গণপরিবহনে ধর্ষণ নৈরাজ্য

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২২, ১০:৫৬ পিএম

দেশব্যাপী গণপরিবহনে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ডাকাতির মতো অপরাধ বেড়েই চলেছে। সঙ্গে পরিবহনের মালিক-চালক-শ্রমিকদের মর্জিমতো নানারকম বিশৃঙ্খলা আর যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু এই নৈরাজ্য অবসানের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। গত মঙ্গলবার টাঙ্গাইলে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনে ডাকাতি আর দল বেঁধে ধর্ষণ নিয়ে আলোচনা সমালোচনার মধ্যেই শনিবার গাজীপুরের শ্রীপুরে চলন্ত বাস থেকে স্বামীকে ফেলে দিয়ে এক নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণের যেন কেউ নেই। অথচ সড়কপথের নিরাপত্তায় ২০০৫ সালে হাইওয়ে পুলিশ গঠন করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ মূলত সড়কে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কিছু ব্যবস্থা নেয়। আর ডাকাতি কিংবা বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে আসামি ধরার ক্ষেত্রে থানা-পুলিশকে সহায়তা করে পুলিশের এ ইউনিট। কিন্তু তল্লাশিচৌকি বসিয়ে কিংবা মহাসড়কে টহল জোরদার করে যাত্রী সুরক্ষায় হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা নেই বললেই চলে।

রবিবার দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাজীপুরের শ্রীপুরে চলন্ত বাস থেকে স্বামীকে ফেলে দিয়ে একুশ বছরের এক তরুণীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলকারী তাকওয়া পরিবহনের একটি মিনিবাসের কর্মীরা। শনিবার ভোরে গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামীর কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে তাকওয়া পরিবহনের পাঁচ কর্মীকে শনিবার সন্ধ্যার মধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ওই দম্পতির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ১০ হাজার টাকা, দুটি ব্যাগ ও বিভিন্ন মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি বাসটিও জব্দ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী দম্পতি পেশায় পোশাককর্মী। তারা জানান, নওগাঁর বাড়ি থেকে বাসে করে শনিবার ভোরে গাজীপুর নগরীর ভোগড়া বাইপাস এলাকায় এসে নামেন। সেখান থেকে তাকওয়া পরিবহনের মিনিবাসে করে তারা শ্রীপুরের মাওনার দিকে যাচ্ছিলেন। সে সময় বাসে আরও কয়েক যাত্রী ছিলেন। বাসটি গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় এসে পৌঁছালে তাকওয়া পরিবহনের আরও তিনজন কর্মী ওঠেন। বাসটিতে আগে থেকেই দুজন কর্মী ছিলেন। মহাসড়কের হোতাপাড়া পর্যন্ত আসতে আসতে অন্য যাত্রীরা বাস থেকে নেমে যান। এরপরই বাস থেকে ওই নারীর স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে বাসের পাঁচ কর্মী ওই নারীকে ধর্ষণ করে।

আন্তঃজেলা বা দূরপাল্লার বাসে প্রতি বছরই এমন অনেক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। অনেক ঘটনায় ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে বাস থেকে ফেলে দিয়ে কিংবা অন্যভাবে হত্যা করার ঘটনাও আছে। বিগত বছরগুলোতে বাসে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ঘটনাতেই পরিবহনের চালক-কর্মী এবং তাদের সহযোগীরা যুক্ত। এছাড়া যাত্রীবেশে বাসে উঠে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে গণপরিবহনে ১৩৪টি ধর্ষণ, ৪২টি দল বেঁধে ধর্ষণ এবং ৯১টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। করোনা মহামারীর সময় পরের বছরগুলোর হিসাব রাখতে পারেনি সংগঠনটি। পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ ও নারী আন্দোলনকর্মীরা বলছেন, দেশের গণপরিবহন খাতের সার্বিক নৈরাজ্য ও জবাবদিহির অভাবই বাসে এমন নারীনির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বাড়তে থাকার অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে অপরাধী ধরা না পড়া এবং শাস্তি না হওয়া তো আছেই।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন বড় বড় মহানগরগুলোতে যেমন বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি চালু করা দরকার তেমনি আন্তঃজেলা বাস সার্ভিসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে বিভাগীয় এবং জেলাপর্যায়ে সেবাদানকারী বাস কোম্পানিগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা সম্ভব হলে পরিবহন খাতের নৈরাজ্য অনেকটাই কমে যাবে। একইভাবে বাস কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা দরকার সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী চালক ও চালকের সহকারীসহ সব কর্মীদের নিয়োগপত্র দিয়ে নিয়মিত চাকরির অধীনে নিয়ে আসা। কিন্তু বেশিরভাগ বাস কোম্পানিই এই নিয়ম মানছে না। আর সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় কিংবা বাস মালিকদের সমিতিরও এসব আইন কার্যকর করা নিয়ে কোনোই আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। একইভাবে বিদ্যমান অন্যান্য আইনও মানছেন না গণপরিবহন মালিকরা। যেমন আন্তঃজেলা বাস চলাচলের অনুমোদন পাওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে জেলা সদরের নির্দিষ্ট টার্মিনাল থেকেই কেবল যাত্রী তোলা যাবে। এর বাইরে যত্রতত্র যাত্রী তোলা যাবে না। তবে যাত্রী চাইলে বাস থেকে নামতে পারবেন। কিন্তু মালিকদের কাছ থেকে নিয়ে চুক্তিভিত্তিকভাবে বাস চালানোয় বেশিরভাগ চালকই বাড়তি আয়ের জন্য যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী তোলেন। এই পরিস্থিতি বদলে নারীসহ সব যাত্রীর জন্য নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হলে কেবল অপরাধী ধরা আর শাস্তি দিলেই হবে না, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত