সাবিনাদের কীর্তিতে আড়াল জামালদের ব্যর্থতা

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:৫৫ এএম

ফুটবলের জন্য ২০২২ স্মরণীয় হয়ে থাকবে কাতার বিশ্বকাপের কারণে। শেষভাগে এসে ফুটবল দায় শোধ করেছে বিশ্বের সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ শিরোপা তুলে দিয়ে। বিশ্বকাপ নিয়ে প্রায় পুরোটা সময় উন্মাতাল হয়ে ছিল বাংলাদেশও। বৈশ্বিক ফুটবলযজ্ঞে মেতে ওঠা হয়েছে ঠিক, কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্ব মঞ্চে এ বছরও পারেনি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে। পুরুষ ফুটবলে মেলেনি কোনোই সাফল্য। বরং গত বছরের চেয়ে খারাপ কেটেছে জামাল ভুঁইয়াদের। তবে ছেলেদের ব্যর্থতা ঢেকে গেছে মেয়েদের অসামান্য অর্জনে। গত সেপ্টেম্বরে ভারত, নেপালের দম্ভচূর্ণ করে দেশকে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দিয়েছে প্রথমবারের মতো। তাই জাতিও তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে দুহাত ভরে। নেপালকে হারিয়ে শিরোপা নিয়ে দেশে ফেরার পর যে বীরোচিত অভ্যর্থনা দেওয়া হয়েছিল বীর ফুটবলারদের, সে রকমটা অতীতে হয়নি কখনই, কোনো উপলক্ষেই।

সেপ্টেম্বরে কাঠমান্ডুতে নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ ফেভারিটের তকমা নিয়ে খেলেনি। তবে এবার যে কিছু একটা হবে, তা জুনেই বোঝা গিয়েছিল। ঘরের মাঠে গোলাম রব্বানী ছোটনের শিষ্যরা মালয়েশিয়ার মতো র‌্যাংকিংয়ে অনেক ধাপ এগিয়ে থাকা দলকে হারিয়েছ ৬-০ গোলে। প্রীতি সিরিজের পরের ম্যাচটা গোলশূন্য ড্র করে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বুক চিতিয়ে খেলার সাহস পায় মেয়েরা। সেই সাহস পুঁজি করে সাবিনারা শুরু করে সাফ অভিযান। এ গ্রুপের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপকে ৩-০ তে উড়িয়ে শুরু। পরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় ৬-০ গোলে। আসর ফেভারিট ভারতকে ৩-০ তে হারিয়ে গ্রুপসেরা হয়ে সেমিফাইনালে নাম লেখায় বাংলাদেশ। ফাইনালে যাওয়ার পথে ভুটানকে ৮-০ গোলে হারায় দুরন্ত বাংলাদেশ। তবে ফাইনালে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছিল স্বাগতিক নেপাল। ১৯ সেপ্টেম্বর স্বাগতিকদের হাজারো সমর্থকের সামনে ভড়কে না গিয়ে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলে সাবিনারা। তাতে জয়টা আসে ৩-১ গোলে। ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায় বাংলাদেশ। এর আগের পাঁচটি আসরে শিরোপা গিয়েছে শুধুই ভারতের ঘরে। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় দল হিসেবে সেই তালিকায় নাম উঠিয়েছে বাংলাদেশ। পরের দিন দেশে ফেরা বিজয়ী দলকে বিরোচিত সংবর্ধনা দেয় সরকার, ফুটবল ফেডারেশন এবং অবশ্যই সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের পক্ষ থেকে। ছাদ খোলা বাসে করে তাদের বিমানবন্দরে আনা হয় বাফুফে ভবনে। সে সময় রাজপথে নেমেছিল হাজারো মানুষের ঢল। দূর থেকে হাত নেড়ে সাবিনাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছে আপমর জনসাধারণ। এ ছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। যা অতীতে কখনই দেখা যায়নি। এরপর থেকে শুরু হয় একের পর এক সংবর্ধনা। যা চলেছে বছরের শেষ অবধি। আর সাফল্য দেশের নারী ফুটবলকে দেখাচ্ছে আরও বড় মঞ্চে ভালো খেলার স্বপ্ন। সিনিয়র পর্যায়ে এটিই ছিল বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের প্রথম সাফল্য। এ বছর আরও দুটি বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক আসরের ফাইনাল খেলার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন নারী ফুটবলাররা।

ছেলেরা ঠিক উল্টোরথের যাত্রী। সারা বছর খেলা আট ম্যাচের একটি মাত্র জয়, পাঁচ হার ও ২ ড্র বাংলাদেশের পুরুষ ফুটবলের দৈন্যই ফুটিয়ে তুলছে। শুরুটা হয়েছিল মালদ্বীপের গিয়ে প্রীতি ম্যাচে স্বাগতিকদের কাছে ২-০ গোলে নাস্তানাবুদ হয়ে। ২৪ মার্চ মালেতে সেই ম্যাচটা ছিল বাংলাদেশের কোচ হিসেবে আনকোরা ইংলিশ হাভিয়ের কাবরেরার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। অতীতে কোনো জাতীয় দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছাড়াই কাবরেরাকে স্বদেশি জেমি ডে’র স্থলাভিষিক্ত করে বাফুফে। এই নিয়োগের যৌক্তিকতার প্রমাণ দিতে পারেননি কাবরেরা। মালে থেকে ফিরে অবশ্য সুযোগ ছিল জয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার। প্রতিপক্ষ ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল মঙ্গোলিয়া। কিন্তু ম্যাচটা শেষ হয় গোলশূন্য ড্রয়ে। মূলত এই দুটি ম্যাচ ছিল এশিয়া কাপ বাছাইয়ের তৃতীয়পর্বের প্রস্তুতির মঞ্চ। নড়বড়ে প্রস্তুতি নিয়ে মালয়েশিয়ার যাওয়ার আগে অবশ্য ১ জুন ইন্দোনেশিয়া গিয়ে স্বাগতিকদের সঙ্গে একটি ম্যাচ খেলার সুযোগ হয়। সেই ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করে স্বাগতিকদের রুখে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস সঙ্গী হয়েছিল বাংলাদেশের। তবে ৮, ১১ ও ১৪ জুন বাহরাইন, তুর্কমেনিস্তান ও বাহরাইনের কাছে হেরে গ্রুপের তলানি থেকে এশিয়ান কাপের চূড়ান্তপর্বে খেলার স্বপ্ন ভেস্তে যায় কাবরেরার দলের। এরপর সেপ্টেম্বর কম্বোডিয়ায় প্রীতি ম্যাচে স্বাগতিকদের রাকিব হোসেনের গোলে ১-০ তে হারিয়ে আসা বাংলাদেশে নেপালে গিয়ে চরম লজ্জার মুখে পড়ে। স্বাগতিকরা বাংলাদেশকে উপহার দেয় ৩-১ গোলের হার। বছরের শুরুতে যেখানে ফিফা র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ছিল ১৮৬, বছর শেষে তা দাঁড়ায় ১৯২। ক্লাব ফুটবলে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ পকেটে পুড়লেও মাঠে ফুটবলাররা নিজেদের প্রমাণ করতে পারছে না। তাই গল্পটা থেকে যাচ্ছে একই হতাশার, আক্ষেপের।

সেই আক্ষেপটা আরও বেড়ে যায়, যখন এ দেশের মানুষ বুঝিয়ে দেয় তাদের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। বিশ্বকাপকে নিয়ে তাদের উন্মাদনা যখন জগৎজুড়ে ব্যাপক আলোচিত, তখন নিজ উঠোনের ফুটবলে তাদের আগ্রহ নেই। কিছুটা আগ্রহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অবশ্য করে যাচ্ছে বসুন্ধরা কিংস। এ বছর টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা নিজেদের করে নিয়েছে পেশাদারি ঢঙে পরিচালিত ক্লাবটি। একই সঙ্গে তারা এএফসি কাপেও আলো ছড়িয়ে এসেছে। বসুন্ধরার অগ্রযাত্রায় আবাহনী, মোহামেডানের মতো দলগুলোর পিছিয়ে পড়া অবশ্য দুঃসংবাদ। বছরের শেষভাগে সূচনা হওয়া ২০২২-২০২৩ মৌসুমের প্রথম আসর স্বাধীনতা কাপ শিরোপা জিতেছে কিংস। আর আবাহনীকে বিদায় নিতে হয়েছে ফাইনালের আগেই। মোহামেডানও রয়ে গেছে একই তিমিরে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত