বাউল-সাধুদের উচ্ছেদে নির্মম মারধর, তীব্র ক্ষোভ

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ০৮:০৬ পিএম

কুষ্টিয়ায় বাউল-সাধুদের উচ্ছেদের উদ্দেশে তাদের ওপর হামলা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। 

অভিযোগে জানা গেছে, গত ৫ নভেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার লাউবাড়িয়া এলাকায় ভক্তের বাড়ি সমবেত হয়েছিলেন সাধুরা। সেখানে অতর্কিত হামলা চালিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে বেশ কিছু বাউল ভক্তদের রক্তাক্ত জখম করা হয়। স্থানীয় লাউবাড়িয়া উত্তরপাড়া জামে মসজিদের সভাপতি একরাম হোসেনের নেতৃত্বে শতাধিক ব্যক্তি এ হামলা করেন বলে অভিযোগ। 

বাউল-সাধুরা জানান, এশার নামাজের পর স্থানীয়দের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত ছয় সাধুসহ মোট সাতজনকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এমনকি সেখানে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বাউল ফজল ফকিরসহ (৯০) পিটিয়ে জখম করা হয়েছে নারী বাউলদেরও।

হামলার প্রতিবাদে জেলার বাউল-সাধুসহ ফুসে উঠেছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। শনিবার কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া লালন শাহ মাজার চত্বরে এবং মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় দৌলতপুর উপজেলা চত্বরে ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন তারা। 

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, উপজেলার লাউবাড়িয়া গ্রামে পলান ফকিরের বাড়িতে চলছিল বাৎসরিক সাধুসঙ্গ। জেলা ও জেলার বাইরে থেকেও বাউল-ভক্ত-সাধুরা সমবেত হন সেখানে। তারা নিজস্ব ঘরানায় সাধুসঙ্গের নিয়ম অনুযায়ী সন্ধ্যায় গুরু-শিষ্যের ভক্তি কর্ম সেরে নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় বসেন। কেউ কেউ এ সময় সারছিলেন জলযোগ। এরই মধ্যে এশার নামাজের পর স্থানীয় জামে মসজিদের সভাপতি একরাম হোসেনের নেতৃত্বে শতাধিক লোক একযোগে পরিকল্পিতভাবে অতর্কিতে হামলা চালায় সাধুদের ওপর। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রসহ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে তারা। একপর্যায়ে সাধুসঙ্গের ওই বাড়ি ভাঙচুর করে ঘরে সমবেত সাধুদের বেধড়ক মারপিট করে।

হামলায় রক্তাক্ত জখমসহ গুরুতর আহত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন ফজল ফকির (৯০)।  

তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে মুড়ি-চানাচুর খেতে খেতে নিজেদের কুশল বিনিময় করছিলাম; এ সময় হঠাৎ ঘরের চালে দুমদাম করে ইট-পাটকেল এসে পড়ছিল। এরপর একসঙ্গে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে ভেতরে ঢুকে নির্বিচারে লাঠি ও রড দিয়ে পেটানো শুরু করে। আমি তাদের কাছে  জোড় হাত করেও রক্ষা পাইনি। হাইসু (হাসুয়া) দিয়ে কুপিয়ে এবং লাঠিসোঁটা দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে সাধুসঙ্গ ভন্ডুল করে দেয়’। 

আহত সাধুরা জানান, সেখানে কোনো, মাইক বা সাউন্ডবক্স ব্যবহার করা হয়নি। কোন বাদ্যযন্ত্র ছিল না, গান-বাজনাও হয়নি, আগে আমাদের কেউ কোনো অভিযোগও জানায়নি। হঠাৎ বাড়ির চারপাশে কিছু লোক ঘিরে ফেলে এবং ইটপাটকেল ছুড়ে ভাঙচুর করে। তারা বাড়িতে প্রবেশ করে উপস্থিত ১৫-২০ জন আমাদের তারিকার মানুষকে বেধড়ক লাঠিপেটা করে, বৃদ্ধ বা নারী কাউকেই ছাড় দেওয়া হয়নি। 

তারা অপরাধীদের শাস্তি দাবি করেন।

অভিযোগ বিষয়ে কথা জানতে মসজিদ কমিটির সভাপতি একরাম হোসেনকে পাওয়া যায়নি তার বাড়িতে। তার মেয়ে বলেন, ‘আমার আব্বা তিন বছর ধরে ওদের এই সাধুসঙ্গ বন্ধ করার জন্য বলে আসছে। ওরা কোনো কথা শোনেনি বলেই গ্রামের লোকজন মসজিদে বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধুদের উচ্ছেদ করেছে।

সরেজমিনে আলাপকালে মসজিদ কমিটির অপর এক সদস্য বলেন,‘এই গ্রামে হয় মসজিদ থাকবে নয়তো সাধুর আস্তানা থাকবে’ ওরা পারলে এই লোকালয় থেকে তফাৎ গিয়ে ওই মাঠের মধ্যে আস্তানা গাড়ুক, কেউ দেখতে যাবে না’। 

এ ঘটনায় ফুসে উঠেছে জেলার বাউল সাধুরা। তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। 

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল আলম জানান, গত ৫ নভেম্বর দৌলতপুরে বাউলদের ওপর হামলার ঘটনায় ১৯ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনায় জড়িত অভিযোগ এনে ইতিমধ্যে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়েছে। আসামি ধরতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। সেখানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

দৌলতপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক(ওসি) মজিবর রহমান জানান, ‘সাধুদের ওপর  হামলার মামলায় এজাহার নামীয় ১৮ জন ইতিমধ্যে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন। শুধু বাবুল হোসেন ওরফে বাবলু নামের একজন জেলহাজতে আছেন’। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত