জীবন আল্লাহর দান। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার সমন্বয়ে একটি উপভোগ্য জীবন তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। তার পরও জীবন সন্ধ্যায় এক দিন বিদায় নিতে হয়। জীব মাত্রই মৃত্যুর কাছে অসহায়। মৃত্যু থেকে কেউ কখনো পলায়ন করতে সক্ষম হয়নি। তবে মুমিন বান্দার জন্য দুনিয়া হলো আখেরাত উৎপাদন ক্ষেত্র। আখেরাত কর্মক্ষেত্র নয়, ফলাফল ময়দান। মৃত্যুর পর মানুষের কোনো আমল করার সুযোগ থাকে না। অথচ তখন মানুষ সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী হয় নেক আমলের।
মৃত্যুর কারণে আমলের সুযোগ রুদ্ধ হয়ে গেলেও ইসলাম মৃত ব্যক্তির আমলনামায় সওয়াব পৌঁছানোর সুযোগ অবারিত রেখেছে। পৌঁছানোর দায়িত্ব জীবিতদের। জীবিতদের ওপর মৃত ব্যক্তি অবশ্যই অধিকার রাখে। মৃতদের মাগফিরাতের লক্ষ্যে সওয়াব পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জীবিতদের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সওয়াব পাঠানোর বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বর্ণিত হয়েছে। এর কয়েকটি পদ্ধতি হলো
মাগফিরাতের দোয়া : পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘এবং দোয়া করো, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন।’ সুরা বনি ইসরাইল : ২৪
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জান্নাতে কোনো ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি করা হলে সে ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করবে, কী কারণে আমার মর্যাদা বৃদ্ধি ঘটল? তাকে উত্তর দেওয়া হবে, তোমার সন্তান কর্র্তৃক তোমার জন্য মাগফিরাতের দোয়ার বদৌলতে।’ সহিহ বোখারি
জনকল্যাণমূলক কাজ : হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাতটি কাজ এমন যেগুলোর সওয়াব বান্দা মৃত্যুর পর কবরে পেতে থাকে। নদী ও পানির কূপ খনন, গাছ রোপণ, যাত্রীছাউনি নির্মাণ ইত্যাদি।’ শোয়াবুল ঈমান
দান-সদকা : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমলের সওয়াব চালু থাকে। সাদকায়ে জারিয়া, কোরআন-হাদিসের উপকারী ইলম ও নেককার সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।’ সহিহ মুসলিম
আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, এক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার পিতা সম্পদ রেখে ইন্তেকাল করেছেন। অথচ আমাকে কোনো অসিয়ত করে যাননি। তার পক্ষ থেকে সদকা করলে কি তার গোনাহ মাফ হবে? নবী করিম (সা.) উত্তর দিলেন, হ্যাঁ মাফ হবে।’ শরহু সহিহিল মুসলিম
মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ ও ধর্মীয় জ্ঞান বিস্তারে সহযোগিতা : হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মৃত্যুর পরও মানুষ এ কাজগুলোর সওয়াব পেতে থাকে। ইলম শেখা ও ইলমের প্রচার, মসজিদ নির্মাণ ইত্যাদি।’ ইবনে মাজাহ
ঋণ পরিশোধ : হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, সাদ ইবনে উবাদা (রা.) নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার মাতা ইন্তেকাল করেছেন অথচ তার জিম্মায় মানত রয়েছে। এখন আমি কী করব? নবী করিম (সা.) বললেন, তার পক্ষ থেকে তুমি আদায় করে দাও।’ ইবনে মাজাহ
অন্য হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অন্তর নিজের ঋণের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে। পরিশোধ করার পরই তার মুক্তি মেলে।’ সুনানে তিরমিজি
এটা শরিয়ত স্বীকৃত বিষয় যে, মৃতদের উদ্দেশে জীবিত ব্যক্তি কর্র্তৃক সম্পাদন করা বিভিন্ন মৌখিক ও দৈহিক ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেয়ে থাকেন। আমর ইবনে শোয়াইব তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নিজ মৃত পিতার পক্ষ থেকে গোলাম আজাদ করার অনুমতি চাইলে নবী করিম (সা.) উত্তরে বললেন, তোমার পিতা যদি মুসলিম হয়ে থাকে, তাহলে তার পক্ষ থেকে গোলাম আজাদ করতে পারো, সদকা করতে পারো অথবা হজ করতে পারো। এগুলোর সওয়াব তাকে পৌঁছে দেওয়া হবে।’ শরহুস সাবি
হজরত আবু মাসউদ আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে কোনো সৎকাজ শেখায়, দ্বিতীয় ব্যক্তি ওই কাজ করলে প্রথম ব্যক্তি তার সওয়াব পেতে থাকে।’ সহিহ মুসলিম
উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, নেক আমলের সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে পাঠানো যায়। এর সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেয়ে থাকেন। তাদের উপকার হয়। জীবিতদের কর্তব্য হলো, মৃত্যুর পর নিজেদের জন্য চলমান পাথেয় হিসেবে উল্লিখিত আয়াত ও হাদিসে যেসব নেক আমলের কথা বিধৃত হয়েছে সেগুলোর প্রতি মনোযোগী হওয়া। সঙ্গে সঙ্গে মৃত যেসব পরিজন, আত্মীয়, প্রতিবেশী ইন্তেকাল করে কবরে শায়িত, তাদের জন্যও উপরোক্ত আমলগুলো বাস্তবায়ন করে তাদের সওয়াব পৌঁছানো।
