সাভারের আশুলিয়ায় প্রকাশ্যে কলেজশিক্ষক উৎপল সরকারকে মারধর করে হত্যার ঘটনায় চার দিন চলে গেলেও অভিযুক্ত আশরাফুল ইসলাম জিতু ওরফে ‘জিতু দাদা’কে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে জিতু বেপরোয়া আচরণের অভিযোগ পেয়েও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি পরিবার।
বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্ত কিশোর গ্যাং লিডার জিতুর আত্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। এ পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে সে কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করত না।
মঙ্গলবার সকালে ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অভিযুক্ত জিতুকে গ্রেপ্তারসহ ৬ দফা দাবিতে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে।
এ কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও নিহত শিক্ষকের পরিবার এবং এলাকাবাসী অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তারা শিক্ষক হত্যাকারী জিতু গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে ৬ দফা দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের দাবিগুলো হলো, মামলার প্রধান আসামিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার, অজ্ঞাতনামা আসামিদের গ্রেপ্তার, প্রধান আসামি ওই ছাত্রের পলাতক পরিবারের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা, নিহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ, স্কুল ও কলেজের স্থানীয়-বাইরের শিক্ষার্থীদের ভেদাভেদ দূর করতে আইন প্রণয়ন এবং কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধ দূর করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ।
হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত স্ট্যাম্প পুলিশ এখনো আলামত হিসেবে জব্দ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ না করতে পারায় এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। তাদের ধারণা জিতুর পরিবার এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ আসামি গ্রেপ্তার এবং মামলার সুষ্ঠু তদন্তে গাফিলতি করছে।
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মুন্নি আক্তার মিম বলেন, ‘ঘটনার পরপরই ওই ছাত্রের বাবা এসে তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। বর্তমানে পুরো পরিবার গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আমরা হত্যার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি চাই’।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান বলে, ‘শুনেছি এর আগেও জিতু বাসার সামনে একজনকে পিটিয়ে পা ভেঙে দিয়েছিল। শিক্ষককে যে এভাবে মারতে পারে সে তো আমাদেরও মেরে ফেলতে পারে’।
নবম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল্লাহ আল নোমান বলে, ‘উৎপল স্যার খুব ভালো একজন মানুষ ছিলেন। তিনি আমাদের গুরুজন। তাকে হত্যা করা হলো, কিন্তু অপরাধীরা এখনো গ্রেপ্তার হল না। আমরা চাই দ্রুত জিতুকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্কুলটির একজন শিক্ষক বলেন, ‘স্কুলের পরিচালক মো. সুমন জিতুর বাবা উজ্জ্বল হাজীর মামাতো ভাই। তাই জিতু স্কুলে নানা উচ্ছৃঙ্খল আচরণসহ অপকর্ম করলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের কেউ কিছু বলতে পারেনি। নিহত শিক্ষক উৎপল সরকার শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি হওয়ায় জিতুর আচরণের কারণে তাকে কয়েকবার শাসন করেছিলেন। আর এই শাসনই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়।
স্কুলটির সমাজ কল্যাণ বিষয়ের প্রভাষক সফিকুল ইসলাম বলেন, জিতু এমনিতেই বখাটে স্বভাবের। সে ছাত্র হিসেবেও বেশি ভালো না। এ ছাড়া নিয়মিত স্কুলে আসত না। ছাত্র হিসেবে খারাপ হলেও সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করত। স্কুলের নিয়মকানুনও মানত না জিতু। এসব নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ অনেকবার বিচারে বসেছিল। উৎপল কুমারসহ তারা অনেকভাবে জিতুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। এমনকি জিতুর অভিভাবককেও বলেছেন, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। আজ সেই শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে জিতুর হাতেই। এ ছাড়া এ ঘটনার পর থেকে স্কুল বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সবাই একত্রিত হয়েছে, জিতুকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত স্কুল বন্ধ থাকবে।
বিদ্যালয়টির অধ্যক্ষ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের স্কুল ও কলেজে ৫৫ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকা রয়েছেন। উৎপল স্যার এখানে ২০১৩ সাল থেকে চাকরি করেন। স্যার আমাদের এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে করতেন। ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। তবে ঘটনাটি শুনে দ্রুত স্কুলে এসে এ দুই দিন উৎপল স্যারের সঙ্গে হাসপাতালেই ছিলাম। স্যারের অপারেশনে ৩০ ব্যাগের মতো রক্ত লেগেছে, তবুও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। যে ছেলেটা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে সে একদমই ভালো ছেলে না। উৎপল স্যারই অনেক সময় আমার কাছে জিতুকে ধরে আনতো। তখন আমিসহ বাকি স্যাররা বিচার করতাম। এসব নিয়ে জিতুর অভিভাবককেও অনেকবার বলেছি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
জিতুর এ ঘটনায় বিদ্যালয় থেকে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দুই দিন যাবৎ হাসপাতালেই ছিলাম। প্রাথমিকভাবে জিতুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের পাশাপাশি আমরা স্কুল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করব।
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উপপরিদর্শক (কলেজ) মো. রবিউল আলম।
মো. রবিউল আলম বলেন, শিক্ষক হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা হয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান স্যারের নির্দেশে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করা হলো। সার্বিক বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাস করার পর গত দশ বছর ধরে আশুলিয়ায় চিত্রশাইলে হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন উৎপল কুমার সরকার।
তিনি গত দুই বছর আগে বিয়ে করলেও তাদের কোন সন্তান ছিল না। তার স্ত্রী বিউটি সরকার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন বলে জানিয়েছেন নিহতের বড় ভাই অসীম সরকার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিতুর সহপাঠীরা জানায়, আমরা জিতুর বিভাগেই পড়ি। জিতু ভালো ছাত্র ছিল না, আচরণও অনেকটা অন্যরকম। মনে হয় যে কোনো সময় যে কাউকে মারধর করবে। তার খুব প্রভাব ছিল, কোনো ছাত্র যদি তার কথা না শুনতো তাহলে তাদের ধরে শাস্তি দিত। উৎপল স্যার এগুলো দেখে তাকে অনেকবার অধ্যক্ষের কাছে ধরে নিয়ে গেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। কিছুদিন আগেও আমাদের ফুটবল খেলা হয়েছে। সেখানে জোর করেই জিতু অধিনায়ক হয়েছে।
সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করতে গেলে স্কুলটির অফিস সহকারী আব্দুর আলিম বলেন, মাঠে আমদের দুইটা সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এসব ক্যামেরায় ঘটনাটি স্পষ্ট ছবি আসত। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে দেড়টার দিকে। তখন বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ না থাকায় সেই সময় ঘটনার কোনো ছবি বা ভিডিও পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে জিতু ওই শিক্ষককে মারার আগে বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করে রেখে ছিল।
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. এমদাদুল হক বলেন, এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে জিতুকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় একটি মামলা করেছেন। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আমরা অভিযানে আছি, সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। খুব দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হবে।
শনিবার (২৫ জুন) দুপুরে হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রীদের আন্তশ্রেণি ক্রিকেট প্রতিযোগিতার প্রথম খেলা চলছিল। খেলা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বিদ্যালয়ের পৌরনীতি ও সুশাসন বিষয়ের শিক্ষক এবং শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি উৎপল কুমার সরকার (৩৭)। খেলার চার ওভার যখন চলছিল, তখনই ওই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র আশরাফুল ইসলাম জিতু ওরফে ‘জিতু দাদা’ (১৭) একটি কাঠের স্ট্যাম্প দিয়ে শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারের ওপর হামলা করে। এ সময় জিতু পেছন থেকে কয়েকটি আঘাতের পর অন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাকে আটকাতে গেলে উৎপল কুমারের পেটে ও মাথায় আঘাত করে জিতু। গুরুতর আহত অবস্থায় উৎপলকে প্রথমে আশুলিয়ার নারী ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেয়া হয়। পরে তাকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সোমবার ভোরে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
