সেদিন এক ওয়াজ মাহফিলে জনৈক বক্তার বয়ান শুনছিলাম। তিনি ইলমে দ্বীন ও আলেমদের ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। বক্তা একপর্যায়ে শ্রোতাদের দুনিয়ার বিদ্যা ও আধুনিক বিদ্বানদের পরিমণ্ডল যে কতটা কদর্য, তা বর্ণনা করলেন। শ্রোতারাও বেশ তৃপ্তিবোধ করলেন এবং বিভিন্ন ধ্বনি-সহযোগে সেই বোধের অভিব্যক্তি ঘটালেন।
বলাবাহুল্য, ওয়াজ মাহফিলের শ্রেণিভেদ আছে। কোন ঘরানার মাহফিল এবং বক্তা কে, অধিকাংশ শ্রোতার কাছে তা বিবেচ্য। যেকোনো বক্তার ওয়াজ সাধারণত তার চিন্তা-চেতনা ও আকিদা-বিশ্বাসের সঙ্গে যাদের মিল আছে তারাই শুনতে বেশি আগ্রহী হয়। স্বাভাবিকভাবেই তার বক্তব্যের সাড়াও তাদের মধ্যে বেশি পড়ে। কাজেই তাদের হর্ষধ্বনি দ্বারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছার অবকাশ নেই, মাহফিলের বাইরের সবাই সেই বক্তব্যে একমত কিংবা আহ্লাদবোধ করবে। তাতে অবশ্য বক্তার কিছু যায় আসে না। উপস্থিত শ্রোতাদের বাহবা ধ্বনির ভেতরেই যেন তিনি সমস্ত গণমানুষের ঐকতান শুনতে পান। ফলে ক্রমবর্ধমান উৎসাহে সব সীমারেখা অতিক্রম করে চলে যান বহুদূর। যে বক্তার কথা বলেছি এমনটাই হয়েছিল তার বেলায়। বলা যায়, তিনি তার বয়ানে শ্রোতামানসে এই অনুভূতি জন্মাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, আধুনিক শিক্ষা কিছু শিক্ষা নামেরই উপযুক্ত নয়। মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। এই শিক্ষায় শিক্ষিতদের দ্বারা সমাজের বিশেষ কল্যাণ হয় না। এ জ্ঞান-বিদ্যা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, বরং অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এভাবেই দেখা যাচ্ছে, আলেম-উলামার একাংশ আধুনিক জ্ঞান-বিদ্যাকে ঘৃণার চোখে দেখে। ওই বক্তার মতো অনেকেই তাদের বয়ানে তা প্রকাশ করে। তারা যেমন বিশ্বাস করে তেমনি অন্যদের বোঝানোর চেষ্টা করে।
অন্যদিকে যারা আধুনিক শিক্ষাগ্রহণ করেন, তাদের বিরাট একটা অংশ ইলমে দ্বীন ও আলেমদের সম্পর্কে নেতিবাচক মানসিকতার ধারক। তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও লেখা-জোখায় এ ব্যাপারে কোনো রাখঢাক নেই। দেশের আপামর জনগণকে কীভাবে এ শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করা যায়, কীভাবে সমাজের চোখে আলেমদের হেয়প্রতিপন্ন করা যায়, সে লক্ষ্যে তাদের চেষ্টা-কসরতের কোনো কমতি নেই। তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে এই মেহনত করে যাচ্ছে এবং উত্তরোত্তর তাতে সফলতাও লাভ করছে। এ উভয় মনোভাব সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুই
প্রান্তিকতা ও চরম একদেশদর্শিতা। অন্যসব বাড়াবাড়ির মতোই এ বাড়াবাড়িও ব্যক্তি ও সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ। এর ফলে দ্বীনি আলেম-উলামা ও আধুনিক শিক্ষিত সমাজের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠেছে। দৃশ্যমান দেয়াল তো সহজেই টপকানো যায়, কিন্তু অদৃশ্য দেয়াল দুর্লঙ্ঘ্য। অগত্যা প্রত্যেক মহল আপন-আপন পরিমণ্ডলে বিচরণ করছে। শুধু নিজেদেরই লাভ-লোকসান চিন্তা করছে। অপর মহলের কল্যাণ চিন্তা করলেও নিজেদের অবস্থান থেকে করছে। চিন্তার বিনিময় হচ্ছে না। একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করছে না। একের কল্যাণ অন্যতে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল প্রতিবন্ধক হয়ে আছে। সামগ্রিক কল্যাণার্থে এ দেয়ালের অপসারণ জরুরি। তার জন্য প্রথমে দরকার মনোভাবের পরিবর্তন ও চিন্তার ভারসাম্য আনয়ন। প্রান্তিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে উদার মানসিকতার সঙ্গে যদি প্রত্যেকে অপরকে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করে তবে এ প্রাচীর আপনিই অপসৃত হতে পারে।
আলেমদের দিকটাকেই প্রথমে ধরা যাক। সন্দেহ নেই কোরআন-হাদিসে তাদের অতি উঁচুমর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন সময় সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে আখেরাতকে ভয় করে এবং তার প্রতিপালকের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে সে কি তার সমান যে তা করে না? বলো, যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? শুধু বোধসম্পন্ন লোকরাই উপদেশ গ্রহণ করে।’ সুরা জুমার : ৯
বর্ণিত আয়াত সুনির্দিষ্ট শর্তপূরণ ও দায়-দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করে। এক হাদিসে আছে, ‘তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ, যে কোরআন নিজে শেখে ও অন্যকে শেখায়।’ ইশারাস্বরূপ একটি আয়াত ও একটি হাদিস উল্লেখ করা হলো। আলেমদের মর্যাদা সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিসের সংখ্যা প্রচুর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি কি এই যে, তাদের ছাড়া বাকি সব লোক উপেক্ষিত হবে? অন্যদের কোনো গুণ ও অবদান স্বীকার করা হবে না? নিশ্চয়ই তা নয় এবং সেরূপ ভাবনা শ্রেষ্ঠত্বের মহিমাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আলেমরাই একটা সমাজের সব নয়, বরং ক্ষুদ্র একটা অংশ মাত্র। একটা সুন্দর, সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ সমাজের জন্য তাদের প্রয়োজন যেমন অনস্বীকার্য তেমনি এ কথাও সত্য যে, শুধু তাদের পক্ষে সমাজের সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। যত ধরনের পেশাজীবী আছে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকাই অত্যন্ত মূল্যবান এবং বাকি সবার জন্য তা অপরিহার্য। সন্দেহ নেই প্রতিটি পেশার উৎকর্ষ ও উপযোগিতায় আধুনিক শিক্ষার ভূমিকা বিশাল। এ শিক্ষার কল্যাণে আজ জীবন ও জীবিকার প্রতিটি বৃত্তি অভাবিতপূর্ব উপযোগিতা অর্জন করেছে। ক্রমবর্ধিঞ্চু মানবগোষ্ঠীর হরেক রকম চাহিদা পূরণে কৃষক-শ্রমিকের মেহনত পর্যন্ত যে বিস্ময়কর সরবরাহ সৃষ্টি করছে, তা আধুনিক জ্ঞান-বিদ্যার অবদান নয় কি? আজকের সহজ, নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ, যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা, কঠিন-কঠিন রোগ-ব্যাধির উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা এবং নিরাপদ ও মনোরম আবাসনের স্থাপত্যকলা এবং জীবন-সংশ্লিষ্ট আরও যত ক্ষেত্র আছে, প্রায় সবগুলোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান যুগান্তকারী বিপ্লব করেছে। এদিকে লক্ষ করলে স্বীকার করতেই হবে, এ শিক্ষাও আল্লাহর এক বিরাট নিয়ামত। সেই দৃষ্টিকোণে এ শিক্ষা ও এর শিক্ষিতজনদের অবজ্ঞার সঙ্গে নয়, বরং কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই তাদের অবদান স্বীকার করে নেওয়া উচিত।
বিশেষত এ কারণে যে, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজকর্ম, যা ছাড়া জীবন ও সমাজের গাড়ি চলতে পারে না, শুধু তারাই আঞ্জাম দিচ্ছে। আলেমদের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কেননা আলেমরা যে শিক্ষা লাভ করেন, তা আদৌ এজন্য নয়। কোরআন-হাদিস এজন্য নয় যে, তা পড়ে মানুষ প্রকৌশলী, চিকিৎসক, নাবিক, পাইলট, কৃষিবিদ ইত্যাদি হবে। এসব তাদের কাজ নয়। তবে তাদের কাজ কী? কোরআন মাজিদ বলছে, ‘প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে, যাতে তারা সতর্ক হয়।’ সুরা তাওবা : ১২২
কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জনকারীরা কী কাজ করবে তা এ আয়াতে পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যারা সরাসরি কোরআন-হাদিসের জ্ঞানার্জন করেনি, যারা জীবন-জীবিকা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত তারা সেই কাজের ভেতর দিয়েও কীভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করবে। তারা তাদের সেসব জাগতিক কাজকে কীভাবে পারলৌকিক সফলতার মাধ্যম বানাবে। কীভাবে তারা তাদের দুনিয়াকে দ্বীনে পরিণত করবে। আলেমরা তাদের সেই পথ দেখাবে। তারা যাতে কোরআনের ভাষায় এমন না হয়ে যায় যে, ‘তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক সম্পর্কে অবগত আর আখেরাত সম্বন্ধে তারা গাফিল।’ সুরা রুম : ৭
সেই লক্ষ্যে তাদের সতর্ক-সচেতন করবে। অনাচার করলে, দুর্নীতিতে লিপ্ত হলে, নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে আখেরাতে কী কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে সেই ভয় দেখাবে। যাতে প্রত্যেক পেশাজীবী আপন আপন পেশায় বিশ্বস্ত থাকে, চিন্তা-চেতনায় আখেরাতের জবাবদিহিকে জাগ্রত রাখে আর এভাবে দুনিয়ার কাজের ভেতর দিয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হয়।
এভাবে এ আয়াত আলেমদের গণমানুষের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। আম জনগণ তাদের কাজের ক্ষেত্র। একজন আলেম ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা জাগতিক অন্য কোনো কর্মজীবী নন, কিন্তু তাদের থেকে তিনি বিচ্ছিন্নও নন। তিনি তাদের কাজে প্রাণরস জোগাবেন। তাদের নীতিনৈতিকতা রচনা করবেন। উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক দেহ ও আত্মার মতো। একটা সুষ্ঠু সমাজের জন্য আলেমরা আত্মাস্বরূপ, জাগতিক পেশার লোকজন সেই সমাজের শরীর। শরীর ছাড়া যেমন আত্মার অবস্থিতি কল্পনা করা যায় না, তেমনি ইহজাগতিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকদের ছাড়া আলেমদের অবস্থান অকল্পনীয়। কাজেই আলেমদের পক্ষে তারা ‘পর’ নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের অংশ। সুতরাং আলেমদের কর্তব্য তাদের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকা।
এর জন্য প্রথমে দরকার মানসিকতার পরিবর্তন। অর্থাৎ আধুনিক শিক্ষিতদের ‘পর’ না ভেবে ‘আপন’ ভাবা। তাদের সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় ও উপকারী গণ্য করা এবং তাদের কাজকর্মের মূল্যায়ন করা। সেই সঙ্গে তাদের কাজকর্মকে শুধু ইহজাগতিক দৌড়ঝাঁপ মনে না করে তার পারলৌকিক মহিমা উপলব্ধি করা।
প্রকাশ থাকে যে, আখেরাতের বিচারে আলেমদের শ্রেষ্ঠত্ব তো নিঃশর্ত নয়বরং ইখলাস, আমল ও দায়িত্বপালনের শর্তসাপেক্ষ। সমষ্টিগতভাবে সে শর্তপূরণের নিশ্চয়তা থাকলেও যেকোনো ‘ব্যক্তি আলেমের’ ক্ষেত্রে তাতে ঘাটতি থাকার যথেষ্ট অবকাশ আছে। ফলে এ মহলের কোনো ব্যক্তি নিজেকে অন্য কারও অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ভাবতে পারে না। তাতে সেই অন্য ব্যক্তিটি যে পেশারই হোক না কেন।
এমন মানসিকতাই আলেমদের আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে নিয়ে যেতে পারে। এটাই হতে পারে বাধার প্রাচীর উৎপাটনে তাদের পক্ষ থেকে প্রথম আঘাত। এর পরবর্তী কাজ হলোতাদের সঙ্গে মেলামেশা ও মতবিনিময় করা, তাদের বোঝার চেষ্টা করা, তাদেরও বোঝার সুযোগ দান করা। সেই লক্ষ্যে নিজেদের অনুষ্ঠানাদিতে তাদের শামিল রাখা এবং আরও যত যোগাযোগমাধ্যম আছে সেগুলোকে কাজে লাগানো।
এ তো গেল আলেমদের দিক। তাদের সম্পর্কে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের যে নেতিবাচক ধারণা এবং তাদের একটা বিরাট অংশের চরম একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে সেটাও বদলাতে হবে। আলেম-উলামারা সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, অতি প্রাসঙ্গিক সেটা মানতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা এবং আলেমদের কোনো অবদানকে খাটো করে দেখা যাবে না।
মোটকথা আলেম সমাজ ও আধুনিক শিক্ষিত মহল উভয়েরই চিন্তায় ভারসাম্য আনতে হবে। প্রত্যেককেই নিজ সীমারেখা সম্পর্কে সজাগ হতে হবে এবং নিজের জন্য অপরের প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করতে হবে। এভাবে উভয় পক্ষ যদি পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসতে পারে এবং বিভক্তির প্রাচীর সরিয়ে একে অন্যের সম্পূরক হিসেবে হাতে হাত ধরে চলতে পারেতবেই সাধিত হতে পারে ব্যক্তি ও সমষ্টির সত্যিকারের মঙ্গল।
