স্বপ্নের মেট্রোরেল চালু হলেও নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক দুশ্চিন্তায় পড়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রায় মাসখানেক আগে রেলের একটি বগির জানালার কাচ ভাঙচুরের ঘটনায় উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওই ঘটনায় জড়িতদের এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছে সরকারের হাইকমান্ড। যেকোনো উপায়ে দুর্বৃত্তদের ধরতে বলা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে মেট্রোপুলিশ ইউনিট (এমআরটি) গঠন চূড়ান্ত করে আনা হয়েছে। ১৫ দিন আগে ইউনিট গঠনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা।
পুলিশের এই ইউনিটটি গঠনে একজন উপমহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে ২৩১ জনের জনবল চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করবে বলে পুলিশ সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, রাজধানীর মিরপুর এলাকায় ঢিল মেরে মেট্রো ট্রেনের বগির জানালার কাচ ভেঙে দেওয়ার পর টনক নড়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। তারা ঘটনাস্থলসহ আশপাশে এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালায়। এ ঘটনায় কাফরুল থানায় মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করলেও কাউকে আসামি করা হয়নি। জড়িতদের ধরতে থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব ও সিআইডিসহ পুলিশের সবকটি ইউনিট মাঠে কাজ করছে। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ফুটেজ না থাকায় অপরাধীদের ধরতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আর এ কারণে সরকারের হাইকমান্ড নির্দেশ দিয়েছে, মেট্রোরেল লাইনের আশপাশে যেসব বাসাবাড়ির ছাদ আছে, সেগুলো ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার আওতায় আনতে। ইতিমধ্যে সিসি ক্যামেরা স্থাপন নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি কী ধরনের নিরাপত্তা বাড়ানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা করছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা ও এর আশপাশে পাঁচটি মেট্রোরেল নির্মিত হচ্ছে। বর্তমানে এমআরটি-৬ রুটে উত্তরার দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ট্রেন চলছে। এ রুট চালু হওয়ার আগেই এর নিরাপত্তার জন্য পুলিশের একটি নতুন ইউনিট গঠনে তোড়জোড় শুরু হয়। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তর একটি প্রস্তাব তৈরি করে। পুলিশের এ বিশেষ ইউনিটটির নাম দেওয়া হয় মেট্রোরেল পুুলিশ ইউনিট। সংক্ষেপে সেটি বলা হচ্ছে এমআরটি পুলিশ। প্রস্তাবে একজন উপমহাপরিদর্শক, একজন অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক, তিনজন পুলিশ সুপার, চারজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, তিনজন সহকারী পুলিশ সুপার, ১৪ জন পরিদর্শক, ২১ জন উপপরিদর্শক, একজন সার্জেন্ট, ৭৪ জন সহকারী উপপরিদর্শক, ২৫ জন নায়েক, ৬৩৯ জন কনস্টেবলসহ ৮০৯ জন জনবলের একটি সাংগঠনিক কাঠামো করা হয়। প্রস্তাবটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করে। বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট বাস্তবায়নে জন্য প্রস্তাবটি পাঠানো হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে জনবল আরও কমিয়ে প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একজন ডিআইজির নেতৃত্বে ২৩১ জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরপর প্রস্তাবটি পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘এমআরটি পুলিশের কার্যক্রম দ্রুত সময়ে শুরু হবে। এজন্য আমরা কাজ করছি। মেট্রোরেল আমাদের স্বপ্ন। আর এ স্বপ্নটির নিরাপত্তার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করা হবে। ঢিল মারার ঘটনায় দুর্বৃত্তদের ধরতে পুলিশ ও র্যাব কাজ করছে। আশা করি দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’
সূত্র আরও জানায়, ২০১৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় মেট্রোরেলের জন্য পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর থেকে ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
চূড়ান্ত হওয়া মেট্রোরেল পুলিশের জনবলের মধ্যে একজন ডিআইজি, একজন পুলিশ সুপার, দুজন পরিদর্শক, চারজন উপপরিদর্শক, চারজন সহকারী উপপরিদর্শক, পাঁচজন নায়েক, ১০ জন কনস্টেবল, একজন কম্পিউটার অপারেটর, একজন হিসাবরক্ষক, একজন উচ্চমান সহকারী, দুজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাজের জন্য। আর এমআরটি লাইন ৬-এর জন্য একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ছয়জন পরিদর্শক, দুজন উপপরিদর্শক, ৩৪ জন সহকারী উপপরিদর্শক ও ১৫৩ জন কনস্টেবল।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে এমআরটি পুলিশের জন্য চৌকস কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের বাছাই করা হচ্ছে। ১২৮ দশমিক ৭৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ যোগাযোগ নিরাপত্তা দেবে এমআরটি পুলিশ। এই ইউনিটের সদস্যদের জন্য থাকবে আলাদা ইউনিফর্ম। মেট্রোরেলের প্রতিটি স্টেশনে পুলিশ ফাঁড়ি থাকবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে আরএমটি পুলিশের অপারেশন কাজ শুরু হবে। উত্তরা অথবা কমলাপুরে ইউনিটটির প্রধান কার্যালয়ে থাকবে।
