প্রধান শিক্ষক না আসায় প্রায়ই বন্ধ থাকে স্কুল

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:৩০ পিএম

নিজের খেয়াল খুশিমতো মাসে দু-এক দিন বিদ্যালয়ে যান প্রধান শিক্ষক। অফিসের চাবি রাখেন নিজের কাছে। প্রায়দিনই স্কুল বন্ধ থাকে। তার পরিবর্তে ক্লাস নিতে দুই হাজার টাকা বেতনে স্বল্প শিক্ষিত একজনকে প্রক্সি শিক্ষক রেখেছেন।

অভিভাবক ও স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

এমন চিত্র নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। আর এসব অভিযোগ প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) শওকত আলীর বিরুদ্ধে।

সরেজমিন বুধবার গেলে স্কুলে এলাকাবাসী, অভিভাবক ও ম্যানেজিং কমটির সদস্যরা জানান, প্রধান শিক্ষক শওকত আলী নিজের খেয়াল খুশিমতো মাসে দু-এক দিন স্কুলে আসেন। অনেক দিন স্কুল খোলাও হয় না। অফিসের চাবিও নিজের কাছে রাখেন তিনি। কারও কথায় তিনি কর্ণপাত করেন না। স্কুলে ক্লাস নিতে এলাকার স্বল্পশিক্ষিত এক নারীকে দুই হাজার টাকা বেতনে রেখেছেন। প্রায়দিনই দুপুরে স্কুল ছুটি দেওয়া হয়। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বিঘ্নিত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে অন্য স্কুলে চলে যাচ্ছে। এ নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল হয়নি। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে এই স্কুলের পাঠদান। এ অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি চাই।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেড় শ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের পাঠদানে প্রধান শিক্ষকসহ দুজন শিক্ষক রয়েছেন।

বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মো. মোকারম হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষক শওকত আলী বসবাস করেন মোহনগঞ্জ পৌরশহরে। মাসে এক-দু দিন বিদ্যালয়ে আসেন। তার পরিবর্তে ক্লাস নেয়ার জন্য গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত এক মেয়েকে দুই হাজার টাকা বেতনে রেখেছেন। সেও নিয়মিত স্কুলে আসে না। এদিকে অপর সহকারী শিক্ষক শাহীনুর মিয়াও নিয়মিত স্কুলে আসেন না। প্রায় দিনই স্কুল বন্ধ থাকে। একবার এ বিষয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে এলাকার অনেকে মিলে অভিযোগও দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। সমস্যা যা ছিল তা-ই রয়ে গেছে।

বিদ্যালয়ে পাশে থাকা মনোহারী ব্যবসায়ী আজমপুর গ্রামের আবুল কাশেম বলেন, প্রধান শিক্ষককে মাসে দুই-একবার দেখি স্কুলে আসতে। এই স্কুলে এক সময় অনেক শিক্ষার্থী ছিল। পড়াশোনা হয় না বলে অনেক অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের অন্য স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। প্রায় দিনই স্কুল বন্ধ থাকে।

বিদ্যালয়ের সামনে থাকা নদীতে খেলা নৌকা (গাদারা) চালান আজমপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব আ. জলিল। এ নদী পার হয়েই স্কুলে যেতে হয়।

আ. জলিল জানান, স্কুলটা এক সময় ভালোই ছিল। পড়াশোনাও ঠিকমতো হতো। দুই-আড়াই বছর ধরে প্রধান শিক্ষক শওকত আলী যোগদানের পর থেকে এ অবস্থা শুরু হয়েছে। এখন তো মাসে সপ্তাহে দুই-একদিন স্কুল বন্ধ থাকে। প্রধান শিক্ষক তো মাসে দু-তিন দিনের বেশি স্কুলে আসেন না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এ নদীতেই থাকি, লোকজন পার করি। স্কুলে গেলে তো আমার নৌকাতেই পার হতে হয়। এমনভাবে চলতে থাকলে একদিন এ স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী থাকবে না।

এ ছাড়া আজমপুর গ্রামের আল আমিন ও রহম আলী জানান, আমাদের উপজেলায় এমন অনিয়মের স্কুল আর একটাও নেই। সপ্তাহে কয়েক দিন বন্ধ থাকে। যেদিন খোলা হয় সেদিন দুটার আগেই ছুটি দিয়ে দেয়। আমাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সহকারী শিক্ষক শাহীনুর মিয়া বলেন, আমি নিয়মিত স্কুলে আসি। মাঝে-মধ্যে একটু সমস্যা হয়। তবে প্রধান শিক্ষক স্কুলে কম আসেন।

প্রক্সি শিক্ষক পপি আক্তার বলেন, আমি এ স্কুলে দুই হাজার টাকা বেতনে শিক্ষার্থীদের পড়াই। প্রায়দিন সকালে এসে আমিই স্কুল খুলি। সহকারী শিক্ষক আরো অনেক পরে আসেন। আর প্রধান শিক্ষক তেমন আসেন না। এ চাকরির পাশাপাশি একটি এনজিও প্রোগ্রামে চাকরি করি। শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াই। সে কারণে অনেক দিন দেখা যায় সকালে আমি স্কুলে আসতে পারি না। ফলে স্কুল খোলা হয় দেরিতে। অথবা কেউ না আসলে স্কুল বন্ধ থাকে।

আজমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) শওকত আলী নিয়মিত স্কুলে না যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, মাঝে মধ্যে নানা কারণে স্কুলে যেতে পারি না। যাতায়াত সমস্যার কারণে এমনটা হয়। তবে বিদালয়ের অফিস কক্ষের চাবি সহকারী শিক্ষকের কাছেই থাকে। শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক কম তাই পড়াশোনার স্বার্থে প্রক্সি শিক্ষক রাখা হয়েছে। স্কুলের নানা বিষয় নিয়ে দুটি পক্ষ রয়েছে। বন্ধ থাকার বিষয়টি তাদের অপপ্রচার।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অবগত হয়ে প্রধান শিক্ষক শওকত আলী ও সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষকদের সঠিক সময়ে স্কুলে যেতে হবে, নিয়মানুযায়ী ক্লাস নিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ছাড় দেওয়া হবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত