আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলতে উন্নয়ন সমীক্ষা সমীকরণে গুণগতমানের বাছ-বিচারের পরিবর্তে কীভাবে বছর বছর অর্থনীতিকে মোটাতাজা (প্রবৃদ্ধি) দেখানো যায় সে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বিস্তর চলে। কয়েক দিন ধরে পর্যালোচনাকারীদের মুখে ছাই দিয়ে ‘করোনাকালেও জিডিপির চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধি, রেভিনিউ আর্নিং বেগবান হয়েছে’ ইত্যাদি নিয়ে ট্রেজারি ও চিন্তা চৌবাচ্চার (থিঙক ট্যাঙক) মধ্যে দড়ি টানাটানি চলেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এতে স্বয়ং উন্নয়ন অর্থনীতিরই বিব্রত হচ্ছে।
এটা ঠিক বাংলাদেশের পরিসংখ্যান দপ্তর গত অর্ধযুগ ধরে মোটা দাগের পাঁচ পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নেই আছেকীভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির ঊর্ধ্বগামিতা সত্যায়ন শনাক্ত করা যায়। ২০১৯-২০-এর এডিপিতেই ছিল এসব প্রকল্প(১) ডেটা কনভারশন, মেটা ডেটা প্রিপারেশন অ্যান্ড টাইম সিরিজ ডেটা কম্পাইলেশন, (২) সার্ভেইস অ্যান্ড স্টাডিজ রিলেটিং টু জিডিপি রিবেসিং ২০১৫-১৬, (৩) ইম্প্রুভিং অব জিডিপি কম্পাইলেশন অ্যান্ড রিবেসিং অব ইনডিসেস প্রজেক্ট, (৪) ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব স্টেটেস্টিকস ইমপ্লিমেন্টেশন সাপোর্ট (এনএসডিএস), (৫) মডার্নাইজেশন অব ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্টাস্টিকস প্রজেক্ট।
একটা দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (বা জিডিপি) হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ওই দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রম, পুঁজি ও অন্যান্য উপকরণ বিনিয়োগ করে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবাজাত দ্রব্য উৎপাদন করা যায় তার টাকার অঙ্কে হিসাব, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হচ্ছে ওই উৎপাদন কী হারে বাড়ছে তার পরিমাণ, যেমন : ২০১০-১১ অর্থবছরে (এবং সেই সময়ের বাজারদরে) বাংলাদেশে প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকার পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় এবং এটা ছিল সে বছরের বাংলাদেশের জিডিপি বা অর্থনীতির আকার। পরের বছর (২০১১-১২) অর্থনীতির আকার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির হার ৬.৩ শতাংশ।
প্রবৃদ্ধি সংগঠিত হয় শ্রমশক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ, পুঁজি সঞ্চয় (ভৌত ও মানব), প্রযুক্তির পরিবর্তন ইত্যাদির অবদানের কারণে আর এগুলোকে বলে উৎপাদনের উপকরণ বা ফ্যাক্টরস অব প্রডাকশন। অন্যান্য অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি ঘটলে মানুষের কর্মসংস্থান, আয় এবং জীবন কুশলতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা জাগে এবং এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটায়।
সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি স্থির থাকলে জাতীয় আয় বৃদ্ধি সাপেক্ষে সমাজে সবারই কিছু না কিছু আয় বৃদ্ধি ঘটে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য সব সমস্যার সমাধান করে দেয়। যেমন : সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি। কথায় বলে, টাকা থাকলে বাঘের চোখ কেনা যায়।
কিন্তু টাকা থাকলেই যে উন্নয়ন চোখে দেখা যাবে এমন কোনো কথা নেই। উন্নয়নের জন্য আয় বৃদ্ধির দরকার হবে, যদিও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটলেই জনগণের উন্নয়ন ঘটবে এটা নিশ্চিত নয়; আর এজন্যই বলা হয়ে থাকে যে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি উন্নয়নের দরকারি শর্ত পূরণ করে, তবে যথেষ্ট শর্ত পূরণ করে না।
আয় বৃদ্ধি ঘটলে আমজনতার চাওয়া অমরত্ব না হলেও অন্তত রোগ-শোক, দুর্দিন-দুশ্চিন্তামুক্ত অপেক্ষাকৃত একটা দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করা যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হতে পারে, এই দীর্ঘ জীবন কত দীর্ঘ? অনুমান করা যেতে পারে গড়পড়তা ৭০-৭৫ বছর বাঁচতে পারাটা স্বস্তিদায়ক, ৭৫-৮০ বছর টিকে গেলে আরও বেশি ভালো এবং ৮০ বছর এর ওপর বাঁচতে পারলে তো কোনো কথাই নেই।
লক্ষ করা গেছে যে, সময়ের বিবর্তনে মাথাপিছু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ুও বাড়ছে। যেমন : ১৮২০ সালে ভারতে গড় আয়ু ছিল ২১ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৪০ বছর, কিন্তু ১০০ বছরের ব্যবধানে ভারতে গড় আয়ু মাত্র ৩ বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ বছর আর একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ১০ বছর আয় বেড়ে ৫০ বছরে পৌঁছে; তারও প্রায় ১০০ বছর পর (১৯৯৯) ভারতে প্রত্যাশিত আয়ু ছিল ৬০ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৭৭ বছর এবং বাংলাদেশে প্রত্যাশিত গড় আয়ু ১৯৮১ সালে ছিল প্রায় ৫৫ বছর আর ২০১৮ সালে প্রায় ৭০ বছর এবং এভাবেই সমাজে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে বৈশ্বিক বৈষম্য প্রকট হতে পারে।
একটা নির্দিষ্ট উদাহরণ দেওয়া যাক, বাংলাদেশে ১৯৭৩/৭৪ সালে গড়পড়তা মাথাপিছু আয় ছিল ১০০-১৫০ ডলার এবং সে সময় বৈষম্য নির্দেশক গিনি সহগ ছিল বড়জোর ০.৩৫, অথচ এখন (২০২০) মাথাপিছু আয় ২০০০ ডলার প্লাস, কিন্তু গিনি সহগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৪৬; সবার আয় বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু ধনীর বেড়েছে গরিবের চেয়ে অনেক বেশি হারে অর্থাৎ সময়ের বিবর্তনে দেশটিতে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
কথা হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রধান সমস্যা হলো বৈষম্যের স্তর বড় হতে থাকলে প্রবৃদ্ধির দারিদ্র্য হ্রাস-সংক্রান্ত প্রভাবটি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
একটা অপেক্ষাকৃত সাম্যবাদী সমাজে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটুকু দারিদ্র্য হ্রাস করাতে পারে, একটা বৈষম্যমূলক সমাজে তার চেয়ে অনেক কম গতিতে দারিদ্র্য হ্রাস ঘটায়। লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশে (যেমন : ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা) প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি কিন্তু তার বিন্যাস এতটাই বেদনাদায়ক এবং নির্মম যে মনে হবে ওই দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধিকে উপহাস করছে দারিদ্র্য।
প্রবৃদ্ধি বাড়লে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটতে পারে কিন্তু প্রবৃদ্ধি ঘটা মানেই উন্নয়ন নয় এবং উন্নয়ন যেখানে আছে সেখানে অবশ্য মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটেছে বলে ধরে নিতে হবে। কিন্তু মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ঘটেছে বলেই সেখানে উন্নয়ন ঘটেছে এ কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। বস্তুত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন তখনই একসঙ্গে যেতে পারে যখন অপেক্ষাকৃত সাম্যমূলক নীতি গ্রহণ করা যায়।
মোটকথা, এত দিন উন্নয়ন ডিসকোর্সে মানুষের ‘স্বত্বাধিকার’ ও সেই স্বত্বাধিকার থেকে পাওয়া ক্ষমতার দিকে খুব একটা নজর দেওয়া হয়নি অথচ অর্থনৈতিক উন্নয়নের চরম লক্ষ্য হওয়া উচিতমানুষের সক্ষমতা সৃষ্টি। রোগ প্রতিরোধের অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রতিষেধকপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, গুণগত শিক্ষালাভের সুযোগ কী করতে পারছে বা কী পারছে না; সেটাই উন্নয়ন তত্ত্বের আলোচ্য হওয়ার কথা। আমজনতা অকালমৃত্যুকে জয় করতে পারছে? তার কি যথেষ্ট পুষ্টির ব্যবস্থা হয়েছে? সে কি পরস্পর চিন্তার আদান-প্রদান করতে পারছে বা শিখেছে? অমর্ত্য সেনের ভাষায় ‘মানুষের সক্ষমতা প্রসারের প্রক্রিয়াটিই আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন’।
আরেকটি টাটকা উদাহরণ আলোচনায় আনা যায়। বাংলাদেশে কর ও জিডিপির অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বেশ কম। বোঝা যায় তিন কারণে এ দেশের কর ও জিডিপি অনুপাত অনেক কম। (এক) আওতার সীমাবদ্ধতা, পরিধিগত ঘাটতি। সব যোগ্য করদাতা ও খাতকে করজালের মধ্যে আনতে পারার দীর্ঘসূত্রতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অপারগতা, অক্ষমতা। (দুই) ব্যাপক কর ছাড়, কর রেয়াত, কর ফাঁকি, মামলায় আটকানো, কর্তন কিংবা আদায় করা কর রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়া, (তিন) রাজস্ব বিভাগের দক্ষ লোকবলের অভাব, অদক্ষতা, অপারগতা, মনিটরিংয়ের দুর্বলতা, কর আইন ও আহরণ এবং প্রদান পদ্ধতির জটিলতা, মনোভঙ্গি পরিবর্তনের আবশ্যকতা।
এ ক্ষেত্রে কর আহরণকারীর সঙ্গে করদাতার দূরত্ব যত কমবে তত আস্থা গড়ে উঠবে, করারোহণের পালে হাওয়া লাগবে। পৃথিবীর শতাধিক দেশে কর ন্যায়পাল অফিসের অস্তিত্ব পরস্পরের আস্থা সৃষ্টির দ্যোতক হিসেবে কাজ কাজ করলেও বাংলাদেশে তাকে প্রারম্ভিক ওভারে রানআউট করে সাজঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জিডিপি বা অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে, অথচ সক্ষম সব করদাতা এবং প্রযোজ্য সব খাত করজালের আওতায় আসেনি। ফলে কর ও জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। যেকোনো দেশে জিডিপির অন্তত ১৫-১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরিত হয়। কিন্তু এ দেশে কর জিডিপির অনুপাত ১০-১১ শতাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ঘোরাফেরা করছে। এর মানে হয় জিডিপির বৃদ্ধি কাগজে-কলমে (কাজির খাতায়) বাস্তবে তা শামিল নেই অথবা এখনো জিডিপির হিস্যা অনুযায়ী অর্জিতব্য কর অনাহরিত থেকে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ৫-৬ শতাংশের একটা ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে। বলাবাহুল্য, এ দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান এখনো বেশি। কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এই প্রবৃদ্ধিতে সার্বিকভাবে কৃষির অবদানই বেশি।
গত দশ-বারো বছরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হোক, বন্যা হোক বা ব্যাপক ফসলহানি হোক, সিডর বা আইলার পরে এবার করোনা, আম্ফান, বিদ্যমান বন্যা, সিত্রাং ছাড়া আর বড় ধরনের অঘটন ঘটেনি। এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের অর্থনীতি হঠাৎ করে বড় হচ্ছে। এটি ধারাবাহিকভাবে গ্রো করেনি। সব খাত ও ক্ষেত্রকে স্বাভাবিক স্পর্শ বা পরিপুষ্ট করে বা করতে এই গ্রোথ দৃশ্যমান হয়নি। সে কারণেই খোদ জিডিপির চেয়ে এর অসার গ্রোথ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের পর্যালোচনাই পছন্দ সবার। অথচ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির গুণগত মান নিশ্চিত ব্যতিরেকে উন্নয়ন অর্থবহ হবে না, হয়নি কোথাও।
লেখক: উন্নয়ন ও অর্থনীতির বিশ্লেষক
