দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০ ছাড়াল। গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে ১০ জন মারা গেছে। এ নিয়ে এ বছর মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩০৩ জনে। ফলে মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড ছাড়িয়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ল।
এর আগে দেশে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছিল গত বছর ২৮১ জনের। এবার বছরের প্রথম আট মাসের প্রথম সপ্তাহেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ৩ আগস্ট সর্বোচ্চ ২৮৩ জনের মৃত্যুর রেকর্ড হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০০ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২০০৬ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে ৪৪, ৫৮, ১০, ১৩, ৪ এবং ১১ জন মারা যায় ডেঙ্গুতে। ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর খবর নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে। এরপর ২০১১ সালে ৬, ২০১২ সালে ১, ২০১৩ সালে দুজন মারা যায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। ২০১৪ সাল ছিল মৃত্যুশূন্য। ২০১৫ সালে ৬ জন, ২০১৬ সালে ১৪, ২০১৭ সালে ৮, ২০১৮ সালে ২৬ জন মারা যায় ডেঙ্গুতে।
২০১৯ সালে সারা দেশে রেকর্ড ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের। এরপর ২০২০ সালে ৭ জন, ২০২১ সালে ১০৫ এবং ২০২২ সালে ২৮১ জন মারা যায় ডেঙ্গুতে।
এ বছর ডেঙ্গুতে বেশি মারা গেছে ঢাকায় ২৪১ জন ও ঢাকার বাইরে ৬২ জন। আক্রান্ত অনুপাতে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকায় মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ও ঢাকার বাইরে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
আক্রান্তদের মধ্যে বেশি মারা গেছে নারী, ১৭০ জন, যা মোট মৃত্যুর ৫৬ শতাংশ ও পুরুষের মৃত্যু হার ৪৪ শতাংশ। অথচ নারীদের আক্রান্তের হার পুরুষের তুলনায় কম। নারীরা আক্রান্ত হয়েছে আক্রান্তের ৩৬ শতাংশ ও পুরুষ আক্রান্ত হয়েছে ৬৪ শতাংশ।
এ বছর সবচেয়ে বেশি মারা গেছে ২১-২৫ বছর বয়সী মানুষ, ৩৩ জন, যা মোট মৃত্যুর ১১ শতাংশ। এই বয়সীদের মধ্যে নারী মারা গেছে ২২ জন ও পুরুষ ১১ জন।
এরপর বেশি মারা গেছে ২৬-৩০ বছর বয়সী তরুণরা, ২৭ জন, যা মোট মৃত্যুর ৯ শতাংশ। এখানেও নারী মৃত্যু বেশি ১৪ জন ও পুরুষ ১৩ জন। এরপর ৮ শতাংশ করে মারা গেছে ৩১-৩৫ বছর বয়সী ২৫ জন ও ৩৬-৪০ বছর বয়সী ২৪ জন। এই দুই শ্রেণির মধ্যেও নারী মৃত্যু বেশি।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম মারা গেছে ৭৬-৮০ বছর ও ৮০ ঊর্ধ্ব বয়সী মানুষ ২ শতাংশ করে, মোট ১১ জন। ০-৫ বছর ও ৬-১০ বছর বয়সের শিশু মারা গেছে ২৮ জন, যা মোট মৃত্যুর ১০ শতাংশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৪৯৫ জন। এর আগে গত ৩০ জুলাই এক দিনে ২ হাজার ৭৩১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেটিই এখন পর্যন্ত এ বছরের সর্বোচ্চ।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৯ হাজার ৩৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ৪ হাজার ৬৮০ জন ও ঢাকার বাইরে ৪ হাজার ৬৫৪ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৫৪ হাজার ৩৩১ জন ঢাকায় ২৯ হাজার ৬০২ ও ঢাকার বাইরে ২৪ হাজার ৭২৯ জন।
ডেঙ্গুর ধরন পরীক্ষা ও টিকা তৈরির উদ্যোগ নেবে কমিটি : দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি সামাজিক কমিটি করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক কমিটি’ ডেঙ্গুর ধরন পরীক্ষা করে সেই অনুযায়ী প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেবে। পাশাপাশি এই কমিটি ডেঙ্গুর টিকা তৈরি করবে।
কমিটির ব্যাপারে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সহযোগিতা করলে এই কমিটি ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও গবেষণায় জাতীয় পর্যায়েও কাজ করবে।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুকে প্রধান উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেনকে বিশেষ উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে উপদেষ্টা করে গতকাল শনিবার এই কমিটির ঘোষণা দেয় বিএসএমএমইউ। অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদকে কমিটির চেয়ারম্যান ও বিএসএমএমইউর আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. তৌফিক আহমেদকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিএসএমএমইউর উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে ‘ডেঙ্গুবিরোধী সামাজিক আন্দোলন’।
কমিটি প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘আমরা ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করব। ভবিষ্যতে গবেষণার মাধ্যমে টিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এবার ডেঙ্গুর ধরন বদল হয়েছে। বদলে যাওয়া ধরন অনুযায়ী কীভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা হয়, সেই উদ্যোগ নেব। কীভাবে মশার লার্ভা ধ্বংস করা যায়, মশা ও লার্ভা ধ্বংসে যে ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকারিতা কেমন এগুলো গবেষণা করব।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে এবার ডেঙ্গু-২ ও ডেঙ্গু-৩ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। আবার যাদের দ্বিতীয়বার হয়েছে, তাদের মৃত্যুর হার বেশি। এই মৃত্যুহার ও আক্রান্তের সংখ্যা ভবিষ্যতে কীভাবে কমানো যায়, সেটাও আমরা দেখব।’
উপাচার্য বলেন, ‘ডেঙ্গুর টিকা তৈরিতে বিভিন্ন দেশে তৎপরতা শুরু হয়েছে। আমাদের দেশেও আমরা সেই উদ্যোগ নিতে পারি কি না, সেটাও দেখব।’
জ্বর হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ : এখন জ¦র হলে ঘরে বসে না থেকে দ্রুত এনএসওয়ান টেস্ট করার পরামর্শ দিয়েছেন বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না। প্রচুর তরল খাবার খেতে হবে। শিক্ষার্থীদের ফুল প্যান্ট, ফুল হাতা শার্ট ও জুতা-মোজা পরে বিদ্যালয়ে যেতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ও এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘দেশে সারা বছর ডেঙ্গু নিয়ে কাজ হয় না বলেই আজ এ অবস্থা। এ জন্য মানুষকে সচেতন করতে আমাদের সবাইকে রাস্তায় নামতে হবে। এখন ডেঙ্গুর ধরন পাল্টেছে। আগে দিনে মশা কামড়াত, এখন ২৪ ঘণ্টা কামড়ায়। আগে পরিষ্কার পানিতে মশার লার্ভা পাওয়া যেত, এখন ময়লা পানিতেও পাওয়া যায়।
উপাচার্য বলেন, ‘আজ থেকে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বিটিআই প্রয়োগ করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এটি সিঙ্গাপুরে খুব ভালো কাজ করছে, আশা করছি আমাদের এখানেও কাজ করবে।’
