আরপিও সংশোধনে ইসির ক্ষমতা কমেনি বেড়েছে : সিইসি

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৩, ০২:২৭ এএম

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, ‘ভোট বন্ধে ইসির কোনো ক্ষমতা রহিত হয়নি বরং নির্বাচন কমিশন তার অবস্থান আরও সংহত, দৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য যে সংশোধনগুলো চেয়েছিল সে সংশোধনগুলোতে সরকার সম্মত হয়েছে। এতে আমাদের ক্ষমতা বেড়েছে।’ গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রজ্ঞা অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। সেখান থেকে অনেকে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কেবিনেটে অনুমোদিত হয়। সেখানে সামান্য একটু পরিবর্তন উনারা করেননি, আমাদের মতামত চেয়েছিলেন। সেটা হলো ৯১এ(এ)-তে সামান্য পরিবর্তন ছিল। আমরা বলেছিলাম যেকোনো আসন এলাকায় অনিয়ম হলে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। উনারা বলেছিলেন যে, আমরা শুধু যেখানে যে কেন্দ্রে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। এটা আমাদের কাছে খুবই যৌক্তিক মনে হয়েছে। এটি কিন্তু সম্পূর্ণ একটি নতুন ধারা ছিল। যেটা ৯১-এর এ ধারা সেখানে কিন্তু আমরা পরিবর্তন করিনি এবং সরকার বা সংসদ থেকেও কোনোরকম পরিবর্তন আনা হয়নি। সেদিক থেকে এ আইনটি বিল আকারে পাস হয়েছিল। গতকাল রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর গেজেট হয়েছে।’

সাংবাদিকদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘আপনাদের উদ্দেশে বলার কারণ হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে মন্তব্য এসেছে। এতে করে জনগণ বিভ্রান্ত হতে পারে যে, এতে করে আমরা মনে করি যেসব ব্যাখ্যা এসেছে তা সব সঠিক নয়। যেমন প্রথম যেটা বলা হয়েছিল, কমিশন বুঝে না বুঝে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে এবং কমিশন গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর নির্বাচন বাতিলের ক্ষমতা চেয়েছিল এবং ৯১(এ)-তে সংশোধন এসেছে। আসলে তা হয়নি। সেটা হুবহু আগের মতোই আছে। ৯১এ(এ)-তে নতুন একটি ধারা সংযোজিত হয়েছে। সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য আরপিও সংশোধন করেছে এমন মন্তব্যও এসেছে। কিন্তু সরকার আরপিও সংশোধন করেনি। করেছে, তবে আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী। ৯১(এ)-তে যদি সংশোধন হতো তবে আমাদের ক্ষমতা কিছু হেরফের হতো। যেহেতু ওখানে কিছু করা হয়নি, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারা, যে পোলিং পিরিয়ডে আমরা যে একটি, দুটি বা সব আসনের নির্বাচন আমরা বাতিল করে দিতে পারি। সেটা হুবহু আগের মতোই আছে।’

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ৯১-এ(এ) সংশোধনের ফলে তফসিল ঘোষণার পর ভোটের দিনের আগে নির্বাচন বন্ধ করতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি সিইসি। তিনি বলেন, ‘আমি এ প্রশ্নের উত্তর দেব না। আপনি বুঝে নিজেই উত্তর দেন।’

ইলেকশনের জায়গায় পোলিং শব্দটা আসার প্রসঙ্গ টেনে কাজী হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা যা বোঝেন তা বুঝতে থাকেন। আমরা জানি, আমরা বুঝি। এটা নিয়ে আপনারা যদি চিন্তাভাবনা করেন, চিন্তাভাবনা করতে থাকেন।’

এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পরদিন যদি মনে হয়, ভোটের পরিবেশ নেই, তাহলে কমিশন ভোট বন্ধ করতে পারবে কি না, এ বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘সেটা হাইপোথেটিক্যাল। আমি রিপ্লাই করতে যাব না। ওই ধরনের পরিবেশ হতে দিন, ওইভাবে পরিবেশ হতে দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

ইলেকশন শব্দটির পরিবর্তে পোলিং শব্দটি কেন আনা হলো এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘ইলেকশন শব্দটা হচ্ছে জেনাস। ইলেকশনের আন্ডারে পোলিং। পোলিংয়ের আন্ডারে কখনো ইলেকশন হয় না। তো যেটা হচ্ছে একটা নির্বাচন করে যিনি নির্বাচিত হলেন, উনি পোলড হবেন না, উনি নির্বাচিত হবেন। আর পোলিংটা হবে যেই অংশটাতে ভোটাররা গিয়ে ভোট দেবেন। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াটাকে পোলিং বলা হয়। আমাদের আরপিওতে দেখবেন, ইলেকশন আর পোলিং শব্দটা ডেফিনেশনে আছে। কাজেই এ জিনিসটা বুঝবেন। এটাকে বিশাল করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, যে নির্বাচন কমিশন তার পায়ে কুঠার মেরে ফেলেছে। নির্বাচন কমিশন ভুল করতে পারে কিন্তু কুঠার মারেনি। আমরা বলছি, এটা সুচিন্তিতভাবে এটা কারেকশন করেছি। এখানে আসলে ইলেকশন হবে না, পোলিং হবে।’

আপনারা কি পারবেন ভোট বন্ধ করতে এ প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘সুযোগ নেই কেন। আইনে কোথায় নেই? যদি ওর আগের দিন বিভিন্ন কারণে একটা ইলেকশন...। একটা বেঞ্চমার্ক থাকে যে, এই এই কারণে নির্বাচন বন্ধ করতে পারবেন। এই এই কারণে বন্ধ করতে পারবেন না। যদি এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তখন অসম্ভব পরিস্থিতি কমিশনের কাছে মনে হলে কমিশন কেন পারবে না। এটা নিয়ে গবেষণাটার প্রয়োজন হলো কেন, আমি বুঝতে পারলাম না।’

‘নতুন আইন মনে করেন হয়নি’ উল্লেখ করে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘এখন ভোটের আগে তেমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কমিশন সভা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’

আইন না থাকলে কী করে পারবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘৯১এ-তে কোনো ক্ষমতা রহিত হয়নি, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাচ্ছি।’

আইনের বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আছে জানিয়ে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘সেটি হলে সেটাকে বলা হয় ইনহেরেন্ট পাওয়ার। আইনে কি লেখা নির্বাচনের আগের ভূমিকম্প হয়ে ৫০ লাখ মারা গেলে ভোট বন্ধ করতে হবে। ওই কথা তো লেখা নেই। তারপর কি আমরা নির্বাচন করব। সেই পরিস্থিতিতে কমিশন বসে আইনকানুন দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।’

নির্বাচনের আগে কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কমিশন ভোট বন্ধ করতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘কমিশন পারবে না কেন? অনিয়ম যদি হয়, নির্বাচনের আগে, আমাদের বিধান আছে তদন্ত করতে হবে। তদন্ত করে অনিয়ম যিনি করেছেন তার প্রার্থিতা বাতিল করার সুস্পষ্ট একটা বিধান আছে। আমরা যদি দায় নিরূপণ করতে পারি কে অনিয়ম করেছেন, তাহলে তার প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন চালিয়ে নিতে পারব। আর পোলিং বা ইলেকশন শব্দটির কারণে কোনো হেরফের হবে না। এক্সিস্টিং বিধানের কারণে প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।’

সিইসি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করব যারা বিজ্ঞজন আছেন, আমরা পুরো জাতি প্রত্যাশা করছি একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। নির্বাচন নিয়ে অহেতুক বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করে নির্বাচন কমিশনকে হেয় করা বা খাটো করা যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, যেমন নির্বাচন কমিশনকে তারা যদি গঠনমূলক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন, আমরা উপকৃত হবো। আমরা যেকোনো গঠনমূলক সাজেশন বিবেচনায় নিতে সদা প্রস্তুত।’

শুধুমাত্রা ৯১(এ) নয়, বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাকে সুসংহত করা হয়েছে বলে মনে করেন কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, ‘যেমন ৮৪এ-তে দেখবেন বেশ কিছু কর্মকে আমরা অপরাধের আওতায় এনেছি। যেমন গণমাধ্যমকর্মী তাদের ইক্যুপমেন্টকে যদি কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত করে, পর্যবেক্ষকদের দেহ এবং তাদের কোনো ইক্যুপমেন্ট যদি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান এনেছি।’

তিনি বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বাধা দেওয়ার অভিযোগ আসে। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য আমরা বাধাদানকারীকে শাস্তির আওতায় এনছি। এ ছাড়া মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে কাউকে চাপ প্রয়োগ করলেও সেটা অপরাধ হবে। তবে এগুলো কমে আসবে। কেননা অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের ব্যবস্থা করছি। ইতিমধ্যে কিছু মনোনয়নপত্র অনলাইনে রিসিভ করতে পেরেছি। এতে শোডাউন এবং অর্থব্যয় কমে যাবে। চট্টগ্রাম-১০ ও ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনেরও আমরা অনলাইনে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে পেরেছি। ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দিলে সেটা দণ্ডনীয় অপরাধ হবে, এটাও আরপিওতে একটা ইম্প্র“ভমেন্ট।’

আরেকটি বিষয় কেউ প্রশংসাও করেননি, সমালোচনা বা আলোচনাও করেননি মন্তব্য করে সিইসি বলেন, ‘প্রিসাইডিং কর্মকর্তার ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এতে তিনি যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা না পান তবে ভোট বন্ধ করে সব কাগজপাতি ফেলে বেরিয়ে আসবেন। এটার উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রিসাইডিং কর্মকর্তার দায়িত্ব স্পষ্ট করা। এতে তিনি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করলে সেটা ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘৩১(২)-তে আগে শুধু ছিল থাকবে ব্যালট পেপারে। এখন সেখানে স্বাক্ষরের বিধানও এনেছি। ভোট গণনার সময় ব্যালটে স্বাক্ষর না পেলে সেটা বাতিল করা হবে। আরেকটা বিষয় হলো আবেদনের ভিত্তিতে এজেন্টদের রেজাল্ট দেবেন। কিন্তু এখন বলা হয়েছে আবেদনের ভিত্তিতে নয়, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এমনিতে সেটা দেবেন। কারও প্রার্থিতা আমরা বাতিল করতে পারি। কিন্তু সে আবারও নমিনেশন জমা দিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে আমরা বিধান এনেছি কারও যদি অপকর্মের কারণে প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়, তাহলে সে পরবর্তীকালে নতুন নমিনেশন দাখিল করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে এটা একটা অগ্রগতি।’

কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রচারটা যদি সঠিক হয়, তথ্যটা যদি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে আমাদের জনগণের মধ্যে যে বিভ্রান্তি, সেটা নিরসন হবে। বিভ্রান্তি নিয়ে যদি তারা বসবাস করেন তবে তারা অজ্ঞ থেকে যাবেন। আমরা চাই আমাদের জনগণ নির্বাচন বিষয়ে প্রাজ্ঞ হন, প্রাজ্ঞ হয়ে তাদের মতামত যেন ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্ত করতে পারবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত