দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম জর্জিয়া মেলোনির মতো কট্টর ডানপন্থি শাসক পেল ইতালি। দেশটির জনগণই তাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ফ্যাসিবাদী মতাদর্শধারী মেলোনির প্রধানমন্ত্রী হওয়া ইতালির বাস্তবতায় খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তার এই উত্থান দুশ্চিন্তায় ফেলেছে দেশটিতে বাস করা অবৈধ অভিবাসী বিশেষ করে মুসলমানদের। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
ডানপন্থি নেতৃত্ব
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ইতালির জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হন ব্রাদার্স অব ইতালির নেতা জর্জিয়া মেলোনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব পেল কট্টর ডানপন্থি একটি দল। মেলোনির নেতৃত্বে জোট সরকারে ব্রাদার্স অব ইতালির সঙ্গে থাকছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনির মধ্য-ডানপন্থি রাজনৈতিক দল ফরৎসা ইতালিয়া ও মাত্তেও সালভিনির ডানপন্থি দল লিগ। নির্বাচনে এই তিন দল প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পায়। কট্টর ডানপন্থি শাসনে ইতালির রাজনীতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার মতো যোগ্যতা ও দক্ষতা মেলোনির আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের মানুষের কাছে তিনি কট্টর ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত হলেও সম্প্রতি তার গলা থেকে মধ্যপন্থার সুর ভেসে আসতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যাস মাড বলেন, ‘ইতালির এবারের নির্বাচন অন্যবারের চেয়ে আলাদা কারণ নির্বাচনে জিতে মেলোনি শুধু ইতালির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই হননি, একই সঙ্গে তিনি এখন আধুনিক পশ্চিম ইউরোপের প্রথম কট্টর ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী। তার উত্থানে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কট্টর ডানপন্থি দল ও মতাদর্শ কমপক্ষে দুই দশক আগে ইউরোপীয় রাজনীতির মূলধারার অংশ হয়ে যায়।’
ডানপন্থার শেকড়
১৯৪৫ সালে ফায়ারিং স্কোয়াডে ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনির মৃত্যু হয়। এরপর ইতালীয় প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির দায়ভার মুসোলিনির স্বৈরাচারী আদর্শের বিরোধিতাকারীদের ওপর পড়ে। চল্লিশের দশকে মুসোলিনির মৃত্যু ফ্যাসিবাদের কবর রচনা করেনি, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপে ফ্যাসিবাদ বহাল তবিয়তে আছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর অ্যানালিসিস অব দ্য র্যাডিকেল রাইটের ফেলো আলেকজান্ডার রিড রস বলেন, ‘ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা ও শিল্প ব্যবস্থাপকদের অনেকে মুসোলিনির শাসন নিয়ে দীর্ঘদিন স্মৃতিকাতর ছিলেন। ওই ফ্যাসিস্ট নেতার প্রতি তারা তাদের ভালোবাসা ও আনুগত্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতেন না। মুসোলিনি-পরবর্তী সময়ে সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে ইতালির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত ধীর ছিল। এ ছাড়া দুর্নীতিও ব্যাপক ডালপালা মেলে। এসব পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়েন ইতালির সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের হতাশা দিনকে দিন বাড়তে থাকে।’ ফ্যাসিবাদের পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া থেকে বেশির ভাগ ইতালীয় বিরত থাকলেও ইতালিয়ান সোশ্যাল মুভমেন্ট (এমএসআই) এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল। ১৯৪৬ সালে এই রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন মুসোলিনির নেতৃত্বাধীন শেষ সরকারের চিফ অব স্টাফ জর্জিও আলমিরান্তে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালির পরাজয়ের পর ফ্যাসিবাদের সমর্থকদের নিয়ে কমিটি গঠন করে এমএসআই। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলেত্রা আরদিসিনো ও এরিক জোনস জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হারের পেছনে অনেক ইতালীয় ফ্যাসিবাদকে দায়ী করতে রাজি নন। তাদের মতে, মুসোলিনির নাৎসি জার্মানির সঙ্গে হাত মেলানোর সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তার এই সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধে ইতালি হেরে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে কর্র্তৃত্ববাদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়, যা ইতালির ক্ষেত্রে ঘটেনি। সে সময় তো নয়ই, বর্তমান সময়েও ইতালীয়রা মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড ভুলে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ডেভিড কার্টজার জানান, ইতালিতে একসময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ৬৭টি প্রতিষ্ঠান। সেই ইতালিতে ইতালীয় ফ্যাসিবাদ অধ্যয়ন নিয়ে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বরং মুসোলিনি ও তার শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলিই চোখে পড়ে বেশি। মুসোলিনির শাসনামল নিয়ে জাতীয় স্মৃতিভ্রংশের কালে গড়ে ওঠা এমএসআই স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইতালির রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে না পারলেও একেবারে ফেলনা ছিল না। ইতিহাসবিদ পল গিনসবর্ড তার ‘দ্য হিস্টোরি অব কনটেম্পরারি ইতালি’ বইয়ে বলেন, ইতালির রাজনীতির মাঠে থেকে এমএসআই শহুরে দরিদ্র, নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও শিক্ষার্থীদের বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকে, কর্র্তৃত্ববাদ ও জাতীয়তাবাদ একসঙ্গে পথ চলতে পারে।
নব্বইয়ের দশকে এমএসআইয়ের রাজনৈতিক নির্বাসনের সমাপ্তি ঘটে। সে সময় দলটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জিও আলমিরান্তের শিষ্য জিয়ানফ্রাঙ্কো ফিনি ইতালির রাজধানী রোমে মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তিনি পরাজিত হলেও তার দল ৪৬.৯ শতাংশ ভোট পায়। বিপুল ভোট পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই ইতালির রাজনীতির অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়ে পরিণত হয় এমএসআই ও ফিনি। একপর্যায়ে এমএসআইয়ের নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স রাখেন ফিনি। ২০০৯ সালে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ব্রাদার্স অব ইতালি গঠন করেন তরুণ সদস্য জর্জিয়া মেলোনি। এমএসআই বা ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ও ব্রাদার্স অব ইতালির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি। একই সঙ্গে সে সময় কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিরও স্বাভাবিকীকরণ ঘটে। বারলুসকোনিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিকে মূলধারায় নিয়ে আসেন। ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তার নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে একবার নয়, পরপর তিনবার ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। বারলুসকোনি সে সময় গর্ব করে বলেছিলেন, ১৯৯৪ সালে কট্টর ডানপন্থি দল লিগ ও ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে জোট করে তিনি মধ্য-ডান জোটের উদ্ভাবন করেন। ইতালির নেতৃত্বে আলোচিত নব্য ফ্যাসিস্টদেরও নিয়ে আসেন বারলুসকোনি।
মেলোনির অবস্থান
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মেলোনি ও তার দল ব্রাদার্স অব ইতালির মতাদর্শকে ফ্যাসিবাদী হিসেবে অভিহিত করলেও দেশটির সংবাদমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে বেশ নমনীয় থাকতে দেখা গেছে। তারা মনে করে, নির্বাচনে মেলোনি জয়ী হওয়ার পেছনে নীতির চেয়ে তার রাজনৈতিক বহিরাগত পরিচয় বড় ভূমিকা পালন করে। ইতালির আগের জোট সরকারে কখনো মেলোনির দল ছিল না। এ কারণে তাকে রাজনীতির মাঠে বহিরাগত হিসেবে দেখা হয়। এ ছাড়া মেলোনির পক্ষ নিতে গিয়ে ইতালীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে এও বলা হয়, যদি তিনি ফ্যাসিস্ট হয়েও থাকেন, তাকে যারা ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন, তারা তো ফ্যাসিস্ট নন। নির্বাচনের আগে ইতালির ডানপন্থিরা উদ্বিগ্ন সময় কাটান। ডানপন্থি দলগুলোর প্রতি মানুষের সমর্থন হ্রাস পাওয়া এর প্রধান কারণ। করোনাভাইরাস মহামারীর আগে অনেকে ভেবেছিল মেলোনি হয়তো পার্টির পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন কারণ সে সময় ব্রাদার্স অব ইতালির জনসমর্থন অনেক কমে যায়। উপ-প্রধানমন্ত্রী ও কট্টর ডানপন্থি দল লিগের নেতা মাত্তেও সালভিনির বিরুদ্ধে তখন দুর্নীতি ও রাশিয়ার সঙ্গে চক্রান্তের অভিযোগ উঠলে মেলোনির দল ফের আলোচনায় আসে।
মেলোনির ব্রাদার্স অব ইতালিকে ফ্যাসিস্ট দল বলতে রাজি নন লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক মারিয়ান্না গ্রিফিনি। তিনি বলেন, ‘মেলোনির চিন্তাভাবনায় উগ্রপন্থার ছাপ থাকলেও ব্রাদার্স অব ইতালিকে নব্য ফ্যাসিস্ট দল বলা ঠিক হবে না। এমএসআই থেকে এই দলটির জন্ম হলেও এই দুই দল একই মতাদর্শের নয়। মেলোনি নিজেকে মূলধারার রক্ষণশীল ঘরানার মানুষ মনে করেন। ব্যক্তির স্বাধীনতা, অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা, পারিবারিক কেন্দ্রিকতা ও সমাজে এর ভূমিকা, অবৈধ অভিবাসন রোধে সীমান্তে সুরক্ষা, ইতালীয় জাতীয় পরিচয়এ বিষয়গুলো আমাদের চিন্তায় প্রাধান্য পাচ্ছে বেশি। এসব ইস্যুতে মেলোনির অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আমরা তাকে বিচার করছি।’ গ্রিফিনির এই বক্তব্যের সঙ্গে অবশ্য অনেকে একমত নন। তাদের মতে, এমএসআই ও ব্রাদার্স অব ইতালির মধ্যে তেমন কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড মোন্যাকো এ বিষয়ে বলেন, ‘মুসোলিনির দল ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি ও ব্রাদার্স অব ইতালি কাছাকাছি গোত্রের। এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা জরুরি। ব্রাদার্স অব ইতালি ফ্যাসিবাদের নাতি হতে পারে, তার অর্থ এই নয়, ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি ও ব্রাদার্স অব ইতালি হুবহু একই। সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা থেকে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। রাষ্ট্র, গির্জা, পরিবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে মুসোলিনির চিন্তাধারার প্রতিফলন মেলোনির মধ্যে দেখা যায়। তা সত্ত্বেও ব্রাদার্স অব ইতালির এই নেতার মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার আকাক্সক্ষাও বর্তমান। সহিংসতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান বা গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার পক্ষপাতী তাকে এখন পর্যন্ত মনে হয়নি।’ এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, মেলোনি ও নব্য ফ্যাসিস্ট এমএসআই মতাদর্শের দিক থেকে একেবারে আলাদা, তা বলা যাবে না। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে মেলোনি ছিলেন এমএসআইয়ের একজন গর্বিত সদস্য। দলটির ঐতিহাসিক সদর দপ্তর তার কারণে এখনো টিকে আছে। এ ছাড়া ব্রাদার্স অব ইতালির লোগোতে যে তিরঙ্গা অগ্নিশিখা আছে, তা ফ্যাসিবাদেরই প্রতীক। ইতালির ফ্যাসিস্ট অতীতের সমালোচনা করতে মেলোনি বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালিতে ফ্যাসিবাদের উত্থান সম্পর্কে ২০২১ সালে আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ‘অন্য দেশের মতো আমাদেরও সে সময় অনেক বেশি জটিল ও দুরূহ পথ পাড়ি দিতে হয়।’ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুথ বেন-ঘিয়াত বলেন, ‘মেলোনির নেতৃত্বে ব্রাদার্স অব ইতালিকে জন্মহার ও জনসংখ্যা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে দেখা গেছে। তারা গর্ভপাত ও অভিবাসনের কঠোর বিরোধিতা করে। পূর্বসূরি ও মতাদর্শিক মিত্র ন্যাশনাল অ্যালায়েন্সের সঙ্গে ব্রাদার্স অব ইতালি সব সময়ই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। ইতালির জাতিগত বিশুদ্ধতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে বরাবরই সোচ্চার থেকেছেন মেলোনি। দেশটিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবাধে অবৈধ অভিবাসী ঢোকানোর ষড়যন্ত্র করছে বলে বেশ কয়েকবার অভিযোগও করেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ সংকট
জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, ঋণের বোঝা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিসহ আরও নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ইতালির অর্থনীতি। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী মেলোনিকে তাই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সমালোচনা অতীতে বিভিন্ন সময়ে করলেও এখন অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটাতে এই ব্লকের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা ছাড়া উপায় নেই মেলোনি ও তার শরিকদের। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা উইলসন ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেলোনির পূর্বসূরি ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘি ইতালিতে যেসব অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন করেছিলেন, সেসব বাদ দিতে পারবেন না ব্রাদার্স অব ইতালির এই নেতা। শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুতে দ্রাঘির দেখানো পথেই হাঁটতে হবে মেলোনিকে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার ঘটনায় সালভিনি ও বারলুসকোনি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমর্থন করলেও মেলোনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ নেন। প্রকাশ্যে তিনি রুশ আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়ে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহের অঙ্গীকার করেন।
অভিবাসন প্রশ্নে ব্রাদার্স অব ইতালির অবস্থান দেশটির অন্য ডানপন্থিদের চেয়ে ভিন্ন নয়। লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক গ্রিফিনি বলেন, “ইতালির নেতারা আজও মনে করেন, ‘অপরকে’ সভ্য করার উদ্দেশ্যেই তারা উপনিবেশ স্থাপন করেছিলেন। এ কারণে ঔপনিবেশিক আমলে তারা যেসব অপরাধ করেন, তার জন্য তারা ক্ষমা চাইতে রাজি নন। ঔপনিবেশিক যুগ আর নেই। আজকের সময়ে এই ‘অপর’ আর কেউ নয়, অর্থনৈতিকভাবে ভালো থাকতে যারা ইতালিতে যায়, সেই অভিবাসীরাই এখন ‘অপর’।” নির্বাচনে মেলোনির জয় তাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এরই মধ্যে অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে ব্রাদার্স অব ইতালি। একই সঙ্গে দেশটিতে ইসলামি সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও লড়াই করার ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। ইতালিতে বাস করা মুসলমান অভিবাসীদের জন্য মেলোনির শাসন সুখকর হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, অভিবাসীরা এ মুহূর্তে একটি পরিসংখ্যান জেনে কিছুটা সান্ত্বনা পেতে পারেন। ৭৭ বছরে ইতালিতে ৬৮টি সরকার এসেছে এবং গেছে। খারাপ সময়ের মধ্যে অভিবাসীদের বেশি দিন থাকতে হবে না, এমনটা আশা করা ছাড়া তাদের এখন আর কিছু করার নেই।
