রনিলে খুশি নন শ্রীলঙ্কানরা, ফের বড় আন্দোলনে যাবেন বিক্ষোভকারীরা

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২২, ০৪:৪৯ পিএম

রনিল বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ফের বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশটির বিক্ষোভকারীরা।

আজই দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। তবে তাকে মানতে নারাজ গত কয়েক মাস ধরে রাস্তায় থাকা আন্দোলনকারীরা। সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে পদত্যাগের পর থেকেই বিষয়টি বলে আসছিলেন তারা। বিক্ষোভকারীরা রনিল বিক্রমাসিংহেরও পদত্যাগ দাবি করে আসছিলেন।

কিন্তু তারপরেও গণতান্ত্রিক উপায়ে পার্লামেন্টের এমপিদের ভোটে প্রেসিডেন্ট পদে জয় পেয়েছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। ২২৫ আসনের সংসদে ১৩৪ জন সংসদ সদস্যের ভোট পেয়ে জিতেছেন রনিল। এর আগে ছয়বার দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। সম্প্রতি অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও সামলাচ্ছিলেন তিনি।

কিন্তু বিক্ষোভকারীরা তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে চাইছেন না। আল-জাজিরার সাংবাদিক মিনেলে ফার্নান্দেজ শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলোম্বো থেকে জানিয়েছেন, পার্লামেন্টের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারাজ বিক্ষোভকারীরা। তারা আবারও বড় আন্দোলনে যাচ্ছেন।

রনিল বিক্রমাসিংহেকে রাজাপাক্ষে পরিবারের মিত্র বলেই ধরে নেয়া হয়। তাই তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আন্দোলনকারীরা মানতে পারছে না।

আন্দোলনকারীরা মনে করেন, বিক্রমাসিংহেকে জেতাতে রাজাপাক্ষে পরিবারই হস্তক্ষেপ করেছে। তাছাড়া যে প্রক্রিয়ায় রনিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছে তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে আন্দোলনকারীদের।

মেলানি গুনাথিলাকে নামে বিক্ষোভকারীদের একজন নেতা আল জাজিরাকে বলেন, বিক্ষোভকারীরা বর্তমানে বিক্রমাসিংহের নির্বাচনের পরে তাদের ভবিষ্যত কৌশল নিয়ে আলোচনা করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে আমাদের পরবর্তী কৌশল কী হবে তা নিয়ে আলোচনা করছি এবং পুনর্গঠিত হচ্ছি। রনিল বিক্রমাসিংহে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা অবশ্যই আমাদের সংগ্রাম এবং আমাদের ঘেরাও চালিয়ে যাব। আমরা অবশ্যই এমনটি চাইনি’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব ভালো করেই জানি যে রনিল বিক্রমাসিংহে গোতাবায়া রাজাপাক্ষের মতো নন। তিনি বরং আরও ধূর্ত ব্যক্তি। এবং সম্প্রতি তিনি এমনকি জরুরি অবস্থা জারি করে এবং বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার পাঠিয়ে বিক্ষোভ দমন করার চেষ্টা করেছেন। তবে আমি মনে করি না যে, লোকে আর এসবকে ভয় পাবে’।

মেলানি গুনাথিলাকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা এমন একজন নেতাকে চায় যিনি আসলে তার জনগণের জন্য চিন্তা করেন, শুধু তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যত নিয়েই ভাবেন না’।

আজ সকালে শ্রীলঙ্কার আইনপ্রণেতারা ছয় বারের প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেন। সংসদে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে জয় পেয়েছেন বলে ঘোষণা দেন স্পিকার।

রনিল বিক্রমাসিংহে ১৩৪ সংসদ সদস্যের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী দুলাস আলহাপ্পেরুমে ৮২ ভোট ও বামপন্থী নেতা অনুরা কুমারা দিসানায়েকে কেবল নিজ দলের ৩টি ভোট পান।

গত সপ্তাহে দেশটির আন্দোলনকারীরা বাসভবন দখলে নেওয়ার পর শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে মালদ্বীপে পালিয়ে যান। পরে সেখান থেকে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান তিনি।

দেশটির বিক্ষোভকারীরা রনিল বিক্রমাসিংহেরও পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছেন। গত মে মাসে চরম সংকটের মুখে মাহিন্দা রাজাপাক্ষে পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন রনিল। বিক্ষোভকারীরা তার ব্যক্তিগত বাসভবন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে কলম্বোতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দখলও নেন তারা।

তখন থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও এখন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়া রনিলের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছেন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু সেই দাবির প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পদত্যাগ করবেন না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

গোতাবায়া রাজাপাক্ষে পালিয়ে যাওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন রনিল বিক্রমাসিংহে। বুধবার সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় আগামী ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন তিনি।

বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে দেশের ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমদানি করতে পারছে না শ্রীলঙ্কা। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এক বছর আগের তুলনায় খাদ্যের দাম ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছর মার্কিন ডলার এবং অন্যান্য প্রধান বৈশ্বিক মুদ্রার বিপরীতে শ্রীলঙ্কার রুপির মূল্য হ্রাস পেয়েছে ব্যাপকহারে।

অনেকেই দেশটির চলমান এই পরিস্থিতির জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষেকে দায়ী মনে করেন। তাদের মতে, রাজাপাক্ষের ভুল নীতির কারণে শ্রীলঙ্কায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। আর এই সংকটের প্রভাব করোনাভাইরাস মহামারির কারণে আরও প্রবল হয়েছে। দেশটির অন্তত ৫০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে রয়েছেন।

বছরের পর বছর ধরে শ্রীলঙ্কা বিপুল পরিমাণ ঋণ করেছে। দুই দশকের মধ্যে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম দেশ হিসেবে গত মাসে শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেলআউটের জন্য আইএমএফের সাথে আলোচনা করছেন।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে এই আলোচনা আপাতত থমকে গেছে। এখন দেশটিতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে পুনরায় আইএমএফের সাথে বেলআউটের আলোচনা শুরু করাই হবে বিক্রমাসিংহের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, উচ্চমাত্রার ঋণ এবং বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার মতো একই ধরনের বৈশ্বিক সমস্যা বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত