জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন, পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি, জ্বালানিনীতি, গভীর সমুদ্রে পাইপলাইনে গ্যাস খালাস, ভারতের সঙ্গে পাইপলাইন স্থাপন, গ্যাস অনুসন্ধান, সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : কিছুদিন আগে লোডশেডিং শুরু হলো। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও লোডশেডিং হচ্ছে বলে খবর পাই। এ পরিস্থিতিতে শিগগিরই যাবে, নাকি আরও বেশ কিছুকাল থাকবে মনে করেন?
ড. ম. তামিম : বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ জ্বালানি স্বল্পতা আছে, গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। কাজেই পুরোপুরি লোডশেডিং মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
দেশ রূপান্তর : কয়েকদিন আগে লোডশেডিংয়ের যে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছিল, সেটা কি ফেরত আসতে পারে?
ড. ম. তামিম : এটা আসলে প্রেডিক্ট করা মুশকিল। এটা নির্ভর করে সরকারের জ্বালানি আমদানির ওপরে। সরকার যদি সঠিকভাবে কয়লা আমদানি করতে পারে, তেল-গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে পারে তাহলে পরিস্থিতি হয়তো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে না।
দেশ রূপান্তর : তেল, গ্যাস, কয়লা সব মিলিয়ে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা তো আমদানিনির্ভর। এটা কি একটা বিপদ ডেকে আনার হুমকি তৈরি করে না?
ড. ম. তামিম : এ ক্ষেত্রে হুমকি নির্ভর করে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরে। আমাদের অর্থনীতি যদি ভালো করে তাহলে এটা কোনো হুমকি না। কারণ তখন আমরা কিনে আনতে পারব।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু করোনার সময় এবং বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ক্ষেত্রে যা দেখলাম, অর্থ থাকলেও তো অনেক সময় জ্বালানি আমদানি কঠিন হয়ে পড়ছে।
ড. ম. তামিম : এটা তো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। এ ঘটনাগুলোকে তো আর স্বাভাবিক বলতে পারব না আমরা। এ ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সবাই স্ট্রাগল করে। নানাভাবে স্ট্রাগল করে। এটা দিয়ে নরমালি যে প্ল্যানিং সেটা করা হয় না। যুদ্ধের জন্য তো কোনো প্ল্যান থাকে না। মানে একটা যুদ্ধ হবে, সেজন্য আমি প্ল্যানিং করে রাখলাম, এটা তো এমন না। আমরা প্ল্যানিং করি সবকিছু স্বাভাবিক ও ঠিকঠাক থাকবে, সেখানে শুধু চাহিদা আর সরবরাহ এবং মার্কেট যাচাই করে আমরা সেটা করি।
দেশ রূপান্তর : আপনার মতে তাহলে অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকলে আমদানি নির্ভর জ্বালানিনীতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো সমস্যা তৈরি করবে না?
ড. ম. তামিম : কারণ, আমাদের তো বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। সুতরাং বিদ্যুৎ সরবরাহ করাটা আমাদের জন্য তেমন কঠিন কিছু না। কিন্তু আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সরবরাহটা আগে দেশের গ্যাসের ওপর অনেক নির্ভরশীল ছিল, সেটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সেটা এখন আমরা আমদানির মাধ্যমে করছি।
দেশ রূপান্তর : ফুলবাড়ীর কয়লা তোলার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা কি ঠিক হয়েছে মনে করেন?
ড. ম. তামিম : কয়লা উত্তোলন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত তো অনেক আগের। সেটা ২০০৫/৬ এর দিকে যখন ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনবিরোধী আন্দোলন হয়, সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তখন বিরোধী দলের নেত্রী ছিলেন। তখন তিনি সেই আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। উনি তখন বলেছিলেন যে আমরা ক্ষমতায় গেলে কয়লা উত্তোলনে যাব না। তো উনি সেটা রক্ষা করেছেন। এছাড়া পরিবেশগত অনেক কথাও বলা হচ্ছে, কৃষিজমির ক্ষতির প্রসঙ্গও বলছেন অনেকে। ফলে এসব কারণ দেখিয়ে বলা হচ্ছে যে আমরা এখন কয়লা উৎপাদন করব না। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে কয়লা উত্তোলনের ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
দেশ রূপান্তর : উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে তো আন্দোলন হয়েছিল। এখন কয়লা উত্তোলনের আর চ্যালেঞ্জটা কী?
ড. ম. তামিম : আমাদের দেশে কয়লা উত্তোলনের বড় চ্যালেঞ্জটা হলো কয়লার স্তরের ওপরে একটা পানির স্তর আছে। তো ওই পানিটা কীভাবে ম্যানেজ করব আমরা? একটা হচ্ছে ওপেন কাটিং বা উন্মুক্ত পদ্ধতি আরেকটা হচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিং। আমরা দেখেছি যে আন্ডারগ্রাউন্ড মাইনিংয়ে পাঁচ পারসেন্ট কয়লাও উত্তোলন করা যায় না। যেটা বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির ক্ষেত্রে দেখা গেছে। সেখান থেকে আমরা ১২ বছরে মাত্র ১৩ মিলিয়ন ইজ নাথিং, সেখানকার মজুদের সঙ্গে তুলনা করলে। সেখানে হাফ এ বিলিয়ন টনের মতো কয়লা আছে। ডিপ মাইনিংয়ে আসলে আমরা বেশি কয়লা উত্তোলন করতে পারি না। সেক্ষেত্রে সারফেস মাইনিংয়ে কয়লা উত্তোলনই আমাদের জন্য বেশি কার্যকর। এখন সারফেস বা ওপেন কাটিং করা যাবে কি না সেটা নির্ভর করবে কারিগরি বিষয়বস্তুর ওপর। এবং সেটাতে কিছু ঝুঁকি থাকেই। একেবারে ঝুঁকিবিহীনভাবে কোনো কাজ করতে পারব না।
দেশ রূপান্তর : তাহলে কয়লা উত্তোলন করা না করার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটা কি রাজনৈতিক নাকি টেকনিক্যাল হওয়া উচিত?
ড. ম. তামিম : কয়লা উত্তোলনের সুবিধা-অসুবিধার টেকনিক্যাল যাচাই-বাছাই করা হয়নি। রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়েছে। মানে এক্ষেত্রে কতটুকু রিস্ক আছে বা নেই সেটা জানার জন্য আমরা নিজস্বভাবে টেকনিক্যালি কিছুই করিনি। আবার কোনো তৃতীয় পক্ষকেও এনগেইজ করিনি। অর্থাৎ কোনো কনসালটেন্টকে স্বার্থহীনভাবে যাচাই করতে বলিনি যে ওকে কয়লা ওঠালে আমাদের দেশের জন্য কতটা লাভ হবে তা বের করতে বা কয়লা তুলতে পরিবেশগত কতটা রিস্ক আছে। হয়তো অরিজিনাল যে পরিকল্পনা ছিল তার জন্য সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল, কিন্তু বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হবেই এটা ধরে যে আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেটা কাজ করছে না। এখন আমরা দুটো কাজ করতে পারি এভাবে স্ট্রাগল করে ওয়েট করতে পারি যে সামনে অর্থনীতিটা ভালো হবে এবং পরবর্তী সময়ে জ¦ালানি আমদানিতে আর ঝামেলা হবে না। অথবা আমরা ভাবতে পারি যে- ফের আমরা কয়লা উত্তোলন করতে পারি কি না।
দেশ রূপান্তর : সরকারের এলএনজির মতো জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির চেয়ে স্পট মার্কেট থেকে কেনার আগ্রহ বেশি। স্পট মার্কেট তো সব সময়ই অনিশ্চিত। সরকারের কি এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত?
ড. ম. তামিম : হ্যাঁ। সরকার ইতিমধ্যে ওমানের সঙ্গে একটা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে। ডেফিনিটলি আমাদের স্পট মার্কেটিং থেকে বের হয়ে আসা উচিত। যেহেতু আমাদের যে ক্যাপাসিটি সেটা বেসিক চাহিদা থেকে কম। ধরেন এলএনজিসহ যদি ডেফিসিট ধরি তাহলে আমাদের প্রায় দুই বিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে আমাদের ক্ষমতা হচ্ছে ৯০০ মিলিয়ন সর্বোচ্চ, এক বিলিয়নের কাছাকাছি। তো যেখানে আমাদের ডেফিসিট আছে সেখানে তো স্পট মার্কেটিংয়ের কোনো মানে হয় না। কারণ আমরা যাই-ই আমদানি করব সেটাই ব্যবহৃত হবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভয়টা হচ্ছে আমদানি করলাম কিন্তু ব্যবহার করতে পারলাম না। আমাদের তো সেই অবস্থা না। যাই-ই আমদানি করি না কেন, সেটা আমরা ব্যবহার করতে পারব। মার্কেট আছে, লোকাল ইউজেস আছে। আমি মনে করি আমাদের জ্বালানি আমদানির বেশিরভাগ প্রায় পুরোটাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে করা উচিত। অল্প কিছু স্পট মার্কেট থেকে হতে পারে।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি ভারত থেকে ডিজেল আনতে ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন চালু হয়েছে। অন্যদিকে, গভীর সমুদ্র থেকে লাইটার জাহাজের বদলে পাইপলাইনে তেল খালাসের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এ দুটি ঘটনাকে কীভাবে দেখছেন?
ড. ম. তামিম : এ দুটোই খুব ভালো উদ্যোগ। ভারতের সঙ্গে এটা হওয়াতে জ্বালানি আমদানির একটা অল্টারনেটিভ রুট খুলেছে। আমাদের আমদানির সবকিছু কিন্তু হয় সমুদ্র দিয়ে। কোনো কারণে যদি আজ মায়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ লাগে বা কারও সঙ্গে কোনো প্রবলেম হয় তাহলে তো এই রুটে মানে সমুদ্রপথে জ¦ালানি আসবে না। তো এসব চিন্তা যদি করি, সিকিউরিটির চিন্তা যদি করি, তাহলে ডেফিনিটলি ভারত থেকে যে পাইপলাইনটা আসছে এটা আমাদের একটা রুট খুলে দিয়েছে। আমাদের জন্য ভালো হয়েছে। প্লাস এটার পরিবহন ব্যয় কম হবে। প্রাইসিংও কিছুটা কম হবে। পাইপলাইনে যেহেতু আসবে লসেসও কম হবে। আর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দিয়ে, মানে গভীর সমুদ্র থেকে যে পাইপলাইনে তেল খালাস হবে এতেও আমাদের অনেক সাশ্রয় হবে। লাইটার জাহাজে করে বড় জাহাজ থেকে বারবার তেল খালাসে আমাদের লস আছে, কস্টিং আছে, সময়ের ব্যাপার আছে। এখন সরাসরি গভীর সমুদ্রের বড় জাহাজ থেকে পাইপলাইনে তেল খালাস করে নিয়ে আসাতে এসব লস ও প্রতিবন্ধকতা দূর হবে। ডেফিনিটলি এটা ভালো হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টা তো আগায়নি। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কীরকম?
ড. ম. তামিম : উদ্যোগ খুবই অপ্রতুল ছিল, একদম ছিলই না বলা চলে। আমরা গভীর সমুদ্রে সার্ভে করতে চেয়েছি কিন্তু সেখানে দেখা গেছে যে আমরা দুইবার একই কোম্পানিকে সিলেক্ট করেছি কিন্তু দুইবারই তাদের কাজ করতে দেওয়া হয়নি। একবার পুরো টেন্ডারকে ক্যান্সেল করে দেওয়া হয়েছে, আরেকবার মন্ত্রণালয় থেকে একটা অবজেকশন লেটার দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো কাজই হয়নি। আমি মনে করি পেট্রোবাংলা বা মন্ত্রণালয় যারাই দায়িত্বে ছিল, তাদের নেতৃত্বেও সিদ্ধান্তহীনতা বা সিদ্ধান্ত নিলেও তা কার্যকর করতে না পারার জন্য গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো কাজই হয়নি।
দেশ রূপান্তর : তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আমাদের বাইরের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কেমন বা নেই কেন?
ড. ম. তামিম : প্রথমত সমুদ্রে অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সের ক্ষমতা নেই। ফলে সমুদ্রে অনুসন্ধানের জন্য আমাদের বাইরের প্রতিষ্ঠানকে বা থার্ড পার্টিকে ডাকতেই হবে। ধরেন আমরা ১০টা বোয়িং কিনেছি বলে তো এখন বোয়িংয়ের কারখানা খুলতে যাব না। বিশ্বে গভীর সমুদ্রে এ ধরনের অনুসন্ধান করেই ৫/৬টি কোম্পানি। এখন বাপেক্সকে ওই বোয়িং বানানোর কারখানার মতো করে তোলার দরকার কী? এটা অযৌক্তিক। বিশ্বের যে ৫/৬টি কোম্পানি এ কাজ করে তারাই কাজটা করবে। এ ধরনের কাজ হিউজ ইনভেস্টমেন্ট, হিউজ টেকনোলজি, হিউজ নলেজ বেজড। এখন এটা করতে গেলে তো ওই কোম্পানিগুলোকে কম্পিট করার মতো করে করতে হবে। বিলিয়নস অব ডলারস দরকার। ওই ছোট এলাকার জন্য এত ইনভেস্ট আমি কেন করব? এটা তো আমরা রেন্ট করেই করাতে পারি। আর ল্যান্ডের ক্ষেত্রেও যদি আসি এক্ষেত্রে ওসব আন্তর্জাতিক কোম্পানি যেভাবে করে সেই লেভেলে করতে গেলে বাপেক্সকে যে পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল কোনো নীতিনির্ধারকরাই সেটার জন্য কিছু করেনি। আর এখন ইট ইজ টু লেইট। এখন বাপেক্সকে ওই পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে কাজ করাতে গেলে অনেক পিছিয়ে যাব আমরা।
