ব্রেথলেস

দৌড়াতে দৌড়াতে বড় হয়ে যায় জসীম, বেলমন্দো যায় লন্ডন থেকে প্যারিস

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২২, ০৭:২৯ পিএম

রেনে দেকার্তের কার্তেশিয়ান ফিলোসফিতে ‘ইল্যুশানের সাথে আর্গুমেন্ট’ ছিলো প্রকট; অর্থাৎ, প্রশ্নকর্তা যখন জিজ্ঞেস করছে, Why do you love me? উত্তরে বলা হচ্ছে, I love you cause i love you! এই ‘সহজতম কঠিন দ্বিধা’ ভর্তি সিনেমা ব্রেথলেস (১৯৬০)। জ্য লুক গদার তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রয়োগ করেছেন This cinema has its beginning, middle and an end... But not in order!

অথর থিওরি মোতাবেক সিনেমায় নির্মাতাই একমাত্র সিগনেচার। তার সিগনেচারই দেখা যাবে সিনেমাজুড়ে। ‘ব্রেথলেস’ এ এই মূল ‘অথর’ ছিলেন তিনিই। সিনেমাটি তৈরির আগে সমালোচকদের তোলপাড়, প্রযোজকের দেউলিয়া হওয়ার পরও ঝুঁকি নিয়ে তৈরি হচ্ছিলো এই সিনেমা। গদার স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাতে চাননি। চিত্রনাট্যের সারমর্মে বললেন, এখানে একজন সারাক্ষণ মৃত্যু ভয়ে থাকে, আরেকজন মৃত্যুকে ভয়ই পায় না।

ওপরের এই কথার ঝাঁজ বোঝা যায় সিনেমা শুরু হলে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়, ষাটের দশক, আমেরিকান ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের উত্তাল সময় আর সেই ওয়েস্টার্ন ধারাকে ফ্রান্সে নিয়ে এলো ‘মনোগ্রাম’ নামক ডিস্টিবিউটর। এর আগে ফরাসী সিনেমায় এমন নূতন কিছু দেখা যায়নি। নূতনত্বটা কী? নূতন ভাবে ক্যামেরার একশন, সাটেল ভাবে ওয়েস্টার্ন সিনেমার নানান ম্যাটেরিয়াল (একটু পরেই সেটা লিখছি), গল্প বলার ধরণ। এই নব্য ধারাই হলো ‘নুভেল ভাহ’ বা ফরাসি নবতরঙ্গ। ‘ব্রেথলেস’ নুভেল ভাগের অন্যতম সৃষ্টি।

সিনেমার শুরুতেই উৎসর্গনামায় ‘মনোগ্রাম পিকচার্স’ এর নাম আসে। কেন, তা ওপরেই লিখলাম। এরপর ফরাসীতে সিনেমার নামটি যখন পর্দায় আসে, 'à bout de souffle', তখনই মনে হয় লেখাটি আটকে যাচ্ছে দু পাশ থেকে। সিনেমার প্রথম ডিসক্লেইমারে শুধুমাত্র নাম দিয়ে দেওয়ার নজির আমাদের অচেনা নয়। গোটা গল্পের সারমর্ম শুধুমাত্র সিনেমার নাম দিয়েই বোঝানোর যে চমক তা আমাদের ‘নায়ক’ সিনেমার ‘য়’ এর নিচে তারকা চিহ্ন কিংবা ‘পথের পাঁচালি’র টাইপোগ্রাফির ডিজাইনেও দেখা যায়।

নুভেল ভাগে শুধুমাত্র পরিচালক, প্রযোজক নয়, কিছু অভিনেতাও উঠে এসেছিল ‘মূল’ হয়ে। বেলমন্দো এই সিনেমার ওয়েস্টার্ন নায়কটি। যে কিনা মোরাল ভ্যালুহীন এক গাড়িচোর। যে মেয়েটি তাকে লিফট দিলো, তার সামনেই সে গাড়ি চুরি করে পালালো.. রোদ ঝলমলে সূর্যকে দেখে তার ইচ্ছে করলো ঠা ঠা করে সূর্যকে গুলি করতে...। কিন্তু পুলিশ যখন তাকে ধাওয়া করে, সে তখন পালানোর সময় গুলি করে দেয় পুলিশকে। ব্রেথলেসে এখানে সূর্যকে গুলি করবার কল্পনা আর পুলিশকে মেরে ফেলা বাস্তবতার ইলুশান দেখান গোদার। এখানে পিস্তলের নব ঘোরানোর যে ক্লোজআপ, তাতে বোঝা যায় মনোগ্রামের ওয়েস্টার্ন রীতি।

জাম্পকাট কেবলমাত্র আমাদের বাংলা সিনেমাতেই না... দৌড়াতে দৌড়াতে নায়ক জসীম যেমন বড় হয়ে যাচ্ছে, বেলমন্দোও যে লন্ডন থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে চলে এলো, তা নোতরদাম এর দৃশ্যটি থেকে বোঝা যায়। এই সিনেমা তিনদিনের ঘটনাতেই শেষ। একদিন নোতরদাম দিয়ে শুরু, আরেকদিন আইফেল টাওয়ার, আর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার শেষ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘আইরিশ ফেড’।

বেলমন্দো মূলত তার প্রেমিকা পার্তিসিয়ার তথা জিন সেবার্গের কাছে আসে। পার্তিসিয়ার স্ট্রাইপড জামা, কথা বলার এক্সেন্ট আর শহরের গাড়িগুলো সবই ওয়েস্টার্ন। নাগরিক জীবন, নগরায়ন... এই সবের ম্যানিফেস্টেশন ব্রেথলেসের উল্লেখযোগ্য উপাদান। তবে মূল উপাদান কী? সে উত্তর গুটিকয়েক শব্দে দেওয়া কঠিন বোধহয়।

কেবল এই সিনেমাটিতে অদ্ভুত এক প্রেমের গল্প জায়গায় জায়গায় ধাক্কা দেয়। এই প্রেমে বারবার জিজ্ঞেস করা হয়, will you go with me in Rome? এই রোম কী কেবলই শহর? নাকি রোমান্স, ভালোবাসার এক প্রস্তাব! যেই প্রস্তাবটি পার্তেসিয়া ঠিক গ্রহণ করে উঠতে পারে না! কোথায় যেন অনিশ্চয়তা!

দুজনেই বারংবার আয়নায় নিজেদের দেখে! এই এতদিনের পরিচয়েও তাদের মধ্যে যেন ‘পরিচিতি’টা নেই। প্রেমিকাকে ভালোবেসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নানান কাজ করতে থাকে বেলমন্দো, আবার প্রেমিকা শরীরীভাবে কাছে আসতে চায় না বলে সে-ই (বেলমন্দো) গালিগালাজ করে মনে মনে!

দুজনেই অকপটে বলে যায় কার কজন শয্যাসঙ্গী... আবার মূহুর্তেই উদাস হয়ে যায়, ভাবতে বসে- কেউ কী আমার মতন করে ছুঁয়েছে?

তাহলে কেমন এই প্রেম? বেলমন্দো যেমন বললো, I love you, but not the way you think...

কেমন সে ওয়ে, তা জানা যায় না... কেবল এই প্রেমে যেন ডুবে যায় প্যারিস শহর... ক্যামেরা মোজার্টের সুরের সাথে পুরো প্যারিসের সকল আর্কিটেকচারের ওপর দিয়ে চলে যায়... মানুষের সম্পর্কের আর্কিটেকচার! যেন গোটা শহরের সকল দালানের প্রেম একসঙ্গে গান গাইছে, কোনো গানে নিশ্চয়তা হয়তো আছে... আবার কোনো গানে কেবলই ভালোবাসা!

এখানে জিন আর বেলমন্দোর মার্কিন-ফরাসি জাতিগত পরিচয় দিয়ে হঠাৎ করে ব্যঙ্গ করা হয় ‘ফ্রান্স-আমেরিকান’ চুক্তিকে। একটা ইন্টারভিউয়ের সিনে পারভুলেস্কোকে স্বয়ং পিয়েরে মেলভিলেকে দেখানো, নানান দেশের মানুষের সাথে এক অ্যারাবিয়ান নারী, পেরভুলেস্কোর বুদ্ধিদীপ্ত মিমিক এই সিনেমার রাজনৈতিকতার কিছু উদাহরণ।

তবে একটি ডায়লগ মাথায় ঢুকে আছে, যখন পেরভুলেস্কোকে জিজ্ঞেস করা হলো তাঁর সবচে বড় ভীতি কী? একটু থেমে উত্তরে বললেন To be immortal and then die

এই সিনেমা পুরোটাই প্রচণ্ড রাজনৈতিক, প্রচণ্ড রোমান্টিক। সেই রোমান্টিসিজম তীব্র ফিজিক্যাল, এতে তীব্র ন্যাশনালিজম মিলেমিশে আছে।

খুব সাধারণ এই সিনেমা না। আবার হয়তো খুবই সাধারণ। আমার আপনার এই কনফিউজড জীবনের মতন! যেখানে রোজ রোজ আয়নায় দেখি নিজেদের...  প্রিয়জনের চোখে তাকাই, চিনতে পারি না! মৃত্যুর আগ মূহুর্তে যেখানে জমে থাকে ঘৃণা... তিক্ততা, কষ্ট আর তীব্র ভালোবাসা! ভালোবাসা এত বিচিত্র কেন? Cause there is no happy love?

লেখক: শিক্ষার্থী অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত