বিশ্বের তাপমাত্রার বিপজ্জনক বৃদ্ধি ঠেকাতে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে নেওয়া কার্বন নির্গমন হার কমানোর সঠিক পথেই ছিল ইউরোপ। ২০১৮ সাল থেকে ইইউর কার্বন নির্গমন কমতে শুরু করেছিল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইউরোপ ও রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা-পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় বিশ্বজুড়েই দেখা দিয়েছে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পাশাপাশি উল্লম্ফন হয়েছে খাদ্যের দামেও। দরিদ্র দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে ভীষণ চাপে পড়েছে। খাবার আর জ্বালানির সংকটে দিশেহারা অনেক দেশের সরকার। তবে সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে ইউরোপে। ৪০ শতাংশের বেশি রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল অঞ্চলটিতে অবস্থা এমন হয়েছে, কয়েকগুণ বাড়তি দামেও আসন্ন শীতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে কয়েকটি দেশের। এই অবস্থা সামাল দিতে কম দামের জ্বালানি কয়লার ব্যবহার বাড়াতে শুরু করেছে অনেক দেশ। এতে করে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার যে লক্ষ্য অঞ্চলটির ছিল তা বড় ধাক্কা খাচ্ছে। কারণ ইউরোপ ইতিমধ্যে যে হারে কয়লার ব্যবহার শুরু করেছে, তাতে এক বছরের মধ্যেই অঞ্চলটির কার্বন নিঃসরণ হার ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে!
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কয়লা সবচেয়ে বেশি দূষণযোগ্য জ্বালানি। এটির ব্যবহার বাড়তে থাকায় জলবায়ুতে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। গত বছর বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ এক বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড করা হয়েছে। এ বছর কয়লার ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, তাতে উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লার আমদানি বাড়িয়েছে ১১ গুণ।
কয়লার বাজার নিয়ে কাজ করা ভারতীয় প্রতিষ্ঠান কোলমিন্ট জানাচ্ছে, গত জুলাই মাসে সাগরপথে বিশ্বজুড়ে কয়লা আমদানি হয়েছে ৯৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৭৮ লাখ টন, যা আগের ৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অবশ্য আগস্টে অস্ট্রেলিয়া থেকে কয়লা রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় তা নেমে আসে ৮ কোটি ৯০ লাখ টনে। তবে বছরের বাকি সময়টাতে কয়লা রপ্তানি ৫০ শতাংশ বাড়াতে পারে তানজানিয়া।
রয়টার্স বলছে, দেশটি চলতি বছর ইতিমধ্যে ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৭৭৩ টন কয়লা রপ্তানি করেছে। বছর শেষে তা বেড়ে ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭০৭ টনে পৌঁছাতে পারে। এদিকে চলতি বছর কয়লার বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে এক দশকের রেকর্ড স্পর্শ করতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। গত আগস্ট মাসে কয়লার বাজারবিষয়ক এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, চলতি বছর কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহার দশমিক ৭ শতাংশ বাড়তে পারে। সংস্থাটির ভাষ্য, বছর শেষে বিশ্বে কয়লার ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়াবে ৮০০ কোটি টনে। ২০১৩ সালের রেকর্ড স্পর্শ করবে কয়লার বৈশ্বিক চাহিদা। আগামী বছর চাহিদা আরও বেড়ে অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাবে।
এদিকে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, চলমান এ সংকটের কারণে চলতি বছরে শীতের মাসগুলো ইউরোপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে চলেছে। সার্বিকভাবে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের বিল মেটানো ও ঘর গরম রাখা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাবাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে গ্যাস সরবরাহ কার্যত প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ইউরোপের অনেক দেশ। সরবরাহে বিঘেœর জন্য মস্কো নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করলেও ইউরোপীয় দেশগুলো সে দেশের বিরুদ্ধে জ্বালানিকে হাতিয়ার করার অভিযোগ করছে।
এই সংকটের জের ধরে ইইউ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতাও বাড়ছে। এর আওতায় আগামী ১০ অক্টোবর থেকে ফ্রান্সের একটি সংস্থা জার্মানিতে গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে বলে জানিয়েছে। তবে পরমাণু চুল্লিগুলোর চলমান সমস্যার কারণে ফ্রান্সেও শীতকালে বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। স্পেনের শিল্পমন্ত্রী রাইয়েস মারোতো জানিয়েছেন, জ্বালানি ঘাটতি দেখা দিলে শীতকালে কারখানা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফিনল্যান্ডের গ্রিড কোম্পানি ফিনগ্রিড বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কা জানিয়ে জনসাধারণকে সতর্ক করে দিয়েছে। পর্তুগালের এক বিদ্যুৎ কোম্পানি বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে না পেরে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। পর্তুগালের সরকারও জানিয়েছে, দেশ শীতকালে কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ভয়ংকর অবস্থার ঝুঁকিতে আছে জার্মানিও। তবে দেশটির সরকার শুরু থেকে পদক্ষেপ নেওয়ায় শীতকাল মোকাবিলার রসদের বড় অংশ ইতিমধ্যে মজুদ করতে পেরেছে।
তবে পদক্ষেপ যাই হোক না কেন ইউরোপ যে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ শীতকালের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সে বিষয় সন্দেহ নেই। শীতে রাশিয়া অঞ্চলটিতে গ্যাসের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
রয়টার্স জানাচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে বন্ধের পথে থাকা কয়লা খনিগুলো পুনরায় চালু করতে যাচ্ছে ইউরোপ। কার্যক্রম পরিচালনার সময়ও বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে। কয়লার বৈশ্বিক ব্যবহারের ৫ শতাংশ আসে ইউরোপ থেকে। এ হারও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আর তা হলে প্যারিসে ২০১৫ সালের সম্মেলনে ইউরোপসহ বিশ্বের দেশগুলো তাপমাত্রার বিপজ্জনক বৃদ্ধি ঠেকাতে কার্বন নিঃসরণ কমাতে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল তা বড় ধাক্কা খাবে। ইইউ অঙ্গীকার করেছিল ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন ৫৫ শতাংশ কমাবে। একই সময়ের মধ্যে চাহিদার ৪০ শতাংশ জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও করেছিল। আর সামগ্রিকভাবে জিরো-কার্বন বা কার্বন-নিরপেক্ষ হওয়ার ঘোষণা ছিল ২০৫০ সালের মধ্যে।
কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ সে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এখন বড় বাধা। অবশ্য কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য ইইউর একটি সার্বিক লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এর সদস্য দেশগুলোর আর্থিক এবং কারিগরি সক্ষমতা এক ছিল না।
আবার সব দেশ সমান দায়ীও নয়। অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় কার্বন নির্গমনকারী দেশ জার্মানি, ইতালি এবং পোল্যান্ড হওয়ায় অন্য দেশগুলো এই লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতেও খুব একটা উৎসাহী নয়। যা করার এককভাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে করতে হয়। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি জোটটিকে ভীষণ চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জে ফেলে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যকেও।
