মরু থেকে কুড়িয়ে নিলাম অমূল্য মণি-মাণিক্য

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:১৩ এএম

আসিতেছে শুভদিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে

দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!

শুভ দিন এসে গেছে। ঋণ শোধও হয়ে গেছে। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে রবিবার রাতে বহুদিনের জমে থাকা ঋণ শোধ করেছে ফুটবল। এই পাওয়ার অপেক্ষাতেই লিওনেল মেসি কাটিয়েছেন কত নির্ঘুম রাত। না পাওয়ার বেদনায় বারবার নীল হতে হয়েছে, হৃদয়ে ঘটেছে রক্তক্ষরণ। বালিশ ভিজেছে নোনা জলে। এ রাতেও কাঁদলেন তিনি। তবে সে জল অনেক অপেক্ষা শেষে আনন্দাশ্রু হয়ে ঝড়েছে। লিওনেল মেসি হেসেছেন, জগৎ হেসেছে। তিনি কেঁদেছেন, কেঁদে উঠেছে গোটা দুনিয়া। মুকুটে মহামূল্য সোনালি পালকটা যুক্ত হওয়ার পর আবেগে ভেসেছেন, ভাসিয়েছেনও। আমিও তাতে ভেসেছি। মরুর বিশ্বকাপ থেকে, মেসির বিশ্বকাপ থেকে ফিরছি মূল্যবান সব স্মৃতির অ্যালবাম নিয়েÑ যা রোমন্থনে ধরা দেবে অমূল্য সব মণি-মাণিক্য।

কাতার বিশ্বকাপ যেমন মেসিকে হাত ভরে দিয়েছে, আমারও প্রাপ্তিযোগ অনেক। আর সেটাও এই মেসিরই অবদান। একটু বুঝিয়ে বলি। কাতার বিশ্বকাপ কভার করব, এই স্বপ্নটা ২০১৮ সালের পর থেকেই দেখছিলাম। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বিজ্ঞাপন মেসির শেষ বিশ্বকাপ! এটা সামনে থেকে দেখতে না পারলে কী করে হয়? তাই স্বপ্নটাকে বাস্তব রূপ দিতেই হবে। সেটা করতে গিয়েই এসেছে বাধা। শুরুতে বিশ্বকাপের ছাড়পত্র মিলছিল না। সেটা মিলে যায় বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের কল্যাণে। আমার কর্মস্থল দেশ রূপান্তর পেছন থেকে দিয়েছে সাহস ও অতি প্রয়োজনীয় রসদ। দুয়ে মিলে স্বপ্নের প্রথম ধাপে পেরিয়ে যাওয়া আর ১৭ নভেম্বর দোহার মাটিতে পা রাখা। তার আগেই দোহা জয় করতে সদলবলে উপস্থিত মেসি। তখন থেকেই অনুভব করতে শুরু করি, অনেক আলোচনা, অনেক বিতর্কের এই বিশ্বকাপ অন্য কারও নয়। এটা শুধুই মেসির বিশ্বকাপ। হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে শুরু করেছে আকাশি-সাদার দল, যখন তাদের কণ্ঠে শুনি মেসিকে নিয়ে বাঁধা গান, তখনই বুঝে যাই, এবার তিনি কিছু একটা করবেন।

এবার সত্যিকারের নেতা হতে নিজেকে বদলালেন মেসি। নিয়ম মেনে মেসির জাদুকরী পা জাদু দেখানো শুরু করল। পাশাপাশি ভদ্র-নম্র তকমাটা ড্রেসিং রুমে রেখে এসে নিলেন রুদ্রমূর্তি। স্বভাববিরুদ্ধ মেসি তর্কে জড়ালেন রেফারির সঙ্গে, প্রতিপক্ষের ডাগ আউটে গিয়ে দিয়ে আসলেন হুমকি, গোলের উদযাপনে করলেন বিচিত্র সব অঙ্গভঙ্গি যা মেসির সঙ্গে কখনই যায় না। তবে এবার যে তিনি স্বপ্নপূরণ করেই ছাড়বেন। আর সেটা বৃত্তে বন্দি থেকে হবে না। তাই তো তিনি ’৮৬-র ম্যারাডোনাকে নিজেতে ফিরিয়ে এনে হয়ে গেলেন মেসিডোনা। আর এ সবকিছুরই সাক্ষী হলাম, বিস্মিত হলাম এবং অবশ্যই মুগ্ধতায় ভরে উঠল হৃদয়।

আমার অতি প্রিয় একজন ক্রীড়ালেখক একবার লিখেছিলেন, ‘ঈশ্বর নেমে এলে ফুটবল মাঠ আর ফুটবলের মাঠ থাকে না। স্বর্গরূপ নেয়।’ লুসাইল যেন সেই রূপটাই ধারণ করেছিল রবিবার রাতে। সেই স্বর্গ দখলের লড়াইটা যেমন প্রত্যাশিত ছিল, তেমনটাই হলো। শেষের অঙ্কটা মিলিয়ে বিশ্বসেরা মেসির আর্জেন্টিনা।

এমবাপ্পে পারেননি শেষের অঙ্কটা মেলাতে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। তাই তো স্বপ্নের সোনালি বুট জয়ের পরও ফরাসি বীরের চোখে-মুখে রাজ্যের বিষাদ। এমবাপ্পের শূন্য দৃষ্টি আমার এই ‘মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চাওয়া’ মনকেও নাড়া দিয়েছে। খুব বুঝতে পারছি, মেসিতে মত্ত এই হৃদয়ের একটা বড় অংশ এখন এমবাপ্পের দখলে। আহা! কী ভয়ংকর সুন্দর ফুটবল খেলেন তিনি! ২৩ বছর বয়সেই বিশ্ব কাঁপাচ্ছেন। জানি না কত-শত কীর্তি নিজের করে নেবেন আসছে দিনগুলোতে। কোন উচ্চতায় শেষ হবে তার বর্ণিল ক্যারিয়ার! এমবাপ্পে আসছেন। তবে অমরত্ব পেতে মেসি কী করেননি এই আসরে? স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৬ মিনিটে করা সেই জাদুকরি গোল। ফিরে আসছে সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বল নিয়ে সেই ঐশ্বরিক ছুট। এ আসরের অন্যতম সেরা ক্রোয়াট ডিফেন্ডার জসকো ভার্দিওলকে বোকা বানিয়ে আলভারেজকে দিয়ে গোল করানো আজীবনের সুখস্মৃতি হয়ে থাকবে।

কেবল মেসি নয়, এই বিশ্বকাপ মনে থাকবে আরও অনেক ঘটনায়। পুরো গ্রুপ পর্বে অবিশ্বাস্য সব অঘটনের ঘটনা ভুলি কী করে? সৌদি আরবের রূপকথার শুরু, স্পেন-পর্তুগালকে হটিয়ে মরক্কোর সেমিফাইনালে চলে আসা, জাপানের লড়াকু ফুটবল, পর্তুগিজ রাজা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর প্রস্থান; নতুন রাজা হয়ে গনসালো রামোসের হ্যাটট্রিকে আবির্ভাব, পাঁচবারের সেরা ব্রাজিলের বিষাদের সাগরে ডুব দেওয়া, নেইমারের চোট-ঝলক, রিচার্লিসনের অসামান্য গোল, এমিলিয়ানো মার্তিনেজের ঈগলের হাত, আলভারেজের মাকড়সার পা, সুয়ারেজের কান্নাÑ কোনো কিছুতেই কমতি ছিল না।

তারপরও একটা শূন্যতা নিয়েই ফিরতে হবে। এক মাসের দীর্ঘ চলার পথে দেখা মিলেছে কত-শত কিংবদন্তির। ফুটবল, ফুটবলের বাইরের অনেকের দেখা মিলেছে হাতছোঁয়া দূরত্বে। দূরের তারাদের খুব কাছ থেকে দেখে বিমোহিত হয়েছি। তবে যাকে দেখার আজন্ম স্বপ্ন ছিল, সেই ম্যারাডোনার দেখা পাইনি। দু’বছর আগে আকাশের তারা হয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর। তাই এই বিশ্বকাপ ভীষণভাবে মিস করেছে গ্যালারির ম্যারাডোনাকে। পেলেকেও খুব মনে পড়েছে প্রতিটা সময়ে। সাও পাওলোর হাসপাতালে নানা ব্যধির সঙ্গে লড়াই করছেন তিনবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিল কিংবদন্তি। সুস্থ থাকলে মরুর বিশ্বকার রাঙাতে তিনিও হয়তো হাজির হতেন ভুবনজয়ী হাসি নিয়ে। তাতে এই বিশ্বকাপটা হতো আরও বর্ণিল। এই দুই মহাতারকার শূন্যতা অবশ্য কিছুটা পূরণ হয়েছে দু’দেশের সমর্থকদের প্রচেষ্টায়। তারা না থেকেও ছিলেন ভক্ত-সমর্থকদের হৃদয়ে। মনে পড়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার পর পেলের বিশাল ব্যানার নিয়ে নেইমারদের শুভ কামনা জানানোর দৃশ্য। এই দুই মহাতারকার মতো শূন্যতায় হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছে প্রিয় ইতালির অনুপস্থিতি। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, বর্তমান ইউরোপ সেরা হয়েও বাছাই পর্ব উতরাতে না পেরে স্বপ্নের বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকতে হয়েছে আজ্জুরিদের। তাই যখনই দেল পিয়েরো, মাতেরাজ্জিরা হাতছোঁয়া দূরত্বে এসেছেন, তখনই মনটা বিষাদে ভরে উঠেছে।

সেসব শূন্যতা অবশ্য লহমায় দূর হয়েছে মেসির জাদুতে, অসামান্য এক ফাইনালের সাক্ষী হওয়ার আনন্দে। যে তৃপ্তি নিয়ে ফিরব নিজ ঠিকানায়। বাঁ পায়ের জাদুকর, এমবাপ্পের খুনে রূপের সঙ্গে কাতারের অসামান্য সব স্টেডিয়ামের মাধুর্যও সঙ্গী হবে ফিরতি পথে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত