প্রযুক্তি আর আধুনিকতায় প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা শৈশব থেকেই ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে দ্রুতই নিজেদের পরিপক্ব করে গড়ে তুলছে। এই পরিপক্বতা সবসময় শুভ ফল বয়ে আনে না। আর সে কারণেই বিশ্বজুড়ে এখন একটি ভয়ংকর সমস্যা হয়ে ধরা দিয়েছে কিশোর অপরাধ বা কিশোর গ্যাং কালচার। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের মতো একটি সামাজিক ব্যাধি ভয়ংকরভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পত্রপত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই কিশোর অপরাধীদের নানা ধরনের কর্মকান্ড প্রকাশিত হচ্ছে।
কিছুদিন আগে নেত্রকোনার বারহাট্টায় স্কুলছাত্রী মুক্তি রানী বর্মণকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মুক্তি রানীকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করত কাওসার। প্রেমে সাড়া না দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয় কাওসার। সেই ক্ষিপ্ততার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে দা দিয়ে কুপিয়ে মুক্তি রানীকে গুরুতর জখম করে কাওসার। এমন নৃশংসতা আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়। প্রেমের ডাকে সাড়া না দিলে এক সময় অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হতো। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সেটি বন্ধ হলেও আমাদের তৃপ্তির ঢেকুর তোলার সুযোগ নেই। অ্যাসিড নিক্ষেপের পরিবর্তে এখন সরাসরি হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা আমাদের আতঙ্কিত করে তুলছে।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত এমন অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকৃত শিক্ষার অভাব থেকে শুরু করে পারিবারিক শিক্ষা ও বন্ধন কমে যাওয়া, সুস্থ বিনোদনের অভাব, আকাশ সংস্কৃতির কুপ্রভাব, নৈতিক স্খলন, নেশা জাতীয় উপকরণের সহজলভ্যতাসহ নানা বিষয় এসব কোমলমতিকে ঠেলে দিচ্ছে বিপথে। এ ছাড়া বর্তমান সমাজে পাঠাগার, বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রম হ্রাস বিষয়টিকে করেছে ত্বরান্বিত।
নৈতিক অবক্ষয় রোধে একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন। কিশোর অপরাধ প্রতিরোধের উত্তম স্থান হলো পরিবার। কারণ পরিবারই হলো একটি শিশুর বেড়ে ওঠার প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান। পরিবার সন্তানদের ব্যবহার ও আচরণ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
সক্রেটিসের ভাষায়, ‘শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ’। প্লেটোর মতে, ‘শিক্ষা হলো ব্যক্তিগত এবং সামাজিক ন্যায়বিচার উভয়ই অর্জনের উপায়’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘তাকেই বলি শিক্ষা, যা কেবল তথ্য পরিবেশন করে না, যা বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’ আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জনকেই শিক্ষা বলে অবিহিত করেছেন দার্শনিক কান্ট। নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিতে পারবারিক বন্ধনের পাশাপাশি সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বাড়াতে হবে। শিশুর বিবেককে শানিত করতে হলে, উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠন করতে হলে, শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন এবং আত্মিক উন্নয়ন প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের নীতিবান, আদর্শবান, সৎ ও মহানুভব হিসেবে তৈরি করতে হলে নৈতিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। নৈতিক উৎকর্ষ সাধনে, উত্তম চরিত্র গঠনে নৈতিক শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ গুণাবলিকে ধারণ করার মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
লেখক : কথাশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক
