরোনামে একটি খবর বেরোয়। ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার চুরির ঘটনায় দায়ে প্রদীপ বাউরি নামে এক বাউল শিল্পীকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় তারা। বিশেষ তদন্তকারী শাখার পক্ষ থেকে পত্রিকাগুলোকে জানানো হয়েছিল, তারা প্রায় নিশ্চিত যে ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ নোবেল-চুরির ঘটনার সঙ্গে প্রদীপ বাউল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুধু তাই নয়, ওই ঘটনায় বাকি অভিযুক্তদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন প্রদীপ। চোরদের পালানোর সুযোগও তিনিই করে দিয়েছিলেন। তার কাছ থেকেই জানা যায় এ অপরাধের মাস্টারমাইন্ড বাংলাদেশের মুহাম্মদ হোসেন শিপুল এবং ভারতের জীবন সিং। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত শান্তিনিকেতন থানার রূপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন প্রদীপ বাউরি। সিআইডি অফিসারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নার্কো অ্যানালিসিস টেস্টের জন্য গুজরাটে নিয়ে যাওয়া হবে প্রদীপকে। কিন্তু এর পরের অগ্রগতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। আজও উদ্ধার হয়নি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চুরি যাওয়া নোবেল। ২০০৫ সালে নোবেল কমিটি একটি সোনার ও একটি রুপার নকল নোবেল পদক দেয় বিশ্বভারতীকে, প্রদর্শনের জন্য। নকল পদক দেখেই তৃপ্ত হতে হচ্ছে তাই এখনো দর্শনার্থীদের।
এই ঘটনা নিয়ে নানাভাবে চর্চা হয়েছে। সাধারণ থেকে ওপর মহল পর্যন্ত সবখানেই নোবেল চুরি নিয়ে বেশ উত্তেজনা লক্ষ করা গেছে। নির্মিত হয়েছে সিনেমাও। কলকাতার চিত্রপরিচালক সুমন ঘোষ নোবেল চুরির গল্প নিয়ে ২০১২ সালে নোবেল চোর নামে একটা সিনেমাও নির্মাণ করেছেন। সেখানে মূল ভূমিকায় অভিনয় করেন মিঠুন চক্রবর্তী।
আবারও নোবেল চুরি
২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৈলাশ সত্যার্থীর বাড়িতে চোর ঢোকে। অন্য মূল্যবান জিনিসপত্রের সঙ্গে চুরি যায় নোবেল পদকটিও। কৈলাশ সত্যার্থী শিশুদের জন্য তার অনন্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে ২০১৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। নোবেল পদক চুরির ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ২০০৪ সালে বিশ্বভারতীর চুরির কথা আবারও সামনে আসে। শোকে নিমজ্জিত হয় ভারতবাসী। কিন্তু কৈলাশ সত্যার্থীর এক কথাতে বুকের পাথর নেমে যায় তাদের। কৈলাশ জানান, তার বাড়িতে যেটা ছিল সেটা স্রেফ নোবেল পদকের ডামি। আসলটি রয়েছে রাষ্ট্রপতির সংগ্রহশালায়। জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে নোবেল পদকটি তিনি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি সেটি সংগ্রহশালায় রেখেছিলেন। ফলে এ যাত্রা ভারতবাসী আরেকটি নোবেল পদক হারানো থেকে রেহাই পায়।
তবে শুধু ভারতেই নয়, নোবেল পদক চুরির ঘটনা ঘটেছে আরও কয়েকবার। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবাদপ্রতিম আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটুর নোবেল পদকও চুরি হয়েছিল। কিন্তু চুরি হওয়ার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। টুটু বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া আরেক নোবেল বিজয়ী ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের পুরস্কারটি গাজা শহরের বাসভবন থেকে লুট করে তার বিরুদ্ধবাদী সংগঠন হামাস। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিজ্ঞানী আরনেস্ট ও লরেন্সের নোবেল পদকখানাও চুরি হয়ে যায়। সেটির খোঁজও পাওয়া যায়নি। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী কাই মিলারের নোবেলটিও দুষ্কৃতকারীরা চুরি করে নিয়ে যায়। তবে মিলারের নোবেল চোর ধরা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয়নি বাঙালির।
