আল্লাহর ভালোবাসা লাভের মাধ্যম

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০১:০৬ এএম

যে ব্যক্তি আমলনামাকে পাপ দ্বারা কলঙ্কিত করেছে, তার কর্তব্য হলো একনিষ্ঠ তওবার মাধ্যমে নিজেকে পাক-পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করা। তওবার মাধ্যমে দয়াময় আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়, তার প্রিয়পাত্র হওয়ার সুযোগ মেলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং তাদেরও ভালোবাসেন যারা পবিত্র থাকে।’ -সুরা বাকারা : ২২২

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্র্তৃক সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মরু প্রান্তরে তোমাদের কেউ হারানো (বাহন) পশু পাওয়ার পর যে পরিমাণ খুশি হয়, আল্লাহতায়ালা বান্দার তওবার পর এর থেকেও অধিক খুশি হন।’ সৃষ্টিকর্তা মহান রবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং তার প্রতি ভালোবাসা, আকাক্সক্ষা, দাসত্ব ও গোলামির সঙ্গে দ্রুত অগ্রসর হওয়াতেই রয়েছে বান্দার প্রকৃত জীবন ও সফলতা। আর সর্বোত্তমভাবে দাসত্বের বাস্তবায়ন হয় আল্লাহর কাছে বান্দার তওবাকারী হওয়ার মাধ্যমে। ফলে সে পাপকাজে জড়িত হবে না এবং এটাকে তার চরিত্র বানাবে না। বরং সে দুর্বলতা, পাপ ও পাপের গোলামি থেকে রবের রহমতের দিকে পলায়ন করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় তিনি তার দিকে প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রতি অধিক ক্ষমাশীল।’ -সুরা আল ইসরা : ২৫

আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রতি অধিক করুণা করেছেন। তাই তিনি যারা পাপ ও উদাসীনতায় নিমজ্জিত, তাদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখেন, তার দিকে ডাকেন, তাদের জন্য ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত রাখেন এবং তাদের ক্ষমার সুসংবাদের প্রতি অত্যন্ত নরম সুরে আহ্বান করেন। তিনি বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ -সুরা আয যুমার : ৫৩

ইস্তেগফার তওবার একটি অবশ্যকীয় বিষয় ও তার প্রবেশদ্বার। ইস্তেগফারের বিরাট মর্যাদা রয়েছে।

ইস্তেগফারকারীর বিভিন্ন অবস্থা রয়েছে। আদি পিতা-মাতা হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর ইস্তেগফার ছিল পাপের স্বীকারোক্তি এবং আসমান ও জমিনের রবের প্রতি লজ্জশীলতার প্রকাশ। দুই ভাই হজরত মুসা ও হজরত হারুন (আ.)-এর ইস্তেগফার ছিল সম্পর্ক রক্ষা এবং বিশ্বজগতের প্রতিপালকের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতার সাক্ষ্যস্বরূপ। আর আল্লাহর দুজন খলিলের (বন্ধু) ইস্তেগফার ছিলÑ অনুগ্রহ ও দয়ার স্বীকারোক্তি। মহান আল্লাহ তার সবচেয়ে বড় অন্তরঙ্গ বন্ধু নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে বলেছেন, ‘কাজেই জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ (উপাস্য) নেই। আর ক্ষমা প্রার্থনা করুন আপনার ও মুমিন নর-নারীদের ত্রুটির জন্য। আল্লাহ তোমাদের গতিবিধি এবং অবস্থান সম্পর্কে অবগত রয়েছেন।’ -সুরা মুহাম্মদ : ১৯

যখন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর জন্য ইস্তেগফার করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আয়েশার আগের ও পরের এবং প্রকাশ্য ও গোপন গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন।’ এ ইস্তেগফার শুনে যখন হজরত আয়েশা (রা.) আনন্দিত হলেন, তখন নবী করিম (সা.) বললেন ‘প্রত্যেক নামাজে এটি আমার উম্মতের জন্য আমার দোয়া।’ আমাদের প্রত্যেকের জন্যই হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। 

ইস্তেগফার আসমান থেকে বারী বর্ষিত হওয়াকে সহজ করে। ধন-সম্পদকে সমৃদ্ধ করে, উত্তম সামগ্রী এবং শরীরে শক্তির উৎস জোগায় এবং এটা পরম দয়ালু ও অতি স্নেহময়ের ভালোবাসা লাভের মাধ্যম।

ইস্তেগফার হলো মুমিনদের সঙ্গে ফেরেশতাদের সম্পর্কের সেতুবন্ধন। ইস্তেগফার মহান প্রতিপালক মাবুদের প্রতি অবিশ্বাস ও অকৃজ্ঞতার মতো অপরাধের সরল স্বীকারোক্তি এবং বিশ্বপালনকর্তা আল্লাহর ইবাদতের হক আদায়ে অপারগতা অবলোকন করার নাম। সুতরাং যে ব্যক্তি এ স্বীকারোক্তির ময়দানে তার পবিত্রতা ঘোষণা করবে, সে হবে তাসবিহ পাঠকারী, যে তার মহত্ত্ব বর্ণনা করবে সে হবে তাকবির পাঠকারী, আর যে তার গুণকীর্তন করবে সে হবে প্রশংসাকারী, আর যে তার একত্বের ঘোষণা করবে সে হবে- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠকারী। এ জন্য যে ব্যক্তি তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ), তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) এবং তাকবির (আল্লাহু আকবার) তেত্রিশ বার করে পাঠ করবে এবং একশত বার পূর্ণ করতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ দোয়াটি পড়বে; তার সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে, যদিও তা সাগরের ফেনা সমপরিমাণ হয়।

যে ব্যক্তি নামাজ আদায়কারী হয়, বস্তুত সে

ইস্তেগফারকারী হয়। রুকুর বিনম্রতার মধ্যে ইস্তেগফার রয়েছে। সিজদার বিনয়ের মধ্যে ইস্তেগফার রয়েছে। দুই সিজদার মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে বন্দি ও অসহায়ের মতো ইস্তেগফার। নামাজ শেষেও ইস্তেগফার রয়েছে। আর রোজা হলো ধৈর্যশীলদের ও বিশ্বপালনকর্তার পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রার্থীদের ইস্তেগফার। রমজান, আরাফা, আশুরা এবং অন্যান্য দিনের রোজার সঙ্গেও মাগফিরাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর মজলিসের কাফফারার দোয়া- যার মাধ্যমে মজলিসের ভুল-ত্রুটি মাফ করা হয়। তা হলো ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়াবি হামদিকা, আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আনতা, আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক।’

নবী করিম (সা.) তার বৈঠকগুলোতে প্রকাশ্যে ইস্তেগফার পাঠ করতেন। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একই মজলিসে বসে আমরা নবী করিম (সা.)-এর এই ইস্তেগফারটি একশ’ বার পর্যন্ত পাঠ করতে শুনতাম। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করো, আমার তওবা কবুল করো, নিশ্চয় তুমি অতিশয় তওবা কবুলকারী, দয়াবান।’

সাইয়্যেদুল ইস্তেগফারে রয়েছে দোষ স্বীকার, অঙ্গীকার নবায়ন এবং রব ও বান্দার মধ্যে প্রতিশ্রুতি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এই দোয়া পাঠ করবে, দিনে পাঠ করে রাতে মারা গেলে কিংবা রাতে পাঠ করে দিনে মারা গেলে, সে জান্নাতি হবে।’

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা খালাকতানি, ওয়াআনা আবদুকা ওয়াআনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া-দিকা মাস্তাতাতু, আঊজুবিকা মিন শাররি মাছানা-তু। আবুয়ূলাকা বিনিয়ামাতিকা আলাইয়া ওয়া আবুয়ূ বিজাম্বি ফাগফিরলি ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার পালনকর্তা। তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছো। আমি তোমার দাস। আমি আমার সাধ্যমতো তোমার কাছে দেওয়া অঙ্গীকারে ও প্রতিশ্রুতিতে দৃঢ় আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি আমার ওপরে তোমার দেওয়া অনুগ্রহকে স্বীকার করছি এবং আমি আমার গোনাহের স্বীকৃতি দিচ্ছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করো। কেননা তুমি ছাড়া পাপসমূহ ক্ষমা করার কেউ নেই।’ -সহিহ বোখারি

মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ ও সৃষ্টিজীবের মধ্যে আত্মীয়তা ও বংশীয় কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী ও ন্যায়ভিত্তিক ফায়সালাকারী। বান্দার পাল্লায় অণু পরিমাণ বিষয়ও পরিমাপ করা হবে এবং অপরাধীকে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর হলেও। সুতরাং সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করুন, নিয়ত বিশুদ্ধ করুন ও গোপন বিষয় সংশোধন করুন এবং পাপ থেকে দূরে থাকুন; আশা করা যায় আপনারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবেন।

১০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত