শতবর্ষে রণজিৎ গুহ

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ০১:০৮ পিএম

ঐতিহাসিক রণজিৎ গুহ সোমবার ৯৯ বছর পূর্ণ করলেন, সঙ্গে পা রাখলেন শতবর্ষে। যিনি সমকালে ভারতীয় প্রভাবশালী চিন্তাবিদদের অন্যতম, যারা নিজেদের কাজ দিয়ে বৈশ্বিক পরিচিত পেয়েছেন।

শতবর্ষে রণজিতের সাবেক ছাত্র ও সহযোগী দীপেশ চক্রবর্তী এক লেখায় তাকে ‘বাঙালির জন্য ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন। আর নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তো আগেই বলে দিয়েছেন, ‘বিশ শতকের সবচেয়ে সৃজনশীল ভারতীয় ঐতিহাসিক’।

রণজিৎ দুই দশক ধরে অস্ট্রিয়ায় অবসর জীবনযাপন করছেন, এর আগে কয়েক দশক ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি আমাদের স্মৃতির বাইরে রয়ে গেছেন বা চর্চার মধ্যে নেই। বরং তার একাডেমিক কাজগুলো সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পঠিত হচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে নতুন চিন্তা ও তত্ত্বের অভিমুখ খুলে দিচ্ছে।

এটা বিরল নয় যে, বাংলাদেশে রণজিৎ গুহ খুবই পঠিত। বিশেষ করে তার ‘সাবঅলটার্ন তত্ত্ব’ এখনও বাংলাদেশি প্রগতিশীল চিন্তকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।

শুধু বাঙালি নয়, রণজিতের বাংলাদেশ যোগও রয়েছে। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া জানায়, ১৯২৩ সালের ২৩ মে বরিশালের বাখেরগঞ্জের সিদ্ধকাটি গ্রামে তার জন্ম। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রে তালুকদার ছিল গুহ পরিবার। তিনি লিখেছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শ্রেণি-পরিচিতির গ্লানি তার মনে গেঁড়ে বসে; যার বীজেই পরবর্তী জীবনের ইতিহাস-ভাবনার উন্মেষ।

রণজিৎ কলকাতায় এসে সিপিআই-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র থাকাকালে ১৯৪৭ সালে ডিসেম্বরে প্যারিসে বিশ্ব ছাত্র সম্মেলনে যোগ দেন। এরপর সাইবেরিয়া, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও চীন বিপ্লব স্বচক্ষে জরিপ করেন তিনি দলের প্রতিনিধি হিসেবে।

১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত অনুপ্রেবেশের বিরোধিতায় তিনি দল ছাড়েন। তত দিনে অবশ্য তার লেখালেখি শুরু হয়ে গেছে। দলীয় মুখপত্রে ‘মেদিনীপুরের লবণশিল্প’ নামে একটি লেখা লেখেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পেছনের তাত্ত্বিক ভাবনা নিয়ে লেখেন অসম্পূর্ণ ধারাবাহিক।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কাল পড়ান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে গবেষণার ইচ্ছা থাকলেও নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ তাকে ছাত্র হিসেবে নেননি। পরে রণজিৎ পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডের সাসেক্সে। সেখানকার গবেষণা ‘আ রুল অফ প্রপার্টি’ নামে পরে প্রকাশিত হয়।

১৯৮০ সালে সাবঅলটার্ন তত্ত্ব নিয়ে হাজির হলেন রণজিৎ গুহ, পরের বছর থেকে তা অক্সফোর্ড প্রকাশও করতে থাকল। তার মতে, ভারতীয় ইতিহাস-লিখন এক বদ্ধতায় পর্যবসিত হয়েছে। কেন না তা উচ্চবর্গকে স্বতঃসিদ্ধ আলোচনা-বিষয় হিসেবে ধরে নেয়। গুহর বিকল্প: নিম্নবর্গের দিকে ইতিহাসকারকে চোখ ফেরাতে হবে। তার ব্যক্তিক চৈতন্য, বিদ্রোহী মানস ও আদিসত্তার প্রকরণগুলো আলোকপর্বের গোঁড়ামো কাটিয়ে ইতিহাসবিদকে পড়তে হবে।

গুহর প্রস্তাবিত সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীতে অধিকাংশই ছিলেন পিএইচডি-ও না করা ছাত্ররা। পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভদ্র, দীপেশ চক্রবর্তী, শাহিদ আমিন, ডেভিড আর্নল্ড ও ডেভিড হার্ডিম্যান ছিলেন এই দলে। পরে কিছুকালের জন্য ছিলেন সুমিত সরকারও।

রণজিৎ গুহ আশির দশকে বেশ কিছু আলোড়ন-তোলা লেখা লিখলেন। গ্রামশি, ফুকো, রলা বার্ত ও ক্লদ লেভি স্ত্রসের গঠনবাদের ভিত্তিতে নিজের কিছু টিপ্পনী যোগ করে, অসম ক্ষমতা-সম্পর্কের একটি কাঠামো তৈরি করলেন। শুধু ভারত নয়, জাপান বা ল্যাটিন আমেরিকাতেও এই সাবঅলটার্ন শাখা ছড়িয়ে পড়ে। পরে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বিতর্কে যোগ দেন, সাবঅলটার্ন কর্তৃত্ব ও এলিট আধিপত্যের নয়া সমালোচনা করেন তিনি।

নব্বই দশকের আগেই রণজিৎ গুহ নৃতত্ত্ব পড়াতে ক্যানবেরায় পাড়ি জমালেন। সাবঅলটার্ন গোষ্ঠীর কুশীলব চরিত্র থেকে অবসরও নিলেন। ধীরে ধীরে ভাষাদর্শন নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েন।  বিষয়মাধ্যম হিসেবে উঠে এল বাংলা ভাষা, ভাবনায় এলেন জীবনানন্দ বা সমর সেন। প্রাচীন ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব, হাইডেগারের প্রপঞ্চদর্শন ও হেগেলের ভাববাদ ততদিনে তার প্রিয় বিষয়। নতুন শতকে একে তিনি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অবসরে কাটাতে চলে যান। তবে থেমে থাকেনি লেখালেখি।

তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে আ রুল অফ প্রপার্টি, ইলিমেন্টারি অ্যাসপেক্টস অব পেসেন্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, হিস্ট্রি অ্যাট দ্য লিমিট অফ ওয়ার্ল্ড-হিস্ট্রি, আন ইন্ডিয়ান হিস্টিরিওগ্রাফি অব ইন্ডিয়া: আ নাইন্টিথ সেঞ্চুরি, ডমিন্যান্স উইথআউট হেজেমোনি: হিস্ট্রি অ্যান্ড পাওয়ার ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া, দ্য স্মল ভয়েস অব হিস্ট্রি,  রামমোহন রায় ও আমাদের আধুনিকতা, প্রেম না প্রতারণা, কবির নাম ও সর্বনাম এবং ছয় ঋতুর গান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত