নারী বডিবিল্ডার শুনে বিচারকরাই অবাক হয়েছিলেন

আপডেট : ০৩ জুন ২০২২, ১১:২১ পিএম

বাংলাদেশের নারী বডিবিল্ডিংয়ে মাকসুদা আক্তার মৌ হলেন পথিকৃৎ। মুম্বাইয়ে আইএইচএফএফ অলিম্পিয়া অ্যামেচার বডিবিল্ডিংয়ে প্রথমবার অংশ নিয়ে পদক জিতে সারা ফেলেছিলেন। সেই সাফল্যের গল্প আর বডিবিল্ডার হওয়ার চ্যালেঞ্জের কথা শুনলেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ

এত কিছু থাকতে বডিবিল্ডিংয়ে কেন এলেন?

মৌ : শুরুতেই বডিবিল্ডার হব এমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। প্রথমে ব্যায়াম করার জন্য জিমে যাওয়া শুরু করি। আসলে ফিটনেস ধরে রাখার ইচ্ছা থেকে এক্সারসাইজ করতাম। এরপর ভালো লাগতে থাকে। পরে দেখলাম বডিবিল্ডিং একটা গেম। আমাদের দেশে যদিও এর খুব প্রচলন নেই বা ছিল না। ইদানিং খেলাটা হলেও ঠিকভাবে হয় না। কিন্তু বাইরের দেশগুলোতে এটা খুব জনপ্রিয় খেলা। তাই ভাবলাম আমি যদি দেশে বডিবিল্ডিং শুরু করি তাহলে অনেক কিছু করা সম্ভব। এসব ভেবে বডিবিল্ডিংয়ে আসা।

বডিবিল্ডার হওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে কী কী চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে?

মৌ : বডিবিল্ডিংয়ের জন্য প্রচুর শক্তি দরকার। তাই শুরুর দিকে স্ট্রেন্থ বিল্ডিং করাটা ছিল খুব চ্যালেঞ্জিং। আসলে আমরা এমন একটা দেশ বা সমাজে থাকি যেখানে মেয়েরা সাধারণ খেলাধুলা কিংবা শরীরচর্চার সুযোগও পায় না। আমাদের দেশে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনাকে যত গুরুত্ব দেয় শরীরচর্চাকে দেয় না। সামাজিক সচেতনতায় বেশি নেই। আমার কাছে অনেক ডাক্তার ওয়ার্ক আউট করে। শারীরিক ভাবে তারা খুব আনফিট। আসলে আপনি যে পেশাতেই থাকুন না কেন আপনাকে যে ফিট থাকতে হবে, শরীরচর্চা করতে হবেÑ এই কালচারটাই আমাদের নেই। তাই শুরুর দিকে এক্সারসাইজ করা এবং স্ট্রেন্থ বিল্ডিং করা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল।

পেশাদার বডিবিল্ডিং শুরু কবে থেকে?

মৌ : ২০১৯ সালের আগে সেভাবে বডিবিল্ডিংয়ের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। এখানে একটা ব্যাপার বলা দরকার বডিবিল্ডিংয়ের প্রক্রিয়াটা একেবারে আলাদা। ডায়েটিং থেকে শুরু করে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। অনেক কিছু মেনে চলতে হয়। আমি ২০১৯ সালে যখন বডিবিল্ডিং শুরু করি তখন একটা টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় হই। ওটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল। তখন ভেবেছিলাম যদি আরও একটু ভালো কন্ডিশনিং নিয়ে আসি তাহলে আরও ভালো করতে পারব।

মুম্বাইয়ে আইএইচএফএফ অলিম্পিয়া অ্যামেচার বডিবিল্ডিংয়ে প্রথমবার অংশ নিয়ে পদক জেতার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মৌ : প্রথম প্রতিযোগিতার মাত্র দুই মাস আগে আমি দেশে এসেছিলাম। নিজেকে ভালোভাবে প্রস্তুত করতে পারিনি। তাই মুম্বাইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য অনেক খাটতে হয়েছিল। এক-দেড় ঘণ্টা করে ওয়ার্কআউট করা। সঙ্গে ডায়েট। অন্যদের বোঝানো যাবে না এটা কত পরিশ্রমের কাজ। তাছাড়া একটা নতুন জায়গায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছি মনে একটু ভয়ও কাজ করছিল। আসলে আমাদের দেশে ওভাবে কোনো বডিবিল্ডিং বা এক্সপো প্রতিযোগিতা হয় না। বুঝিয়ে বলার জন্য বলছি, এটা আসলে একটা হেলথ ও ফিটনেস এক্সপো। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিযোগী আসেন। মুম্বাইয়ে অনেক ধরনের ব্র্যান্ড ছিল যা আমাদের দেশে ছিল না। সব মিলিয়ে বলব ভালো অভিজ্ঞতা ছিল।

মুম্বাইয়ের অ্যামেচার বডিবিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে আমরা যতদূর জানি আপনি খুব অভিজ্ঞও ছিলেন না...

মৌ : মুম্বাইয়ে যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল তাদের তুলনায় আমি ছিলাম একেবারেই নতুন এবং অনভিজ্ঞ। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করায় প্রতিযোগিতার শেষে বিচারকরা আমাকে বলেছিলেন, তোমার দেশে যে বডিবিল্ডার নারী আছে বা ওখানেও বডিবিল্ডিং হয় সেটাই আমরা জানতাম না। তারা আমার ফিজিক্যাল কন্ডিশন দেখেও অবাক হয়েছিলেন। ফিজিক্যাল স্ট্রেন্থের বিচারে আমি বেশ শক্তিশালী ছিলাম। মুম্বাইয়ে আমি যাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি তারা ছিল ৩৭-৩৮ বছর বয়সী বডিবিল্ডার। ওরা ১৬-১৭ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আসছিল। সেই তুলনায় আমি ছিলাম একেবারেই আনকোরা। মাত্র ২০১৯ সাল থেকে বডিবিল্ডিং শুরু করি। তাছাড়া আমার পিঠে সেই সময় অনেক ইনজুরি ছিল। সেখান থেকে সেরে উঠে মুম্বাইয়ে কিছু জেতাটা ছিল দারুণ ব্যাপার।

আপনি তো মুম্বাইয়ে গিয়েছিলেন মূলত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। পদক জিতে যাবেন এমনটা কি আশা করেছিলেন?

মৌ : ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, প্রতিযোগিতায় যেহেতু অংশ নিয়েছি পদক জয়ের আশা তো থাকবেই। তাছাড়া আমার কন্ডিশনিং অনেক ভালো ছিল। ওখানে বিচারকদের কাছে অনেক প্রশংসা পেয়েছিলাম। আমার কিছু দুর্বলতা ছিল যা তারা ধরিয়ে দিয়েছেন। আমিও শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার কোথায় উন্নতি করতে হবে সেটার পরামর্শও দিয়েছিলেন। বিচারকরা আমার কন্ডিশনিংটার অনেক প্রশংসা করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, আমি কম দিনে নিজেকে প্রস্তুত করেছি বলে আমার পেশিগুলো কম পরিপক্ব। আরও কয়েক বছর বডিবিল্ডিং চালিয়ে গেলে আমি আরও ভালো করব বলেও জানিয়েছিলেন। ওনাদের কথায় খুব অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম। আর একটা ব্যাপার বাংলাদেশে আমরা নারীরা হাফ সিøভ বা প্যান্ট পরে প্রতিযোগিতায় অংশ নিই। মুম্বাইয়ে বিকিনি পরে স্টেজে উঠতে হয়েছিল। বিষয়টা চ্যালেঞ্জিং ছিল। বলতে পারেন ওটা নতুন অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশে নারী বডিবিল্ডিং কীভাবে শুরু হয়েছিল?

মৌ : আমাদের দেশে পুরুষদের বডিবিল্ডিংয়ের ইতিহাস থাকলেও নারীদের বডিবিল্ডিং আমার জানামতে ২০১৯ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল। আমিই প্রথম শুরু করি।

আপনি বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির পুরস্কার পাচ্ছেন। এই স্বীকৃতি কি আপনাকে অনুপ্রাণিত করে?

মৌ : অবশ্যই যেকোনো পুরস্কার এবং স্বীকৃতি অনুপ্রাণিত করে। তবে একটা কথা বলতে চাই বডিবিল্ডিং খুব ব্যয়বহুল খেলা। কোচ রেখে, ডায়েট করে নিয়মিত ওয়াকআউট করে এই খেলায় টিকে থাকাটা অনেক কঠিন এবং ব্যয়বহুল। তাই শুধু পুরস্কার পেয়ে থেমে থাকলে চলবে না। তাছাড়া বডিবিল্ডিংয়ে এসে অনেক বাধাবিপত্তির মুখে পড়তে হয়। তবে পুরস্কার বা স্বীকৃতি সমাজের ট্যাবু ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাহস জোগায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত