মূল্যস্ফীতি কমানোর পরিকল্পনা বাজেটে নেই

আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ১২:১৫ এএম

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব। সম্পৃক্ত ছিলেন বাংলাদেশের সংবিধান, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট প্রণয়নের কাজে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সপ্তম গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রথম উপাচার্য। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সদ্য ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘক্ষণ খোলামেলা কথা বললেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান

দেশ রূপান্তর : বর্তমানে দেশে মার্কিন ডলারের সংকট চলছে। আপনার কি মনে হয়, খোলাবাজারে ডলার ছেড়ে দিলে এই সংকটের মুখোমুখি হতে হতো না?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : না, আমার তা মনে হয় না। খোলাবাজারে ডলার ছেড়ে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। আমি তা মনে করি না। আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম, ম্যানেজ থ্রোটটা আরও ভালোভাবে করার জন্য। মাল্টিপল এক্সচেঞ্জ রেট পৃথিবীর কোথাও এখন নেই। এটা হওয়া মানেই, মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভ করার একটা সুযোগ করে দেওয়া। এরপর বলা যায়, ১০-১২ বছর ধরে টাকাটাকে অতি মূল্যায়িত করে, ভালো করিনি। যেখানে ১০ বছরে ভারত প্রায় ৭৫ শতাংশ অবমূল্যায়িত করে তাদের মুদ্রা, সেখানে আমরা ১০ বছরে করি মাত্র ২৭ ভাগ। এতে টাকাটা অবমূল্যায়িত হওয়ার ফলে রপ্তানির প্রতিযোগিতা যেমন হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি।

দেশ রূপান্তর : না হওয়ার কারণ কী?

 ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এর কারণ হলো, টাকা অতি মূল্যায়নের ফলে ৮৬ টাকার ডলার ১০৬ টাকায় চলে যায়। ফলে হঠাৎ করে বেশি হয়ে যায় অ্যাডজাস্টমেন্টটা। এরপর যদি রপ্তানি ডলারের একদাম হয়, রেমিট্যান্সের ভিন্ন দাম হয় এবং আমদানির ক্ষেত্রে আরেক দাম হয় তখন ব্যবসায়ী মহল এর সুবিধা নেয়। মনে রাখতে হবে, আমদানির ক্ষেত্রে কিন্তু ডলারের দাম কম ছিল। তখন ব্যবসায়ী মহল এর সুবিধা নিয়েছিল। এটা কি সরকার ভুল করে করেছে, নাকি ব্যবসায়ী মহল সরকারকে ম্যানিপুলেট করেছে সেটা আমার পক্ষে বলা মুশকিল। তবে কাজটা ভালো হয়নি। তারপরও অন্যান্য দেশের তুলনায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিনিময় হার নিরাপদ স্থানে রয়েছে।

আজ থেকে ২৫ বছর আগে শ্রীলঙ্কা তাদের বৈদেশিক মুদ্রাকে বাজারভিত্তিক করেছিল। তখন সবাই বাহবা দিয়েছিল। তারা অনেক ঋণ নিয়েছে, বিভিন্ন দেশ থেকে। এমন সব বড় বড় প্রকল্প করেছে, যেখান থেকে কোনো আয়-রোজগার নেই। তাতে ঋণের কিস্তি আটকে গেছে। আমাদের কিন্তু তা নয়। এর জন্য সরকারপ্রধান অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। এটা অনেক বড় ধরনের কৃতিত্ব। তিনি মেগা প্রকল্প হাতে নিলেও এমনভাবে নেননি, যেগুলো শুধুই দায়। যতগুলো হয়েছে, হচ্ছে সবকিছু থেকেই কিন্তু আয় হচ্ছে। তবে ডেথ সার্ভিস রেশিও যদি ২০% এর বেশি হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু বিপদ।

দেশ রূপান্তর : ‘ডেথ সার্ভিস রেশিও’ টার্মটা ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এটা হচ্ছে বিদেশি ঋণের জন্য প্রতি বছর যে সুদ বৈদেশিক মুদ্রায় দিতে হয় এবং মূল ঋণের যে অংশটা পরিশোধ করতে হবে সেটা রপ্তানি আয়ের যে অনুপাত, সেটা ২০ হলেই বিপদ। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত রেশিও ১০-এর বেশি হয়নি। এখন এটা পাঁচের চেয়েও কম আছে। বেশ নিরাপদ। কিন্তু কিছু মেগা প্রকল্পের আয় শুরু না হলে, দায় বেড়ে যাবে। তখন সমস্যা হবে। আমাদের পরামর্শ হচ্ছে যাদের কাছ থেকে আমরা ঋণ নিয়েছি, সেটা পুনঃতফসিল করা। এটা হলে আর কোনো চিন্তা নেই।

দেশ রূপান্তর : দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতিও হয়েছে, ডলারের দামও বেড়েছে। দুই কূলই গেল। তাই কি?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : না না। বিষয়টা এত সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। ব্যাপারটা এত সহজ নয়। মূল্যস্ফীতি অনেক কারণে হয়েছে। একটি হচ্ছে, টাকার দাম কম থাকলে, সুদের হার যদি কম হয়,  তখন মানুষ বেশি বেশি ধার করবে। একইসঙ্গে মানুষের আয়-ব্যয়ের মধ্যে কোনো ভারসাম্য আনা যাচ্ছে না। একদিকে জিনিসের দাম বাড়ছে, আরেকদিকে মানুষের আয় সেই পরিমাণে বাড়ছে না। ফলে ঋণ করতে হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, সুদের হার বাড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অজ্ঞাত কারণে, নয়-ছয় রেখে দেওয়া হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে না। এটা কিন্তু মূল্যস্ফীতির বড় একটা কারণ। এরপর বলা যায় হ্যাঁ, সারা পৃথিবীতেই মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। আমাদের অনেক পণ্য আমদানি করতে হয়। সেই প্রভাব পড়বে না! ফলে মূল্যস্ফীতির অঙ্কটা কিন্তু জটিল। চট করে কোনো কিছু বলা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের স্বার্থটা বড় করে দেখা হয়েছে। তাদের অনেকে তো ব্যাংকেরও মালিক।

দেশ রূপান্তর : তাহলে এই দায়টা মূলত কোন পক্ষের?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : সবকিছু বাদ দিলে, দায় তো কিছুটা সরকারের পলিসির। আবার অনেক কৃতিত্বও আছে। 

দেশ রূপান্তর : বিভিন্ন দেশে যে পণ্যের দাম কমছে, আমাদের দেশে সেই পণ্যের মূল্য বাড়ছে। এর কারণ কী?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : পুরোটাই মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে হচ্ছে। এছাড়া মার্কেট পলিসিতেও কিছু দুর্বলতা আছে। বাজার মনিটরিংয়ে সমস্যা রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আপনি কি বলতে চাইছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে সরকারের পলিসিতে কোনো ভুল নেই? পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট!

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : বাজার ব্যবস্থাপনা আরও কড়াকড়ি করলে, ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে এটা হতো না। বাড়ত বটে, তবে এত বাড়ত না। সব দেশেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আমাদের দেশে বেশি বেড়েছে। আমাদের তদারকি কম, বাজার মনিটরিং আরও ভালো হলে এটা হতো না। একটা কথা মনে রাখতে হবে আমাদের অর্থনীতি কিন্তু অত্যন্ত শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে যাই বলুক, সহজেই দুর্বল করা সম্ভব না।

দেশ রূপান্তর : এর মানে, আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট মজবুত?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : কোনো সন্দেহ নেই। আমরা কিন্তু ভারতের মাথাপিছু আয়কেও ছাড়িয়ে গেছি। মনে রাখতে হবে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেক সূক্ষ্মভাবে করা হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : আমরা একটু এবারের বাজেট প্রসঙ্গে আসি। আপনার কি মনে হয়, উত্থাপিত বাজেট জনবান্ধব?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : বাজেটে কি বলা হয়েছে, এটি গণবান্ধব? হা হা হা। তবে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে কিন্তু এই বাজেট দেশের জন্য মঙ্গলজনক। বাজেট থেকে যে উপকারটা আসবে, সেটা বেশি আসা উচিত গরিব মানুষের জন্য। এটা এককথায় কিন্তু বলা কঠিন। তবে সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টা বেড়েছে। এতে অবহেলিত মানুষ উপকৃত হবে। এটা অনেক ভালো হয়েছে। তবে বৈষম্য, দারিদ্র্য দূর করা বা কর্মসংস্থানের বিষয়ে বাজেটে বিস্তারিত উল্লেখ পাইনি। মূল্যস্ফীতি কমানোর তেমন পরিকল্পনাও নেই। এছাড়া বাজেট ঘাটতি শতকরা ৫.২ ভাগ। এর সিংহভাগ আসবে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যত বেশি ঋণ করবে, তত বেশি মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো টাকা নেই। সেখান থেকে ঋণ নিতে হলে, টাকা ছাপাতে হবে। টাকা ছাপালেই মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে। অথবা ঋণটা আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে। সেখান থেকে সরকার ঋণ নিলে ব্যক্তি খাতের ঋণে টান পড়বে। এর ফলে আবার বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।

দেশ রূপান্তর : এই মুহূর্তে অর্থনীতির বড় কোনো সংকট আছে?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : একটা হচ্ছে রাজস্ব জিডিপি। যেভাবেই হোক, রাজস্ব বাড়াতে হবে।

দেশ রূপান্তর : কীভাবে?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : রাজস্ব বাড়ানোর সহজ কিছু পথ আছে। সরকার কেন তা করছে না, তা জানি না। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকার অনেকগুলো ট্রাইব্যুনাল করেছে। সেই ট্রাইব্যুনালকে আরও ক্ষমতা দিতে হবে। এনবিআরকে চাপ দিতে হবে। করজাল এবং মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে শক্ত হাতে। করের হার না বাড়িয়ে, করের বিস্তারটাকে আরও বাড়ানো দরকার।

দেশ রূপান্তর : একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট যখন বিদেশ যান, তখন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ছিলেন। সেই সময়ের কথা পরিষ্কার মনে আছে?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এটা তো ভোলা যাবে না। আমরা ৩ জন বঙ্গবন্ধুকে তখন ছেড়ে যাচ্ছিলাম। কর্নেল জামিল যাবেন, ডিজিএফআইয়ের প্রধান হয়ে। আর মনোয়ারুল ইসলাম ছিলেন, যুগ্ম সচিব। বঙ্গবন্ধুর সমস্ত কেনাকাটার দায়িত্বে ছিলেন। আমরা আমেরিকার বোস্টনে যাব, পিএইচডি করতে। ১৪ আগস্ট রাতে, গণভবন থেকে বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরে যাবেন। দেখলেন- একটা কালো গাড়ি তার জন্য প্রস্তুত। অথচ গাড়ি ছিল ৩টা। মন খারাপ করে বললেন ফরাস, আজ ওরা কালো গাড়িটা দিল? এমনিতেই মনটা খারাপ। অনেক ধরনের খবর পাচ্ছি। অনেক উপদেশও পাচ্ছি। এসব বলতে বলতে তিনি গাড়িতে উঠলেন। তখন সেখানে রাষ্ট্রপতির ২জন সচিব অজানা কারণে অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও তাদের থাকার কথা ছিল। 

দেশ রূপান্তর : ২ জনের নাম বলা যাবে?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : একজন এম. এ রহিম, আরেকজন এম. এ সাত্তার। দুজনই এখন প্রয়াত। পরে শুনেছি, সেইসময় তারা নাকি বিদেশি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে মিটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতির দেওয়া বিদায় অনুষ্ঠানে কেন তারা অনুপস্থিত থাকলেন এটা নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল। তারা কিন্তু এখনো বিতর্কিত। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর, এই ড. সাত্তারই শে^তপত্র কমিটির প্রধান হিসেবে, ৩২ নম্বরে অনুসন্ধান চালালেন। তিনি সেখানে ৪৪ হাজার টাকা আর ছোট্ট একটা শেখ কামালের বিয়ের মুকুট পেয়েছিলেন। তাতে কী হলো? একজন রাষ্ট্রপতির বাড়িতে এসব থাকতেই পারে। কিছুই পায়নি এই কারণে, দেশ-বিদেশের যত উপঢৌকন তিনি পেয়েছিলেন, সব আমার হাত দিয়েই তোশাখানায় চলে যেত। ঐ রকম সৎ, স্বচ্ছ, দেশপ্রেমিক মানুষ আজ পর্যন্ত আমি দেখিনি।

দেশ রূপান্তর : সবশেষে কোনো কথা আছে?

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন : এই দেশের মানুষ, দেশকে ভীষণ ভালোবাসে। তারা ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত