অবিশ্বাস্য সুন্দর ও শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি। ফুটবল সমর্থকদের এটাই উপলব্ধি হওয়ার কথা। ছন্দপতন ও ফিরে আসার নাটকীয় দৃশ্যপট লিখে রোমাঞ্চ ছড়াল ক্যামেরুন-সার্বিয়া ও ঘানা-দক্ষিণ কোরিয়া ম্যাচ। মিনিটে-মিনিটে গোল হয়ে বিশ্বকাপের সত্যিকার মজা উপভোগের সুযোগ করে দিল ১১ গোলের দুটি ম্যাচ। ক্যামেরুন ও সার্বিয়া ৩-৩ গোলে ড্র হলেও কোরিয়ানরা অল্পের জন্য ঘানার কাছে হেরে গেল ৩-২ গোলে। তবে হার-জিত-ড্রয়ের বিষয়টি পাশে রেখে সবচেয়ে বড় কথা দুই ম্যাচই ছিল উপভোগ্য।
আফ্রিকান অদম্য সিংহ তারা। ছদ্মনামকে সত্যি করে অদম্য সিংহের মতোই ম্যাচে ফিরে এলো ক্যামেরুন। সার্বিয়ার হাতের মুঠোয় থাকা ৩ পয়েন্ট ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। দারুণ রোমাঞ্চকর ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ৩-৩ গোলে ড্র হয়। অথচ প্রথম ঘণ্টা এই ক্যামেরুনকেই দমিয়ে দিয়েছিল সার্বিয়া। ৩-১ গোলে এগিয়ে থেকে ব্রাজিলের বিপক্ষে হার ভুলতে বসেছিল। কিন্তু ৩ মিনিটের মাথায় দুই গোল করে সার্বিয়ার জয়ের স্বপ্ন চুরমার করে ক্যামেরুন।
জয়ের সমান ড্রতে এখন ১৯৯০ বিশ্বকাপের পর প্রথমবার দ্বিতীয় রাউন্ডে পা রাখার সুযোগ তৈরি করেছে অদম্য সিংহরা। প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে ১-০ তে হেরে বিপদেই ছিল ক্যামেরুন। দ্বিতীয় ম্যাচে সার্বিয়ার কাছে হার তাদের বিশ্বকাপ শেষ করে দিত। তা হতে দেননি ভিনসেন্ট আবুবকর ও এরিক চোপু-মোতিং।
২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ফুটবলের নিয়মিত নাম এ দুই ফুটবলার জ্বলে ওঠেন অভিজ্ঞতার ভারে। দুই কাউন্টার অ্যাটাকে ম্যাচ নিজেদের করে দেন। ৬৩ মিনিটে মধ্যমাঠ থেকে কাস্তেলেত্তো বল বাড়ান আবুবকরের দিকে। বল নিয়ে একাই এগিয়ে ডি বক্সে সার্বিয়ান গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল পোস্টে পাঠান। তবে গোলটি অফসাইডের শঙ্কায় ভিএআরে চেক করেন রেফারি। এরপর গোলের বাঁশি বাজান। তার তিন মিনিট পর আর একটি কাউন্টার অ্যাটাকে ক্যামেরুনের হয়ে এগিয়ে যান আবুবকর ও চোপু-মোতিং। অনেকটা ফাঁকায় থাকা সার্বিয়ান ডিফেন্সে ঢুকে মোতিংকে বল পাস দেন আবুবকর। জোরালো শটে গোল করে মোতিং ম্যাচে সমতা আনেন। এর আগে ২৯ মিনিটে কাস্তেলেত্তো ক্যামেরুনের হয়ে প্রথম গোল করেন।
অথচ আগে গোল করেও ম্যাচে হারিয়েই গিয়েছিল ক্যামেরুন। প্রথমার্ধের প্রথম ও তৃতীয় মিনিটে পাভলোভিচ, মিলিনকোভিচ-সাভিচের গোলে ২-১ এ পিছিয়ে পড়ে তারা। বিরতির পর ৫৩ মিনিটে মিত্রোভিচের গোল দলটিকে আরও বিপদে ফেলে। ওই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখে ক্যামেরুন। আর এর অনুপ্রেরণা তারা নিয়েছে মরক্কো থেকে।
আগের দিন বেলজিয়ামকে ২-০ তে হারিয়ে দেওয়া দলের কথা বলে আবুবকর ম্যাচ শেষে জানান, ‘আমি মরক্কোর ম্যাচটা দেখেছি। ওরা জয়ের জন্য দারুণ স্পৃহা দেখায়। এই বার্তাটাই আমি সতীর্থদের দিয়েছি। ওদের মতো আমাদেরও সেই ইচ্ছা, স্পৃহা দেখাতে হবে। আমরা কিছু ভুল করেছি কিন্তু হাল ছেড়ে দিইনি।’
আবুবকরের কথা বদলে দিয়েছে ক্যামেরুনকে। ম্যাচের ফলই তার প্রমাণ। তিনি নিজেও তো উঠে গেছেন ইতিহাসে। আফ্রিকান প্রথম ফুটবলার হিসেবে বদলি নেমে গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন এক ম্যাচে।
নিজেকে মোহামেদ সালাহর মতো মনে করা আবুবকর বলেন, ‘সালাহ আমাকে মুগ্ধ করে না। সে যা করে আমিও তা করতে পারি। ব্যাপারটা হলো আমি ওর মতো ইউরোপের সেরা ক্লাবে খেলতে পারিনি।’
দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে দারুণ প্রেসিং ফুটবল খেলেও ভাগ্যের সঙ্গে পেরে ওঠেনি কোরিয়া। প্রথমার্ধেই ২৪ মিনিটে সালিসু ও ৩৪ মিনিটে তুদোসের গোলে পিছিয়ে যায় এশিয়ান টাইগাররা। দ্বিতীয়ার্ধে চার মিনিটে চো গে-সুংয়ের জোড়া গোলে সমতায় ফেরে কোরিয়া। কিন্তু ৭ মিনিটের ব্যবধানে কুদোসের দ্বিতীয় গোল দক্ষিণ কোরিয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ করে। ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিট পুরোটা সময় ঘানাকে তাদের ডি বক্সে কোণঠাসা করেও শেষরক্ষা হয়নি দলটির। এই জয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে এইচ গ্রুপে দ্বিতীয় হয়েছে পর্তুগালের কাছে প্রথম ম্যাচ হারা ঘানা। উরুগুয়ের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে ড্র করা কোরিয়া মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার শেষে।
কালকের প্রথম দুই ম্যাচে যেমন উত্তাপ ছড়িয়েছে, তেমনটা রাতের ম্যাচগুলোতে দেখা যায়নি। ব্রাজিলের ম্যাচে একক আধিপত্য দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলে জয় পান ক্যাসেমিরোরা। তাতে নিশ্চিত হয় শেষ ষোলো। পরের ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল উরুগুয়েকে হারিয়েছে ২-০ গোলে। এই জয়ে তারাও টিকিট পেয়ে গেছে পরের পর্বের।
