ইসলামি বিধান মানুষের জন্য উভয় জগতে কল্যাণের বার্তা সুনিশ্চিত করে। ইসলামের বিধান পালনে ব্যক্তি যেমন পরকালে চিরস্থায়ী সুখের নীড়ে থাকবে, তেমনি দুনিয়ায়ও পাবে সর্বাধিক মঙ্গল। কল্যাণ নিশ্চিত করে না, ইসলাম ধর্মে এমন কোনো বিধিবিধান মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সব বিধিবিধানেই আছে কল্যাণ। আল্লাহতায়ালা মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন। কল্যাণ কামনার দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ দান করো। আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচাও।’ সুরা বাকারা : ২০১
ইসলামি শরিয়ার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ করা। মানবতার কল্যাণ করা হচ্ছে শরিয়ার উদ্দেশ্য। শরিয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, শরিয়ার গূঢ় উদ্দেশ্য হচ্ছে, জনগণের কল্যাণের মাধ্যমে তাদের আকিদা বিশ্বাস, জীবন, বুদ্ধিবৃত্তি, সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের সংরক্ষণ করা। যা কিছু এই পাঁচ বিষয় সংরক্ষণের নিশ্চয়তা বিধান করে তাই জনস্বার্থ বলে গণ্য এবং বিষয়টি কাম্য। ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, ‘শরিয়ার ভিত্তি হচ্ছে, মানুষের প্রজ্ঞা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে জনগণের কল্যাণ। আর কল্যাণ নিহিত রয়েছে সার্বিক আদল, দয়া-মমতা, কল্যাণকামিতা ও প্রজ্ঞার মধ্যে।’
ইসলামি শরিয়া আল্লাহ প্রদত্ত। এই শরিয়া প্রণয়নে মানুষের কোনো হাত নেই। শরিয়তের মূল বিশ্বাসে মানুষের বানানো নিয়ম স্থান পাবে না কখনো। ইসলামি শরিয়ত বিশ্বমানবতার জন্য এবং এটা প্রগতিশীল। কালের আবর্তনে উদ্ভূত সব সমস্যা সমাধানের জন্য কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক চিন্তা-গবেষণার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াসএই চারটি পদ্ধতি হলো ইসলামি শরিয়ার মৌলিক উৎস। পৃথিবীতে অদূর ভবিষ্যতে যত নতুন সমস্যা আসুক না কেন, ইসলামি শরিয়তে তার সুন্দর ও কল্যাণকর সমাধান রয়েছে।
ইসলামি শরিয়ার ইহকালীন কল্যাণের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলোহজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) দেড় হাজার বছর আগে বলেছেন, ‘মা-বাবা তোমার জান্নাত। মা-বাবাই তোমার দোজখ।’ সুনানে ইবনে মাজাহ : ৩৬৬২
আজকের পৃথিবী বুঝতে পেরেছে, মা-বাবাকে সম্মান করতেই হবে। মা-বাবাকে উপযুক্ত মর্যাদা ও সম্মান না দিলে পৃথিবী মরে যাবে ক্রমেই। হারিয়ে যাবে পবিত্রতা ও শুদ্ধতা। অথচ ইসলাম দেড় হাজার বছর আগে মা-বাবার সম্মানের বিধান নিশ্চিত করেছে। শুধু বছরের এক রবিবার নয়; নির্ধারণ করেছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত মা-বাবার জন্য।
অজু ও গোসলের বিধান দেওয়া হয়েছে নামাজ ও তাওয়াফের কাজ সম্পাদনের জন্য। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অজু ও গোসল মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। মানুষের ত্বক ভালো রাখে। শরীর ফুরফুরে করে। মনে প্রশান্তি আনে। জীবন পরিচালনায় গতির সঞ্চার হয় এবং এই অজুর মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন সভ্য মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
জামাতবদ্ধ নামাজের বিধান দেওয়া হয়েছে আল্লাহর স্মরণকে জাগরূক করার জন্য। মুসলমানদের পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনে উন্নতির জন্য। পরস্পরের ভালোবাসা বৃদ্ধির জন্য। মুসাফাহা, মুয়ানাকা আর প্রেমময় আলাপনে সুন্দর সম্পর্ক জিইয়ে রাখার জন্য। ইমান আকিদাকে মজবুত ও প্রচার করার জন্য এবং ইবাদতকে বিশুদ্ধ পন্থায় আদায়ের জন্য।
নামাজের উদ্দেশ্যে আজানের বিধান এসেছে ইবাদতের সময় হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার জন্য। মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি একত্র হওয়ার জন্য। আজান হচ্ছে, মানুষের বাস্তব জীবনে ইসলামের নীতি ও আদর্শ প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আজান ইসলামের মৌলিক সংস্কৃতি। ইসলামের বড়ত্বের ঘোষণার নিয়মিত রুটিন।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের বিধান দেওয়া হয়েছে আল্লাহর ইবাদত পালনের জন্য। স্থির আদর্শ ও আনুগত্যের ওপর নিজেকে অভ্যস্ত করার নিমিত্তে যথাসময়ে উপস্থিতির জানান দেওয়ার জন্য। অলসতা ঝেড়ে ফেলে সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার অনুসারী হওয়ার শিক্ষা নেওয়ার জন্য। নামাজ মানুষকে অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত রাখে। নামাজে মানুষের শারীরিক ব্যায়াম হয়। দেহ সুষ্ঠু ও মন সুস্থ থাকে। জীবনের নানাবিধ কুচিন্তা ও দুশ্চিন্তা কেটে যায়। জীবনে আসে সচ্ছলতা ও পবিত্রতা।
শূকর, মৃতদেহ ও রক্তের মতো অপবিত্র ও নিকৃষ্ট বস্তুগুলো মুসলমানদের ওপর হারাম করার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর আনুগত্য ও আদেশ পালন এবং শারীরিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিপর্যয় এবং ক্ষতি পরিহার। সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, এসব হারাম ও নিকৃষ্ট বস্তু মানব শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মানুষের জীবনকে ধ্বংস ও ভয়ংকর বিপদে নিপতিত করে।
ইসলামি শরিয়া মানুষকে বিয়ে উৎসাহিত করেছে। বলেছে বেশি বাচ্চা প্রসব করে এমন নারী বিয়ে করার জন্য। ভ্রুণ ও মানুষ হত্যা করা হারাম। অকারণে পরিবার পরিকল্পনা কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। চিরতরে বাচ্চা নেওয়া বন্ধকে করেছে হারাম। প্রকৃত মুসলমানরা ইসলামের নির্দেশ মেনে জনসংখ্যায় অধিক শক্তিশালী। পক্ষান্তরে ভিন্ন চিন্তার মানুষরা পরিবার পরিকল্পনা করে আজ বিপাকে পড়েছে। তাদের দেশের জনসংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। অনেক দেশের সরকার, শিশু-কিশোরদের জন্য সরকারি ভাতা পর্যন্ত জারি করেছে। তার পরও জনসংখ্যা বাড়ছে না।
ইসলামি শরিয়ার প্রত্যেকটি বিধানেই মানবজাতির জন্য রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ। বাস্তব জীবনে কল্যাণ করে নাএমন কোনো বিধান ইসলাম দেয়নি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।’ সুরা আলে ইমরান : ১১০
