নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকানো বর্ষা এখন চুয়াডাঙ্গার গর্ব

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২২, ০৩:৫৯ পিএম

দরিদ্র পরিবারে জন্ম। তাই বছরখানেক আগেই বিয়ে দিতে চেয়েছিল পরিবার। কিন্তু ষোড়শী শ্রাবন্তী সুলতানা বর্ষা কোনোমতেই পরিবারের মত মেনে নিতে পারেননি। তাই নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকাতে দরখাস্ত নিয়ে থানায় হাজির হন স্কুলছাত্রী।

পরে পুলিশ গিয়ে তার বাবা-মাকে বোঝানোর পর বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তারা। বছর ঘুরতেই সেই মেয়েটি এসএসসিতে পেয়েছেন জিপিএ-৫। একসময় যে পরিবার তাকে বিয়ের পিঁড়িতে ঠেলে দিচ্ছিল এখন সেই পরিবারই মেধাবী বর্ষাকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। তার সাফল্যে খুশি শিক্ষক, সহপাঠী ও প্রতিবেশীরা। তাকে সংবর্ধনা দিয়েছে জেলা পুলিশ।

গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর বর্ষাকে দেখতে পাত্র পক্ষের আসার কথা ছিল। বর্ষা তখন চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী।

বাল্যবিয়ের আয়োজনের বিষয়টি বুঝতে পেরে বর্ষা ছুটে গিয়েছিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর থানায়। নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকাতে ওসির কাছে দিয়েছিলেন একটি দরখাস্ত।

সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, আর্থিক দুরবস্থার কারণে বিয়ে দেওয়া সব সমস্যার সমাধান নয় বরং বাল্যবিবাহের কারণে আমাদের দেশে হাজারো মেয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় এবং একপর্যায়ে অপমৃত্যুর শিকার হয়।

থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ মহসীনকে বর্ষা বলেছিলেন, ‘বাল্যবিবাহ নয়, আমি পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। পরে মেয়েটির সাহসী ভূমিকায় বিয়ের আয়োজন ভেস্তে যায়।’

বছর ঘুরতেই সেই মেয়েটি প্রমাণ দিয়েছে তার সক্ষমতার। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন বর্ষা। এ যেন ভাঙা ঘরে এক টুকরো চাঁদের আলো।

শ্রাবন্তী সুলতানা বর্ষা জানান, একটা সময় পরিবারসহ প্রতিবেশীরা সবাই তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। তবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তিনি বাধ্য হন প্রশাসনের আশ্রয় নিতে। একটা সময় যারা তাকে তাচ্ছিল্য করেছিল তারাই আজ তাকে দেখতে বাড়িতে ফুল নিয়ে যাচ্ছে। বর্ষা সাংবাদিক হতে চান। ভাঙতে চান বাল্যবিয়ের শেকল। তুলে ধরতে চান সমাজের অসংগতি।

বর্ষার মা বিউটি খাতুন জানান, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর অনেক কষ্টে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। অভাবের সংসারে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার দিন ঠিক করলেও মেয়ের ইচ্ছাতেই বিয়ে আর হয়নি। মেয়ের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল যেন পাল্টে দিয়েছে তার স্বপ্ন। এখন সে মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় বুক বাঁধছে। যে পরিবার একসময় তাকে বোঝা মনে করতো এখন সেই হয়েছে পরিবারের অবলম্বন।

প্রতিবেশী রাবেয়া জানান, বর্ষ তাদের এলাকার গর্ব। বর্ষাকে দেখে এলাকার অনেক মেয়েই এখন অনুপ্রাণিত হবে।

শিক্ষক থেকে সাধারণ মানুষ সকলের সহযোগিতায় বর্ষা আজ এ পর্যায়ে। আনন্দ বিরাজ করছে সেসব মানুষের মধ্যেও।

চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শিলা খান বলেন, বর্ষার এমন সাফল্যে আমরা গর্বিত। সে স্কুলের সুনাম বয়ে এনেছে।

জেলা পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্ষা হলো হার না মানা একটা নাম। ও যে স্বপ্ন দেখেছিল সেটা সে বাস্তবায়ন করেছে। জেলা পুলিশ বর্ষার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে যা যা করা প্রয়োজন তার পাশে থেকে সেটা করবে।

নিজের সফলতা ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও সকলের সহযোগিতা চান অদম্য শ্রাবন্তী সুলতানা বর্ষা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত