বিশ্ব মানবাধিকার দিবস

ক্ষমতার চর্চায় মানবাধিকারের ধারা ক্ষয়িষ্ণু

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৩২ পিএম

আজ ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখাই এই দিবস উদযাপনের প্রধান প্রতিপাদ্য। নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতি বছর মানবাধিকার দিবস উদযাপিত হয় কিন্তু এখন পর্যন্ত মানবাধিকারের লক্ষ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে দেশে-বিদেশে সর্বত্র। সম্প্রতি, দেশে মাত্র ২৫ হাজার টাকা ঋণের অনাদায়ে পাবনার বারোজন কৃষককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এর আগে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অনেক কৃষক দাবি করেছেন ঋণের টাকা পরিশোধ করা সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু দরিদ্র কৃষকদের কথা তো এত সহজেই বিশ্বাস করা যায় না! বরং তাদের গ্রেপ্তার করে জেলে নিক্ষেপ করাই সহজ। এর উল্টো হচ্ছে যারা বড় বড় ঋণগ্রহীতা, যারা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান। একের পর এক ঋণ নিয়ে কোটি বা হাজার কোটি টাকা খেলাপি হলেও গ্রেপ্তার তো দূরের কথা বরং সুদ মওকুফ, ঋণ মওকুফ পেয়ে বা ঋণ শোধ না করে বহাল তবিয়তে থাকার অধিকার তাদের জন্য একেবারে সাধারণ। সুযোগের অধিকার যেসবের জন্য সমান না তা বুঝতে হলে অনেক বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই। বরং আমরা দেখি এ দেশে সুযোগ, সুবিধা, সম্মান ও অধিকার শ্রেণি ও ক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

এখনো আমাদের সমাজে মানবাধিকারের সুরক্ষা ও লঙ্ঘন শ্রেণিভিত্তিক। অর্থনৈতিক শ্রেণি যেমন এখানে বিবেচ্য বিষয় একইভাবে বর্ণভেদ ও লিঙ্গভেদ এগুলোও অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে ধনী ও ক্ষমতাশালী দেশগুলোর নাগরিকদের যে অধিকার, দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন দেশগুলোর ক্ষেত্রে তা যেন প্রযোজ্য নয়। অদ্ভুত এক পৃথিবীতে বসবাস করছি আমরা, এক মানুষ প্রজাতির মধ্যে কত তারতম্য। এই অধিকারহীনতার হাত ধরে আধুনিক যুগে মানুষকে শায়েস্তা করার জন্য শুধু মারণাস্ত্রই ব্যবহার করা হয় না অন্য অনেক কিছু যা মানুষের জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেসব উপকরণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা আছে এবং তা দিন দিন বাড়ছে। এর সবগুলোই হয়তো মারণাস্ত্র নয় কিন্তু নিঃসন্দেহে মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের অস্ত্র। পানি, জ্বালানি, ওষুধ, খাদ্য ইত্যাদি থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যন্ত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধে মারণাস্ত্রের পাশাপাশি কেউ জ্বালানি বা খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে আবার কেউ আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। আপাতদৃষ্টিতে লড়াই-সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে; কিন্তু মানুষের মৌলিক যে চাহিদাগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা প্রকারান্তরে মানবাধিকারেরই লঙ্ঘন। বর্তমান বিশ্বে অস্ত্রের ধারণা ক্রমপরিবর্তনশীল, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার প্রবণতা থেকে দেশগুলো এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি। মারণাস্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের যেমন জীবনহানি হয়, তেমনি বর্তমান প্রেক্ষিতে মৌলিক প্রয়োজনসমূহকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের কারণেও অজস্র প্রাণহানি হয়। এটাই মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার বাস্তবায়নে অবহেলা চলছে দৃষ্টিকটু মাত্রায়। ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের আলোকে মানুষে মানুষে পার্থক্যের সৃষ্টি করা মানবাধিকারের মূলনীতিরই পরিপন্থী। কারণ মানবাধিকারের অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে এর সর্বজনীনতা। অধিকারের সর্বজনীনতা ছাড়া মানবাধিকারের ধারণাই ত্রুটিপূর্ণ। শুধু ত্রুটিপূর্ণ নয় অধিকন্তু মানবাধিকারের মূলধারণাকে ক্রমক্ষয়িষ্ণু করার জন্য দায়ী। আর এর জন্য দায়ী অসুস্থ রাজনীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা। এখন অনেকেই প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে মানবাধিকার আলোচনা এখন যতটা না মানুষের অধিকার ও মৌলিক চাহিদা সম্পর্কিত তার থেকে অনেক বেশি কৌশলগত। আর এ ধরনের কৌশলের পুনঃপুন ব্যবহার মানবাধিকারের ধারণাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আর এর সূত্র ধরেই দেশ থেকে দেশে দেশে মানবাধিকার বাস্তবায়নের এই দুরবস্থা যার সব থেকে বড় ভুক্তভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে যারা ক্ষমতাবান তারা এত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে যেটা সহজেই স্বাভাবিক অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

দীর্ঘসময় ধরে মানবাধিকার বাস্তবায়নের ধারা প্রত্যাশিত মাত্রায় শক্তিশালী না হলেও লঙ্ঘনের ক্ষেত্রসমূহ বিস্তৃত হয়েছে, একে একে মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ যেমন খাদ্য, পানি, জ্বালানি, চলাচলের স্বাধীনতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই এখন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় রাজনীতি এবং এগুলোর সমীকরণই হচ্ছে মানবাধিকার আদায়ের পূর্বশর্ত। সমীকরণে মিল হলে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা আছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগও দৃশ্যমান কিন্তু সমীকরণে মিল না হলে অঘোরে জীবনদান সেই মানুষদের যারা এই সমীকরণের কোনো পাত্রপাত্রী নন এবং এ সম্পর্কে ধারণাও রাখেন না। মানবাধিকার বাস্তবায়নে এই রাজনৈতিক সমীকরণ ও মেরুকরণের প্রতিবন্ধকতা তো আছেই আবার এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের কারণে ধারাবাহিক দুর্ভোগ, যা ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে প্রতিনিয়ত। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার জনগোষ্ঠী মৃত্যুবরণ করেন।

সব প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনুষঙ্গগুলো উল্লেখ করা যথেষ্ট নয় অধিকন্তু এর জন্য কারা দায়ী তাও জোরেশোরে বলা দরকার। কারণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট সবাই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে শুধু ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীর জন্য আর্তনাদ করে কোনো লাভ নেই। এটা যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং তেমনি যারা রাজনৈতিক সমীকরণ মেলান তাদের জন্যও সমভাবে প্রযোজ্য বা যারা মানুষের জীবনযাপনের জন্য মৌলিক অনুষঙ্গগুলো অস্ত্রে পরিণত করে তারা একই দোষে দুষ্ট। কারণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সীমারেখা নেই, প্রত্যেকটি লঙ্ঘনই হচ্ছে মানবজাতির জন্য চরম অসম্মানজনক এবং একই সঙ্গে বেদনাদায়ক সেটা পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক না কেন।

পৃথিবীতে মানবাধিকারের ধারণা হঠাৎ করে নয় বরং ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে। পাশাপাশি অধিকারগুলোর স্বীকৃতিও ধাপে ধাপে অর্জিত হয়েছে। নতুন যুগে এখন অনেক অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ আছে, যা মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে যদিও এখনো এর অনেকগুলো যথাযথ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেনি। মানবাধিকারের ধারণা খ-িত নয় বরং সামগ্রিক এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিপূর্ণতা লাভ করে। সামগ্রিকভাবে অধিকারগুলো বিবেচনায় নেওয়া বা না নেওয়ার সঙ্গে মানুষ ও মানবসমাজের অগ্রগতির অনেক কিছুই জড়িত। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে মানবাধিকারের সুরক্ষা যেমন ব্যক্তির মর্যাদার সুরক্ষা দেয়, অগ্রগতি সাধন করে তেমন মানবসমাজের ধারাবাহিক বিবর্তনও নিশ্চিত করে। এটাই গতিশীলতা, আর মানবাধিকারের ধারাবাহিক লঙ্ঘন শুধু বৈষম্য, বঞ্চনা, দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতাই ডেকে আনে।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত