অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী। কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের সভাপতি। মাদরাসা দাওয়াতুল হক, দেওনা, কাপাসিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। মুহিউস সুন্নাহ মাওলানা আবরারুল হক হারদুঈ (রহ.)-এর খলিফা। এই সিলসিলায় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বহু আলেম ও ওয়ায়েজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক রাহবারে পরিণত হয়েছেন তিনি। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ গঠন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাসহ নানা বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
দেশ রূপান্তর : একজন জেনারেল শিক্ষিত হয়ে আলেমদের সান্নিধ্যে কীভাবে এলেন?
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী : আমি একজন জেনারেল শিক্ষিত মানুষ। আমার গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়া হলেও আমি পুরান ঢাকায় বড় হই। আল্লাহর রহমতে পারিবারিকভাবে ইসলামি ভাবধারা ও পরিবেশে বড় হয়েছি। নিয়মিত নামাজ পড়তাম, স্থানীয় মসজিদের ইমামের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল। জগন্নাথ কলেজে পড়ালেখার সময় আমি ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে যাই। দেশে তখন তীব্র এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। ওই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুদিন গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়ায় কাটাই। তখন পার্শ্ববর্তী এলাকা কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মাওলানা আবদুল হালিম হুসাইনি (রহ.)-এর সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়। আমি হুজুরের কাছে মুরিদ হই। তিনি আমার প্রথম পীর ও শায়েখ।
মাওলানা আবদুল হালিম হুসাইনি (রহ.) ছিলেন কামেল মানুষ। আল্লাহর রহমতে আমি হুজুরের খেদমতের সুযোগ পেয়েছি। মৃত্যুর আগে তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়, তখনো আমি হুজুরের সঙ্গে ছিলাম। ১৯৮৬ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
পড়ালেখা শেষে আমি ইসলামপুরে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করি। ঢাকার বিভিন্ন আলেম-ওলামাদের কাছে যাতায়াত ছিল। এ সময় ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মাওলানা ফজলুর রহমান (রহ.)-এর মাধ্যমে জানতে পারি মুহিউস সুন্নাহ মাওলানা আবরারুল হক হারদুঈ (রহ.) (হারদুঈ ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি শহর) ঢাকায় আসবেন এক ওলামা সম্মেলনে অংশ নিতে। তখন আমি হজরতকে প্রথমে দেখি। এরপর ১৯৮৯ সালে আমি হজরতের কাছে বায়াত হই। আমার যাতায়াত চলতে থাকে হারদুঈ হজরতের কাছে। সময় পেলেই আমি হজরতের খেদমতে হাজির হতাম। ১৯৯৪ সালে হজের সফরে মদিনা মোনাওয়ার হজরত আমাকে চিঠির মাধ্যমে লিখিতভাবে খেলাফত প্রদান করেন এবং সেখানে উল্লেখ ছিল কোনো আলেম যদি আমার সঙ্গে ইসলাহি (আধ্যাত্মিক) সম্পর্ক গড়তে চায়, আমি যেন তাকে ফিরিয়ে না দিই। ২০০৫ সালের ১৭ মে ৮৮ বছর বয়সে হজরত ইন্তেকাল করেন। এরপর থেকে আমি হজরতের জামাই হাকিম কালিমুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলছি। তিনিই এখন আমার মুরব্বি ও শায়খ, আমি তার নির্দেশনায় চলি।
দেশ রূপান্তর : কওমি শিক্ষক পরিষদ গঠনের কারণ ও এর প্রয়োজনীয়তা কী?
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী : প্রথম কথা হলো, কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ সম্পূর্ণভাবে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এখানে কওমি মাদ্রাসার নানা পর্যায়ে খেদমতে নিয়োজিতরা যুক্ত থাকবেন। অর্থাৎ দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসরণে প্রতিষ্ঠিত এবং বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়াসহ স্বীকৃত অন্য পাঁচ বোর্ডের কারিকুলাম অনুযায়ী পরিচালিত মক্তব, নুরানী, নাজেরা, হেফজ, ইবতেদায়ি জামাত থেকে তাকমিল এবং তদূর্ধ্ব বিভাগে শিক্ষাদানকারী কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এই সংগঠনের আওতাভুক্ত থাকবেন।
সংগঠনের উদ্দেশ্য হলো কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সুরক্ষা ও স্বকীয়তা বজায় রাখা। কওমি শিক্ষা ও শিক্ষকদের মানোন্নয়ন, কওমি মাদ্রাসার পরিচালক, মুহতামিম, শিক্ষক ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা। দেশের সব সেক্টরে কর্মরতদের একটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের ক্ষেত্রে। নানা কারণে এটা হয়ে ওঠেনি। আমরা শুরু করলাম, এর ভালো-মন্দ, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ইত্যাদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। সংগঠন একেবারে শুরুর পর্যায়ে। ধীরে ধীরে আলেম-ওলামারা যুক্ত হচ্ছেন। আশা করি একদিন এটা পূর্ণতা পাবে ইনশা আল্লাহ।
সংগঠনের প্রয়োজনীয়তার অনেক কারণ রয়েছে, এর অন্যতম হলো যেহেতু দ্বীনি শিক্ষা সরাসরি আল্লাহপ্রদত্ত শিক্ষা (ইলমে অহি)। সকল প্রকার প্রান্তিকতা ও সীমারেখার ঊর্ধ্বে। এটি একটি বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় দেন দক্ষ আলেম হওয়ার জন্য। ছাত্ররা শিক্ষকদের নিকট আমানত। তাদের সার্বিক কল্যাণে উত্তম শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এমতাবস্থায় শিক্ষাবহির্র্ভূত সব ধরনের কর্মকা- থেকে তাদের বিরত রাখা। দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষানীতিও এটাই।
এক কথায়, মাদ্রাসায় শিক্ষার পরিবেশ বজায় এবং মেধাবী আলেম তৈরির পথ উন্মুক্ত রাখা। এ বিষয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকদের সচেতন করে জনমত গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এ ছাড়া শিক্ষকদের ন্যূনতম চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে বেতন-ভাতা নির্ধারণ এবং মাস শেষে নিয়মিত পরিশোধে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণে মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আপৎকালীন ও ভবিষ্যৎ আর্থিক কল্যাণে অংশীদারিত্বমূলক প্রভিডেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা, মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের হঠাৎ প্রয়োজনে, দুর্ঘটনায়, অসুস্থতায় কিংবা কর্মহীন সময়ে আর্থিক সাহায্য প্রদানের নীতিমালা গঠন।
আরেকটি লক্ষ্য, কথিত আধুনিকায়নের নামে মাদ্রাসা শিক্ষা সংকোচনের প্রবণতা প্রতিরোধ করা। কারণ মেডিকেল সায়েন্সে যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা দেওয়া হয় না, তেমনি দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রে জাগতিক কোনো শিক্ষা পরিপূর্ণভাবে আশা করা উচিত না; কওমি শিক্ষাও তাই। এখানে দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি আনুষঙ্গিক অন্য বিষয় প্রয়োজন অনুপাতে পাঠ্যসূচিতে থাকবে। এটা অতীতেও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু সেটা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয় তা খেয়াল রাখা। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, কওমি মাদ্রাসার পরিচালনার ক্ষেত্রে বুনিয়াদি সূত্র ‘উসূলে হাশতেগানা’ (দেওবন্দের অনুসৃত অষ্টনীতি) কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
শিক্ষা কমিশন এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে কওমি ওলামায়ে কেরামের সম্পৃক্ততা খুবই জরুরি। শিক্ষক পরিষদ এ বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। শিক্ষক পরিষদ মনে করে, জেনারেল শিক্ষাব্যবস্থার একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। ধর্মশিক্ষার ফলে মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটবে। এর দ্বারা সমাজ নানাভাবে উপকৃত হবে।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়ে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী : যেকোনো শিক্ষা ও পেশার গুণগত মান্নোয়নের জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষকদের জন্য বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মাদ্রাসা শিক্ষায় মেধাবীদের ধরে রাখতে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষকসুলভ মানমানসিকতা তৈরি হয় না। আকর্ষণীয় কার্যকর পন্থায় পাঠদানের পদ্ধতি জানা থাকলে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার প্রতি আকৃষ্ট ও আগ্রহী হয়। দুঃখের বিষয় হলো, যথাযথ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা না থাকার কারণে কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক সংকট দিন দিন বাড়ছে। অনেক শিক্ষক পেশার প্রতি একাগ্র নয়। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক শিক্ষকের দায়িত্বহীন ভূমিকার কারণে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিরূপ মনোভাবের শিকার হন, শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমতাবস্থায় কওমি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষকসুলভ মনমানসিকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশিক্ষিত করা সময়ের দাবি।
এই প্রয়োজনীয়তার আলোকে সম্মিলিত উদ্যোগে অভিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের নিবন্ধন করে তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রশিক্ষণের আওতায় ক. মাদ্রাসার মুহতামিমদের (প্রতিষ্ঠান প্রধান) প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা, খ. শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং গ. স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হিসাব সংরক্ষণ ও অফিস ব্যবস্থাপনা বিষয়ে হিসাব রক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
দেশ রূপান্তর : কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রতি আপনার বিশেষ কোনো কথা আছে কি?
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী : শিক্ষা সংকোচন তথা শর্ট কোর্সকে উৎসাহ না দেওয়া। সেই সঙ্গে বাংলায় অনূদিত নোট বই, গাইড বই ও সিলেবাসকেন্দ্রিক পড়াশোনা কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। গুরুত্বের সঙ্গে মূল কিতাবগুলো পাঠদান করা।
