আবারও গাছ কেটে ভবন নির্মাণ করতে যাচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) একাডেমিক ভবন নির্মাণের জন্য যে স্থান নির্বাচন করে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে সেখানে পাঁচ শতাধিক গাছ রয়েছে। ইনস্টিটিউটের নিজস্ব অর্থায়নে ওই ভবন নির্মিত হবে বলে জানা গেছে। বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) দক্ষিণে বিজ্ঞান কারখানার পার্শ্ববর্তী স্থানে ইনস্টিটিউটের নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম। ওই স্থানে গাছ কেটে ভবন নির্মাণের সমালোচনা করছেন শিক্ষার্থীরা। ভবন নির্মাণের স্থান পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনসহ উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ওই এলাকায় আইবিএ’র জন্য ৮ বিঘা, ইনস্টিটিউট অব রিমোট সেন্সিং অ্যান্ড জিআইএস এবং বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের জন্য ৬ বিঘা করে মোট ২০ বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই ভবনগুলো নির্মাণ করতে গিয়ে ওই এলাকায় সব মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক গাছ কাটা পড়বে। এর মধ্যে কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছও রয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা। পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে গাছ কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর যথাযথ পরিকল্পনা করে ভবনগুলো নির্মাণ করা গেলে সবুজায়ন ধ্বংস এড়ানো যেতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনাবিদরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করে যত্রতত্র ভবন নির্মাণ করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এভাবে চলতে থাকলে সেটি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের মতো জায়গায় মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়নকাজ করা ঠিক না। এসব কাজ স্থগিত রেখে অচিরেই মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে তারপর কাজ করা উচিত।’ পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামালউদ্দিন রুনু বলেন, ‘গাছ কেটে যেখানে সেখানে ভবন নির্মাণ করলে ওইখানে যে জীববৈচিত্র্য রয়েছে সেটি বিনষ্ট হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবুজায়নের যে বৈশিষ্ট্য আছে তা ধ্বংস হবে।’
এর আগে ২০১৭ সালে আইবিএ এবং আইআইটি ভবন নির্মাণের জন্য বোটানিক্যাল গার্ডেন ও মীর মশাররফ হোসেন হলের মধ্যবর্তী উত্তর পার্শ্বে ৩৫-৪০টি গাছ কেটে ফেলা হয়। পরে আইবিএ’র ভবন নির্মাণের স্থান পরিবর্তন হয়।
২০১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এ প্রকল্পটি দুই ধাপে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত ৪ বছরেও প্রথম ধাপের কাজ শেষ করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এ প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে ছেলেদের তিনটি এবং মেয়েদের জন্য তিনটি হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের পাশে ছেলেদের জন্য তিনটি হল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেখানে হল নির্মাণ করা হলে সাত শতাধিক গাছ কাটা পড়বে এমন শঙ্কায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের বিরোধিতায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখে প্রশাসন।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা থাকার সত্ত্বেও ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট সকালে ওই এলাকার অর্ধশতাধিক গাছ কেটে ফেলে প্রশাসন। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গিয়ে বাধা দিলে গাছ কাটা বন্ধ করে সংশ্লিষ্টরা। এরপর বাধ্য হয়ে স্থান পরিবর্তন করে করোনাকালে ২০২০ সালে শহীদ রফিক-জব্বার হলের দুপাশে হল তিনটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সেসব হলের মধ্যে একটি চালু হয়েছে বাকি দুটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। ওই প্রকল্পের আওতায় মেয়েদের তিনটি হল নির্মাণের নির্ধারিত স্থানে বিভিন্ন প্রজাতির ২০৭টি গাছ ছিল। প্রতিবাদ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো কেটে সেখানে হল নির্মাণ করেছে প্রশাসন।
গেল বছরের ৮ জুন উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ১৪টি স্থাপনা নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। এই কাজ করতে গিয়ে এরই মধ্যে পাঁচ শতাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পুরো প্রকল্প শেষ করতে আরও কয়েকশ’ গাছ কাটা পড়বে।
গাছ কেটে ভবন নির্মাণ বন্ধ করা এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নসহ অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। আইবিএ এ ছাড়া নির্বিচারে গাছ কেটে নতুন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠন ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন। গতকাল বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে সংগঠনটি বলেছে, যেখানে তিনটি ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে ওই স্থানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ঘন গাছপালা সমৃদ্ধ এবং স্থানটি বন্যপ্রাণীদের বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র। তারা ভবন নির্মাণের স্থান পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছেন। পাশাপাশি গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের দাবিতে মানববন্ধন এবং বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমর্ত্য রায় বলেন, আমরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন না করে যত্রতত্র ভবন করা যাবে না। কিন্তু প্রশাসনের কার্যকারিতার চিত্র উল্টো। তারা অপরিকল্পিতভাবেই টাকা খরচ করতে চান। প্রশাসনের এই অপরিকল্পিত নীতি, ব্যয় সংকোচন না করে যত্রতত্র গাছ কেটে ভবন নির্মাণে বাধা দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।
এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম বলেন, আইবিএ ইনস্টিটিউটের ভবনটি ওই ইনস্টিটিউটের নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে যেসব কাজ চলছে সেটাকে আমি ঠিক মাস্টারপ্ল্যান বলব না। টিএসসির পাশের জায়গায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সিন্ডিকেট। এ ক্ষেত্রে আমার কোনো হাত নেই।
