চট্টগ্রাম শহরে লাইটিংয়ের জগতে অনন্য হোসেন লাইটিং। ৩২ বছর ধরে এ খাতে ব্যবসা করে আসা প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘বেচা-বিক্রি কী করব, চাহিদা অনুযায়ী পণ্যই তো নেই। একটি ভবনের জন্য একই ধরনের ৫০টির কোনো আইটেমের দরকার হলে পাঁচ থেকে ছয়টির বেশি পাওয়া যায় না। আবার দামও আগের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। ডলার সংকটের কারণে এলসি ওপেন করা যাচ্ছে না বলে আমদানিও করা যাচ্ছে না।’ শুধু লাইটিংয়ের ক্ষেত্রে নয়, আবাসনে ব্যবহার্য প্রতিটি নির্মাণ উপকরণের ক্ষেত্রেই একই চিত্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষস্থানীয় একটি সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালের (ক্লিংকার, জিপসাম, স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ ও লাইমস্টোন) দাম কিন্তু বাড়েনি। তারপরও দেশে ভোক্তা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এর কারণ টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরকারের পক্ষ থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়িয়ে দেওয়া। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে বাজারে।
এদিকে সিমেন্টের পাশাপাশি রডের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ইকুইটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. কাজী আইনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছয় মাস আগে যে রডের দাম ছিল টনপ্রতি ৬৫ হাজার টাকা সেই রড এখন লাখের কাছাকাছি। ভবন নির্মাণের প্রধান উপকরণই হলো রড। এখন রডের দাম এভাবে বাড়লে ভবন নির্মাণ করব কীভাবে?’
রড, সিমেন্ট, লাইটিং, স্যানিটারি উপকরণ সব পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী মূল্যে দিশেহারা আবাসন খাত। শহরে গত এক বছর আগেও প্রতি বর্গফুট ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা দরে ফ্ল্যাট পাওয়া যেত। এখন সেই একই ফ্ল্যাটের দাম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রিহ্যাব চট্টগ্রাম জোনাল কমিটির চেয়ারম্যান আবদুল কৈয়ূম বলেন, ‘জামালখান এলাকায় এখন প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দর ৮ হাজার টাকার বেশি। অর্থাৎ কম দামে আর ফ্ল্যাট নেই। নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডেভেলপাররা দাম কমাতে পারছেন না।’
উপকরণের দাম বাড়ায় ফ্ল্যাটের দামেও তার প্রভাব পড়েছে। ফলে ক্রেতারাও আশাহত। বিভিন্ন আবাসন কোম্পানির কর্ণধারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারে প্রচুর গ্রাহক রয়েছে। অর্থাৎ মানুষ এখন প্লটের পরিবর্তে ফ্ল্যাটের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু হঠাৎ করে দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই আশাও কমে গেছে।
আবু বকর বিন হাশেম নগরীর একটি প্রাইভেট কলেজের সহকারী অধ্যাপক। দেবপাহাড় এলাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য ২০২১ সালে প্রতি বর্গফুট সাড়ে ৫ হাজার টাকায় নেওয়ার কথা বললেও এখন এর দাম হাঁকানো হচ্ছে ৮ হাজার টাকা।
দাম বাড়ার প্রসঙ্গে সিপিডিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়লে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে এটা স্বাভাবিক। ফলে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে ফ্ল্যাট রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে ৩০ বছরেও বাড়েনি নগরীতে ফ্ল্যাটের বিস্তৃতি। নগরীতে আবাসন ফ্ল্যাট প্রকল্প সর্বপ্রথম চালু হয় ১৯৯২ সালে। নগরীর ষোলশহর সিঅ্যান্ডবি কলোনি এলাকায় আইডিয়াল হোম ডেভেলপমেন্ট ‘আপন নিবাস’ নামে আবাসন প্রকল্প চালু করেছিল। সেই শুরুর পর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, খুলশী, পাঁচলাইশ, চকবাজার, মেহেদীবাগ, জামালখান, নন্দনকানন ও কোতোয়ালি এলাকায় ব্যাপকহারে ফ্ল্যাট তৈরি হলেও অন্যান্য এলাকায় তেমনভাবে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো ফ্ল্যাট নির্মাণে আগ্রহী নয়।
ফ্ল্যাট প্রকল্প কিছু এলাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণ কী? শহরের ভেতরে প্রতি বর্গফুট ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি হলেও প্রান্তীয় এলাকায় দাম আরও কমে আসার কথা। কিন্তু সেসব এলাকায় ডেভেলপাররা প্রকল্প নিচ্ছেন না। এ বিষয়ে এপিক প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিহ্যাব চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি এসএম আবু সুফিয়ান বলেন, ‘এখনো চট্টগ্রাম শহর মানেই খুলশী, নাসিরাবাদ, মেহেদীবাগ, পাঁচলাইশ, জামালখান, চকবাজার ও নন্দনকানন এলাকা। এসব এলাকার বাইরে মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে চায় না। আর ক্রেতারা যেসব এলাকায় থাকতে চাইবে ডেভেলপাররাও সেসব এলাকায় ফ্ল্যাট নির্মাণ করবে। এটাই স্বাভাবিক।’
ডেভেলপারদের মতে, নগরীর অন্যান্য এলাকায় সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, শপিং মলসহ নগরবাসীর বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে মানুষ ওইসব এলাকায় ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হবে। বর্তমানে জাকির হোসেন রোডের নাসিরাবাদ প্রপার্টিজ, পলিটেকনিক এলাকায় এয়াকুব ফিউচার পার্ক এলাকায় অনেক ডেভেলপার ফ্ল্যাট প্রকল্প নিয়েছেন। মূলত খুলশী এলাকার ফ্লেভার দিতেই নাসিরাবাদের পাহাড়ি এলাকায় গিয়েছেন ডেভেলপাররা। নগরীর জামালখান এলাকায় সবচেয়ে বেশি ফ্ল্যাট নির্মাণ করছে সিপিডিএল। চট্টগ্রাম মহানগরীর নগরীর বিশদ উন্নয়ন পরিকল্পনা করে থাকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
পুরো শহরে উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধার অসাম্য প্রসঙ্গে সংস্থাটির সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান বলেন, ‘ডেভেলপাররা সবসময় প্রফিটবেইজ প্রকল্প নিয়ে থাকেন। তাই যেখানে তারা বেশি লাভ করতে পারবেন সেখানে প্রকল্প নেয়। কিন্তু নগরীর অন্যান্য এলাকায় মধ্যম আয়ের মানুষদের জন্য চাইলে প্রকল্প নেওয়া যায়।’
আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠার পেছনে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও বড় একটি ফ্যাক্টর। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলো তিনি বলেন, ‘এ জন্য আমাদের মতো সরকারি সংস্থাগুলো হালিশহর, পতেঙ্গা বা বাকলিয়া এলাকাগুলোতে হাসপাতাল, স্কুল, শপিং মলসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। একই সঙ্গে সিডিএকে ওইসব এলাকায় প্লট বা ফ্ল্যাট প্রকল্প গ্রহণ করে অন্যদের উৎসাহিত করতে হবে।’
তবে প্রকল্প যেখানেই নেওয়া হোক না কেন, নির্মাণ উপকরণের দাম না কমলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আবাসন খাত। ফ্ল্যাটের দাম অনেক বেড়ে যাবে এবং মধ্যবিত্তের নাগালেরই বাইরে চলে যাবে। এতে শুধু উচ্চবিত্তদের জন্যই তৈরি হবে ফ্ল্যাট।
