গাইবান্ধার প্রভাব রাজনীতির অঙ্কে

সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি জিএম কাদের

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২২, ০২:২৬ এএম

দেশ রূপান্তর : অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গাইবান্ধা-৫ আসনের নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছে। ইসির এ সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

জিএম কাদের : ইসির এ সিদ্ধান্তকে আমি ভালো হিসেবেই দেখছি। ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। আমরা অনেক দিন আগে থেকে একটা কথা সবসময় বলে আসছিলাম, বর্তমান সরকার যে কর্র্তৃত্ববাদী এবং তাদের অধীনে যে নির্বাচনগুলো হচ্ছে, সেখানে নির্বাচনের সঙ্গে যারা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশনার, রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসার, পুলিশ, এরা সবাই সরকারের প্রভাবে প্রভাবান্বিত থাকেন। সে অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন করা খুবই কঠিন। তারপরও নির্বাচন কমিশনের একটা ক্ষমতা আছে, কমিশন যেকোনো সময় নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে, যেকোনো নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করতে পারে। ফলে এ দুটোই অস্ত্র তাদের আছে। প্রশাসন যদি নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা না-ও করে, তাহলেও অন্তত এ দুটো অস্ত্র দিয়েই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকে অবাধ সুষ্ঠু করার জন্য একটা প্রচেষ্টা নিতে পারে। বারবার এ প্রচেষ্টার পরও যদি কোনো ফল না পান, তাহলে নির্বাচন কমিশনাররা পদত্যাগ করে চলে যেতে পারেন।

আমি প্রথম থেকে এসব কথাই বলে আসছি। গতকাল (গত বুধবার) ইসি যে কারণে নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে আমার সব কথাই ঠিক হয়েছে। কারণ ওখানে যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার সবাই যেকোনোভাবেই হোক সরকারদলীয় প্রার্থীকে সাহায্য করেছে। এমনভাবে করেছে যেখানে নির্বাচন কমিশনের কাছে মনে হয়েছে সেখানে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই।

এমনকি আমরা এটাও বলেছিলাম বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা দিতে হবে এবং ক্যামেরাগুলো যেন চালু থাকে, সেটাও দেখতে হবে। আমরা আশঙ্কা করেছিলাম যে সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোকে অচল করে দিয়েও অনিয়ম হতে পারে। এখন দেখা গেল সিসিটিভি ক্যামেরা চালু থাকলে অনিয়ম ধরা সম্ভব। আমাদের ধারণাগুলো প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ হিসেবে দেশবাসী দেখতে পেল। নির্বাচন কমিশনও সত্যতা পেল। নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা ছিল, সেটা তারা প্রয়োগ করল।

এখন নির্বাচন কমিশনারের কাছে আমাদের একটা দাবি, গাইবান্ধা-৫ আসনে আবার নির্বাচন করতে হবে এবং অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, সে ধরনের লোকজন দিয়েই নির্বাচন করতে হবে।

গাইবান্ধা-৫ আসনের উপনির্বাচন বন্ধ করার মধ্য দিয়ে ইসির ওপর আমাদের আস্থা ফিরে এসেছে। এখানে আবার যদি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে, তাহলে তাদের ওপর আস্থা আরও দৃঢ় হবে।

প্রশ্ন :গাইবান্ধা-৫ আসনের নির্বাচন বন্ধ করার মধ্য দিয়ে ইসি কী ধরনের বার্তা দিল? সবাই কী বার্তা পেল?

জিএম কাদের : একটা বার্তা পরিষ্কার হলো, ইসির কাছে যে ক্ষমতা আছে, সেটা দিয়ে ইসি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আন্তরিক। তবে তারা সেটা পারবে কী পারবে না, সেটা নির্ভর করবে সরকারের ওপর।

প্রশ্ন : অনিয়মের কারণে গাইবান্ধার নির্বাচন বন্ধ করার মধ্য দিয়ে এই ইসির মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে কি কোনো আভাস মিলল?

জিএম কাদের : এখন পর্যন্ত সেটা নিশ্চিত নয়। কারণ এটা তো মাত্র একটা নির্বাচন হলো, যেখানে ইসি তার ক্ষমতা ব্যবহার করেছে। অন্য সব জায়গায় যদি একই রকম ঘটনা ঘটে, ইসি যদি তার ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে ও সেসব নির্বাচনও বন্ধ করতে পারে, তাহলে তখনকার মতো ঠিক হলো। কিন্তু তারপর যদি আবার নির্বাচনে একই রকম অনিয়ম হয়, ঘটনা ঘটে, তাহলে তো সমস্যার সমাধান হলো না, কোনো লাভ হলো না। আমরা সেই আশঙ্কাই করছি।

প্রশ্ন : গাইবান্ধা নির্বাচন বন্ধ করার মধ্যে কি কোনো রাজনৈতিক কৌশল আছে, নাকি এটা ইসির সদিচ্ছা? সরকারও কি চায় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু হোক?

জিএম কাদের : সরকার চাইলে তো নির্বাচন সুষ্ঠুই হতো। এখানে যারা পুলিশ, প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, রিটার্নিং অফিসার ছিলেন, তারা তো নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে কোনোখানে কোনো পদক্ষেপ নেননি। ইসি সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে পদক্ষেপ নিয়েছে। ওখানে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা তো কোনো পদক্ষেপ নেননি। ওনাদের কাছে তো পুলিশ ছিল, অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ছিল, রিটার্নিং অফিসার ছিল। রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা ছিল, তিনিই তো নির্বাচন বন্ধ করতে পারতেন। এর আগে আমরা অনেক নির্বাচনে দেখেছি অনিয়মের কারণে অনেক কেন্দ্র রিটার্নিং অফিসার বন্ধ করে দিয়েছেন, কোনো গণ্ডগোল হলে তারাই স্থগিত করতেন, বন্ধ করতেন। কিন্তু এখানে সেটা হয়নি। বাধ্য হয়ে ইসিকে সিসিটিভি দেখে নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

কাজেই ইসি এককভাবে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে পারবে না। সেটা করতে গেলে সরকারের সহযোগিতা লাগবে। সরকারের যেসব সংস্থা নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাদের সহযোগিতা করতে হবে। তারা সেটা না করলে ইসিকে ক্ষমতা দিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে যাতে ব্যবস্থা নিতে পারে। এখন তো ইসির সেই ক্ষমতাও নেই। কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলে নির্বাহী বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হয়। নির্বাহী বিভাগ সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়। সরকার চাইলেই শুধু তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

প্রশ্ন : তার মানে ইসি যদি ক্ষমতা পায় ও ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করে এবং সরকার যদি চায়, তাহলেই সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব?

জিএম কাদের : সরকার চাইতে হবে, এটাই বড় কথা। পরবর্তীকালে আসে ইসির ভূমিকা। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ইসি চায় নির্বাচন সুষ্ঠু হোক। তারা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। অবশ্য এরপরের নির্বাচন এরকম হবে কি না, সেটা তো বলা যাচ্ছে না। এ জন্য সরকারের যেসব এজেন্সি এখানে (গাইবান্ধা-৫ আসন) কাজ করেছিল, তাদের বদলাতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই পরবর্তী সময়ে যাদের দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাদের কাছে বার্তা যাবে, তারাও যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ না করে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 জি এম কাদের, চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রতীক ইজাজ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত