মানবজীবনে মোটাদাগে, তিনটি চরিত্রে নারীকে দেখা যায়। কন্যা-জায়া-জননী। ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। কিন্তু আর্থিক সচ্ছলতা না থাকলে, সংসারে শান্তি আসে না। সুখ তো দূরের কথা। সেখানে জননী, জায়া বা কন্যা প্রত্যেকেই সেই আর্থিক টানাটানিতে বিভিন্ন স্তরে প্রভাবিত হন। এই সমস্যাটি তখনই চরম আকার ধারণ করে, যখন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকেন একজন পুরুষ। তখন তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, রুচি এবং চাওয়ার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হন নারী। একজন নারী যখন সংসারের জালে আটকে যান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন রমণী। এরপর কন্যা। এই কন্যাই আবার সময়ের পালাবদলে রমণী এবং মায়ের চরিত্র ধারণ করছেন। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে, তার চারপাশ ঘিরে থাকেন একজন পুরুষ। আবার সবাইকে একটি বৃত্তে আটকে রাখে সংসার। এটিই চিরাচরিত মানবজীবনের চক্রাকার। যার শুরু ‘সংসার’ ধারণাটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও সুশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বহু সুযোগ-সুবিধা থেকে প্রায়ই তারা বঞ্চিত। নারীরা সন্তান ধারণ করেন, জন্ম দেন, প্রতিপালন করেন এবং সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করেন। কিন্তু কখনো নিজের কাজের জন্য যথোপযুক্ত মজুরি ও স্বীকৃতি পান না। চাকরির ক্ষেত্রেও তথৈবচ। গ্রামীণ পর্যায়ে ৮৪% এবং শহরে ৫৯% নারী অবৈতনিক গৃহপরিচারিকা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশে নারীরা পুরুষের তুলনায় সপ্তাহে গড়ে ২১ ঘণ্টা বেশি সময় কাজ করেন। যদিও ঘর-গৃহস্থালির কাজে যুক্ত নারীশ্রমকে অর্থনৈতিক মানদন্ডে কর্মকান্ড হিসেবে ধরা হয়েছে, কিন্তু এর অর্থমূল্য জাতীয় আয় গণনায় হিসাব করা হয় না।
সাংবিধানিকভাবে নারী ও পুরুষ উভয়েরই সমানাধিকার স্বীকৃত থাকলেও, পারিবারিক ও কিছু ধর্মীয় আইন নারীর সার্বভৌম সত্তা ও অধিকার খর্ব করে রেখেছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন সারা বিশে^ই প্রশংসিত হচ্ছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীরাই নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পুরুষ সেখানে কাজ করছেন সহযোগী শক্তি হিসেবে। একক হিসাবে, একটি সংসারে সচ্ছলতার ছাপ পড়ছে, মূলত নারীর কর্মকৌশলেই। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার প্রকাশিত সংবাদ আরও জানাচ্ছে সরকারের জরিপই বলছে, নারীপ্রধান পরিবারে পুরুষপ্রধান পরিবারের চেয়ে দারিদ্র্য অনেক কম। অর্থাৎ দারিদ্র্য ঠেকানোর দিক থেকে এগিয়ে আছেন নারীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে উচ্চ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে রয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার। উচ্চ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে থাকা নারীপ্রধান পরিবারগুলোতে দারিদ্র্যের হার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, অথচ পুরুষপ্রধান পরিবারে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ নারীর নেতৃত্বে থাকা পরিবারের দারিদ্র্যের হার পুরুষের নেতৃত্বে থাকা পরিবারের তুলনায় অনেক কম। নারীপ্রধান পরিবারের নারীরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে থাকেন। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তাদের পরিবার চালানো, ছোট ব্যবসায় নিয়োজিত হওয়া এ ধরনের অনেক কাজে তারা নিয়োজিত হন। অর্থের ব্যবস্থাপনায় নারীরা খুব ভালো করেন। বিভিন্ন গবেষণায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে। কোনো পরিবারে নারীর হাতে যদি অর্থ থাকে, তিনি সেটিকে ব্যবসায় দিয়ে আরেকটু অর্থ বাড়িয়ে পরিবারের সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করেন। নারীদের ক্ষেত্রে সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও অর্থের ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বেশি। ফলে সংসার পায় সচ্ছলতার ছোঁয়া।
আমাদের মতো সমাজে নারীরা পরিবারের প্রধান হবেন, বিষয়টি এখনো সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয়। তবু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা পার হয়ে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন নারী। তাদের কর্মগুণে সংসার সচ্ছলতায় উথলে উঠুক- এই আমাদের সতত প্রার্থনা।
