আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণিতে আবারও লিখিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। সরকারের এই পদক্ষেপে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সন্তানকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে অনেকেই এখন কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের (প্রাইভেট টিউটর) দ্বারস্থ হচ্ছেন। অভিভাবকদের উদ্বেগ দূর করতে গত মাসে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ছোট শিশুদের ভর্তি প্রক্রিয়াটি সহজ হবে এবং এতে কোচিং বা প্রাইভেট পড়াকে উৎসাহিত করা হবে না।
তবে রাজধানীর বেশ কয়েকটি কোচিং সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, তারা ইতোমধ্যেই প্রথম শ্রেণির ভর্তিচ্ছুদের জন্য বিশেষ কোর্স ও নির্দিষ্ট স্কুলভিত্তিক গাইডলাইন দেওয়া শুরু করেছে। অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে স্কুলজীবন শুরুর আগেই শিশুদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
আবার প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা : কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ দূর করতে ২০১১ সালে সরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে লটারিভিত্তিক ভর্তিপ্রথা চালু করা হয়েছিল। চলতি বছর শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই লটারি পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১৭ লাখ ৪৮ হাজার ছেলে এবং ১৭ লাখ ৯৯ হাজার মেয়ে। এই বিপুলসংখ্যক শিশুর পরীক্ষা সম্পন্ন করা সরকার এবং স্কুলগুলোর জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের অভিভাবকদের পছন্দের স্কুল হাতেগোনা। ফলে এই কয়েটি স্কুলে ভয়াবহ ভর্তিযুদ্ধ হবে। যাতে, বেশিরভাগ শিশু অকৃতকার্য হয়ে জীবনের শুরুতেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। এদের শিক্ষায় আগ্রহ কমে যাবে। জীবনের শুরুতেই শিশুদের এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?
এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, লটারি পদ্ধতিতে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। লটারির নামে স্বজনপ্রীতির অনেক অভিযোগও রয়েছে। তবে শিক্ষা নিয়ে বারবার সিদ্ধান্ত বদল এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে শিক্ষা নিয়ে যত পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, তা আর কোনো ক্ষেত্রে হয়নি। এর ফলে আমাদের শিক্ষার মান তলানিতে, বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। লক্ষ্যহীন শিক্ষায় জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ কমছে।
বারবার বদলে যাচ্ছে কারিকুলাম : একটা সরকার পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষার কারিকুলাম ও শিক্ষানীতির আমূল পরিবর্তন হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর শিক্ষাব্যবস্থার সবকিছু পাল্টে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৮ সাল থেকে স্কুলগুলোয় এ কারিকুলাম চালু করবে সরকার। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘ সময়ে টেকসই শিক্ষা কারিকুলাম না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোর থেকে তরুণ-তরুণীরা। ২০১৩ সালে শিক্ষায় নতুন জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম এনেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০২৩ সালে ফের নতুন জাতীয় শিক্ষা কারিকুলাম বাস্তবায়ন শুরু করে দলটি। এই কারিকুলাম নিয়ে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয় শিক্ষা খাতে।
এরপর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্তর্বর্তী সরকার এক যুগ পেছনে ফিরে গিয়ে ২০১২ সালের কারিকুলাম অনুযায়ী ২০২৫ সালে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বই বিতরণ করে। চলতি বছরও শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে এক যুগের বেশি সময়ের আগে প্রণয়ন করা কারিকুলামে। ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলামের বই পাবে ছাত্রছাত্রীরা। অর্থাৎ, ২০২৩ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ-ছয় বছরেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে তিনটি কারিকুলাম। কিছুদিন পরপর খোলনলচে বদলে ফেলার কারণে শিক্ষা খাতে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষা কারিকুলাম পরিবর্তনে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে, বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার কোনো তাগিদ নেই। বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন বলতে এখনও অবকাঠামোগত উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তার পছন্দের এলাকায় বড় বড় দালানসমৃদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। কিন্তু ভালো শিক্ষক এবং উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে না। ফলে, কিছুদিনের মধ্যেই এসব সুন্দর ভবন অবহেলায় পড়ে থাকে। বাংলাদেশের শতকরা ৪০ শতাংশ সরকারি স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। ভালো মানের শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা এখন সরকারি স্কুলের চেয়ে বেসরকারি স্কুলের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে প্রাথমিক শিক্ষার করুণ চিত্র : বাংলাদেশের শিক্ষার সবচেয়ে করুণ দশা প্রাথমিক শিক্ষায়। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাব্যবস্থার একটি। দেশে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ২ কোটি ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮ শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি ও ৫৩ হাজার ৩৮টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। আজ বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের সংকট, প্রশাসনিক জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অতিরিক্ত অশিক্ষামূলক দায়িত্ব শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় গুণগত প্রাথমিক শিক্ষার দিক দিয়ে আমরা এখনো পিছিয়ে।
মাধ্যমিক শিক্ষাও ধুঁকছে : মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা আরও করুণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হলো মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি সরকারের অবহেলা। প্রাথমিক পর্যায়ে সরকারি স্কুলের প্রাধান্য বিরাজ করে। এ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বাকি ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করে।
উচ্চশিক্ষা (তথা ব্যাচেলর ও মাস্টার ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার) দিকে তাকালে আমরা দেখি, ব্যক্তি খাতে ১০৮টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত। যদি মাধ্যমিক (এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের) শিক্ষার দিকে তাকাই, তাহলে দেখি, মাত্র ৭ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত এবং বাকি ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা লাভ করে। বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পারিতোষিকের একটি অংশ সরকারি তহবিল থেকে প্রদান করা হয়। এ বন্দোবস্তের নাম ‘মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও) এমপিও ব্যবস্থার একটি প্রত্যক্ষ ফল হলো বৈষম্য। কারণ, সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তুলনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কম ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি পান এবং অনেক সময় পানও না। সামগ্রিকভাবে এ বন্দোবস্তের ফলে মাধ্যমিক শিক্ষকদের মধ্যে একটি শ্রেণি বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছে।
উচ্চ শিক্ষার বেহাল দশা : প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার যখন এই করুণ অবস্থা, তখন উচ্চশিক্ষার মান কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দেওয়া নয়, তাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক বোধের বিকাশ ঘটানো। সৃজনশীলতা, সহযোগিতা, পরিস্থিতির সঙ্গে মানানসই হওয়া ও আজীবন শিক্ষার ক্ষমতা কোনো কোর্সের সিলেবাসে আটকে রাখার মতো বিষয় নয়। এসব গড়ে ওঠে একটি গতিশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক পরিবেশের মাধ্যমে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে এখনো আমরা ভাবি তাত্ত্বিক চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে, যা শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেকটাই দূরে। একদিকে সমাজ চায় সৃজনশীল, নৈতিক ও অভিযোজনে সক্ষম নাগরিক; অন্যদিকে শিল্প ও শ্রমবাজার চায় এমন স্নাতক, যে প্রথম দিন থেকেই নির্দিষ্ট কাজে দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে। এই দুই প্রত্যাশার মাঝখানে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন দিশাহীন। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশিরভাগই প্রধান কাজ হচ্ছে সার্টিফিকেট ব্যবসা। এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেখানে ন্যূনতম পাঠদান ছাড়াই সার্টিফিকেট বিক্রি করা হয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে অচল হয়ে পড়েন। এভাবেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এক অতল অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে।
শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি : শিক্ষার এই বেহাল দশার প্রধান কারণ হলো, শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি। যখন যেদল ক্ষমতায় আসে, তখন তারা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্যের আলোকে কারিকুলাম পরিবর্তন করে। তাদের পছন্দের লোকদের শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলে রাখার জন্য ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলেছে সব সময়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা পথ হারিয়েছে। এই অবস্থার উত্তরণ না হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন অসম্ভব। শিক্ষার মান উন্নয়নে তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য। শিক্ষাকে দলীয় রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজাতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেই শিক্ষানীতি, কারিকুলাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। শিক্ষার্থীদের গিনিপিগ বানিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।