মোহাম্মদ আল আমিন। দেশের সেরা বক্সারদের একজন। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজের ওজন শ্রেণিতে সেরা আল আমিন অপেশাদার বক্সার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। এখন দৃষ্টি দিয়েছেন পেশাদার বক্সিংয়ে। চলতি বছর প্রো-বক্সিংয়ে পা রাখা বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে আল আমিন অনেক কথাই বললেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে
প্রো-বক্সিংয়ের ব্যানারে দেখলাম আপনার ছবি বড় করে সাঁটা। অপ্রচলিত এই ইভেন্টকে দেখছি বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন?
আল আমিন : আমি ১৯৯৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অ্যামেচার (অপেশাদার) বক্সিংয়েই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। তবে বক্সিং রিংয়ে নামার প্রথম দিন থেকেই প্রো-বক্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। অবশেষে ৩২ বছর বয়সে সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে। এখন অনেক পথ পেরুনো বাকি।
পেশাদার ও অপেশাদার বক্সিংয়ের পার্থক্যটা কী মনে হচ্ছে?
আল আমিন : দুটি একেবারেই আলাদা। অপেশাদার বক্সিংয়ে তিন রাউন্ডের খেলা। প্রতি রাউন্ড এক মিনিট করে। আর পেশাদার বক্সিংয়ে চার রাউন্ড থেকে শুরু হয়, প্রতি রাউন্ড তিন মিনিট করে। শুরুটা চার রাউন্ড হলেও ধাপে ধাপে লাইসেন্স নিয়ে ৬ রাউন্ড, ৮ রাউন্ড, ১০ রাউন্ড ও ১২ রাউন্ড পর্যন্ত খেলার সুযোগ আছে। বাংলাদেশ বক্সিং ফাউন্ডেশনের অধীনে প্রো-বক্সিং হয়। বাংলাদেশ বক্সিং ফাউন্ডেশন ওয়ার্ল্ড বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের অধিভুক্ত একমাত্র সংস্থা। বাংলাদেশের প্রো-বক্সিংয়ের সংস্কৃতি একেবারেই ছিল না। এ বছর মে মাসে আন্তর্জাতিক আসরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও প্রো-বক্সিং জগতে প্রবেশ করেছে। প্রো-বক্সিংয়ের মধ্য দিয়ে বক্সাররা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। তাই এটা প্রতিষ্ঠিত হওয়া বড্ড জরুরি।
বাংলাদেশে এর সূচনা হয় কবে?
আল আমিন : বাংলাদেশে আসাদুজ্জামান নামে একজন পেশাদার বক্সিং নিয়ে প্রথম কাজ শুরু করলেও সেভাবে কিছুই দাঁড়ায়নি। পরবর্তীতে আদনান হারুন এটা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক যোগাযোগ শুরু করেন। ওনার প্রচেষ্টায় ওয়ার্ল্ড বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনকে আওতাভুক্ত করলে আমরা এর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাই। ২০২১ সালে উনি একটা প্রদর্শনী টুর্নামেন্ট করেছিলেন। এরপর এ বছর মে মাসে আন্তর্জাতিক আসর আয়োজন করার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় পেশাদার বক্সিংয়ের।
আগে তো জানতাম অপেশাদার বক্সাররা পেশাদার বক্সিং করতে পারতেন না?
আল আমিন : এখন এই নিয়ম বদলে গেছে। এখন একজন বক্সার দুটিই করতে পারে। সেক্ষেত্রে শুধু অ্যামেচার বক্সিং ফেডারেশন ও বাংলাদেশ বক্সিং ফাউন্ডেশনকে অবহিত করতে হয়।
একটু বলবেন পেশাদার বক্সিংয়ে কীভাবে ধাপে ধাপে এগুতে হয়?
আল আমিন : আমি এখন চার রাউন্ড খেলার লাইসেন্স পেয়েছি। মে মাসে আন্তর্জাতিক আসরে একজন নেপালের প্রো-বক্সারের সঙ্গে খেলেছিলাম। সেই বক্সার দুটি প্রো-বাউটে জয়ী ছিলেন। আমার অনেক আগে থেকেই প্রো-বক্সিং খেলেন। তাকে হারিয়ে দেওয়ার পর থেকেই মনে হয়েছে আরও ওপরে যাওয়া সম্ভব। এখন আমি ঘরোয়া পর্যায়ে খেলছি। আরও কিছু গেম জয়ের পর আমি ৬ রাউন্ড লাইসেন্স পাব। এভাবে ধাপে ধাপে ১২ রাউন্ড পর্যন্ত লাইসেন্স পাওয়া যায়। আমি এখন ওয়াল্টারওয়েট বিভাগে খেলছি। এরপর মিডলওয়েটে খেলব। এভাবেই হেভিওয়েট পর্যন্ত যাওয়া যায়। যত ওপরে খেলব ততই পারিশ্রমিক বাড়তে থাকবে। তবে আমি কার সঙ্গে খেলব সেটা ঠিক করবে আমার প্রমোটর। অর্থাৎ আমাকে যে স্পন্সর করবে সে। সে-ই ঠিক করবে আমি কার সঙ্গে খেলব। কোথায় খেলব। সেই খেলায় আমার উপার্জনের একটা অংশ পাবে প্রমোটর।
অর্থাৎ যিনি প্রো-বক্সারের উদ্যোক্তা, তিনিই আপনাদের প্রমোটর?
আল আমিন : যেহেতু এই খেলার ধারণাটা আমাদের সবার মাঝে এখনো পরিষ্কার নয়, তাই তিনি (আদনান হারুন) কোনো লাভ-ক্ষতির কথা না ভেবে খেলোয়াড় তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। শুরুতে আমি হয়তো সেভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছি না। তবে জানি, পারফর্ম করতে পারলে ওপরের র্যাংকের বক্সারদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পাব। তখণ আয় বাড়বে। তাই এখন বেশি বেশি ম্যাচ খেলা জরুরি। তার জন্য প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতার। সেটারই তো বড্ড অভাব আমাদের এখানে
বক্সিংয়ে আসার পর থেকেই তো এই অভাব দেখে আসছেন?
আল আমিন : শুধু এই অভাব না। প্রথম যখন আসি তখন যে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি, ২২ বছরের ক্যারিয়ারে সেটা একরত্তিও বাড়েনি। আগে যেই জিমে অনুশীলন করতাম, সেটাই আছে। সুযোগ সুবিধার কিছুই বাড়েনি। আগেও বছরে একটা ঘরোয়া আসরে খেলার সুযোগ পেতাম, এখনও তাই। আর ভাগ্য ভালো হলে বছরে একটা আন্তর্জাতিক আসরে খেলার সুযোগ পাই। সেটাও অনেক সময় হয় না। যেকোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আগে বড়জোড় এক-দুই মাসের অনুশীলনের সুযোগ পাই। অথচ সব সময় আমাদের কাছে পদকের প্রত্যাশা থাকে।
অথচ পাশের দেশগুলো নিয়মিতই বড় বড় আসরে বক্সিংয়ে ভালো করছে।
আল আমিন : সেটা তো করবেই। যদি তুলনা করেন দক্ষিণ এশিয়ায়ই আমাদের অবস্থান অনেক নিচে নেমে গেছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এখন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। নেপালও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। এর কারণ হলো সেসব দেশে সারা বছর বিদেশি কোচের অধীনে বক্সাররা প্রশিক্ষণ নেয়। অ্যামেচার বক্সিংয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থার অধীনে বছরে ২০টার মতো টুর্নামেন্ট হয়। যার বেশিরভাগে থাকে তাদের অংশগ্রহণ। আর আমাদের ২০১৪ সালের পর থেকে কোনো বিদেশি কোচ নেই। ২০১৪ গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের আগে নয় মাস একজন ইউক্রেনীয় কোচের অধীনে আমরা যথেষ্ট উন্নতি করেছিলাম। ২০১৯ সালে বিওএর সহায়তায় ২ মাস থাইল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে ৬টি পদক জিততে পেরেছিলাম। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিযোগিতা করতে হলে যে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন সেগুলো আমাদের নেই। এমনকি ভালো সরঞ্জামাদিও নেই। টাকা-পয়সার কথা তো বাদই দিলাম। খেলাটা ভালোবাসি বলেই বক্সিং করছি।
আপনি কি বিশ্বাস করেন প্রো-বক্সিংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করতে মানুষ এগিয়ে আসবেন?
আল আমিন : আমি বিশ্বাস করি মানুষ ধীরে ধীরে আগ্রহী হয়ে উঠবেনই। কারণ এটা বিশ্বব্যাপী অনেক জনপ্রিয় খেলা। মানুষ কোটি কোটি টাকা বাজি ধরে প্রো-বক্সিং দেখেন। এদেশেও অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান আছে, যারা একটু সদয় হলেই আমরা প্রো-বক্সিংকে এগিয়ে নিতে পারব। আগেই তো বলেছি, ধাপে ধাপে লাইসেন্স নিতে পারলে ভবিষ্যতে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে প্রো-বক্সিং দিয়েও চেনানো সম্ভব। অনেক নেইয়ের মাঝেও প্রো-বক্সিং আমাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
