আশা করা হচ্ছে, আগামী জানুয়ারিতে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের গত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা গেছে, নির্বাচনের এক থেকে দেড় বছর আগে বিভিন্ন দেশের তৎপরতা শুরু হয়। পক্ষে-বিপক্ষের নানান সমীকরণ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাব-নিকাশের আলোকে বিদেশি দূতরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরিবর্তিত বিশ^ব্যবস্থায় এবার বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন শক্তিধর দেশগুলোর অবস্থান বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চলছে নানা কথাবার্তা। ব্যাপক সক্রিয়তা দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া। তবে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত প্রথম দিকে মৌন থাকলেও ক্রমেই সক্রিয় এবং সরব হচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে ভারতীয় গণমাধ্যমও নানামুখী বিশ্লেষণ হাজির করছে।
সোমবার এবং রবিবার ভারতের দুই প্রভাবশালী গণমাধ্যমের পৃথক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থান উঠে এসেছে। প্রথমটি দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া এবং পরেরটি দ্য হিন্দুর ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন দুটির বিশ্লেষণে একদিকে যেমন আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠে এসেছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ ঘিরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন স্বার্থের বিষয়ও প্রকাশ পেয়েছে।
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ায় দেবদীপ পুরোহিতের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশকে ভারতও নির্বাচনী বার্তা দিয়েছে। একে বলা হচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি ভারত ও আমেরিকার যৌথ বার্তা । দুই দেশের এ যৌথ বার্তাই প্রমাণ করছে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ঘিরে নিজেদের নীতি নিয়ে ঐকমত্যে এসেছে দিল্লি ও ওয়াশিংটন। ভারতের নিরাপত্তা বিভাগের এক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য দিয়েছে দ্যটেলিগ্রাফ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা আগামী মাসে জি-২০ সম্মেলনে অংশ নিতে দিল্লি সফরে এলে ভারতের পক্ষ থেকে তাকে দুটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হবে। একটা হলো ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হতে যাওয়া নির্বাচন হতে হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। আরেকটি হলো আওয়ামী লীগ সরকারের সব চীনপন্থি এবং ইসলামপন্থি নেতাদের সরিয়ে অসাম্প্রদায়িক এবং জনপ্রিয় নেতাদের নিয়ে আসতে হবে।
সূত্রের বরাত দিয়ে আরও জানানো হয়, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। এসব বৈঠক ভারত ও অন্য কয়েকটি দেশে অনুষ্ঠিত হয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
অতীতের ধারাবাহিকতা ভুলে (২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বড় ধরনের ভিন্নমত ছিল) বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে দুই দেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ দুই বার্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
যদিও শেখ হাসিনা সবসময়ই বলে এসেছেন তার সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়ে আসছে। তবে ২০১৪ ও ’১৮ সালের নির্বাচনের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত দুই নির্বাচনের বিষয়ে অভিযোগ নিয়ে নয়াদিল্লি কখনই প্রশ্ন তোলেনি। উপরন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকার ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ের পর সবার আগে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। যে নির্বাচনে ৯৬ শতাংশেরও বেসি আসন পেয়ে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। এ কারণে সাধারণভাবে ভাবা হচ্ছিল যে, এবারও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে মাথা ঘামাবে না ভারত, যতক্ষণ তা শেখ হাসিনার পক্ষে যায়। প্রতিবেশীদের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারকেই নিজেদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে করে দিল্লি।
ঢাকার একজন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞকে উদ্ধৃত করে টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কোনোই সন্দেহ নেই যে শেখ হাসিনা এখনো ভারতের প্রিয়পাত্রী থাকবেন। তবে গত কয়েক বছরে আরও কিছু কৌশলগত বিষয় সামনে এসে পড়েছে। যে কারণে নিজেদের উদ্বেগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিলে হাসিনাকে আর তার মতো করে সবকিছু করতে দেবে না ভারত।’
ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান থেকে শুরু অরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ট্রানজিট দেওয়াসহ গত কয়েক বছরে ভারত সরকারের ইচ্ছেমাফিক অনেক কিছুই করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। তবে এই মুহূর্তে ভারত সরকার প্রাধান্য দিচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিকেই। আর এ বিষয়টিই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐকমত্যে নিয়ে এসেছে ভারতকে।
দুপক্ষই বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামো, আওয়ামী লীগ এবং সরকারসহ সব জায়গাতেই, চীনপন্থি এবং ইসলামপন্থি উপাদান নিয়ে চিন্তিত। তারা এ পরিস্থিতির আশু পরিবর্তন চায়। একই সঙ্গে তারা মনে করে, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে বাংলাদেশের নির্বাচন, কমিশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অধীনে হতে হবে।
অন্যদিকে যেহেতু বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোতে সুযোগ নেই, তাই বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর দাবি অনুযায়ী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো প্রশ্নই আসে না। শেখ হাসিনাকে আরও যেসব বার্তা দেওয়ার জন্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে দুর্নীতিও ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে আওয়ামী লীগ সরকারকে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণকে চাপের মুখে ফেলা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভারতের উদ্বেগের কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের যদি সরকার পরিবর্তনের একমুখী এজেন্ডা থাকে, তাহলে তা বিএনপি জামায়াতকে ক্ষমতায় আনবে, যা ভারতের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াবে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দেখে, সেটাও ভারতের দুশ্চিন্তার কারণ। ভারত জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলেই মনে করে। বৈঠকে এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের জানিয়েছে দিল্লি। এ ছাড়া বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তা আগে ভারতকে জানানোর কথাও বলেছে দিল্লি।
অন্যদিকে ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় প্রণয় শর্মার লেখায় বলা হয়েছে, জানুয়ারির নির্বাচনে শেখ হাসিনা হারলে বাংলাদেশ দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হতে পারে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারালে সেটা যে শুধু ভারতের জন্যই চিন্তার বিষয় নয়, বরং এজন্য দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহিংসতাও বাড়তে পারে।
প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাবের দিক দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে নির্ভরশীল ও ঘনিষ্ঠ মিত্র। যদিও ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘বিগ পাওয়ার’ হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাদের এ অবস্থানে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন। আর বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় চীন তাদের অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। দেশটি বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টাকারীদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো উপকৃত হয়েছে। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি অবাধে সরকারবিরোধী সমাবেশ করছে। এ ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীও যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেছে।
ফ্রন্টলাইনে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ‘যদি নির্বাচন সুষ্ঠু হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়ে যাবে’ মন্তব্যের উল্লেখ করে বলা হয়, ভারত মনে করে, জামায়াত ও তাদের সমমনা দলগুলো নিয়ে বিএনপি বাংলাদেশে শাসন পরিচালনা করবে। যা ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি করেছে।
গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি শক্তিশালী, বিশ্বস্ত এবং নির্ভরতার মঙ্গলজনক এক সম্পর্ক তৈরি করেছেন। ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতাদের মুসলিমবিদ্বেষী এবং বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যকে শেখ হাসিনার পাত্তা না দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে দুপক্ষের মধ্যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতা ও সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে একটি সহযোগিতা এবং নিরাপত্তামূলক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। উভয় দেশের সরকারই উন্নতির ক্ষেত্রে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।’
তারপরও ঢাকা ও নয়াদিল্লির শঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র এখন যে অবস্থান নিচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের এ সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে কথা বলে। কিন্তু কোথাও যদি তাদের কৌশলগত সম্পর্ক জড়িত থাকে তাহলে এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে কেন তারা এতটা মাথা ঘামাচ্ছে, সেটির কারণ জানা উচিত।
এ ব্যাপারে ওয়াশিংটনভিত্তিক এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র নৌকায় ঝাঁকুনি দিতে পারছে। বাংলাদেশ মার্কিনিদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে কারণে বাইডেন প্রশাসন নির্বাচন নিয়ে এখন বাংলাদেশকে চাপ দিতে পারছে।
ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবদমান দেশগুলোর পক্ষ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে সাম্প্রতিককালে ভারত ও চীনের ‘লড়াইয়ের ক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের দীর্ঘ বৈরিতার প্রভাবও পড়েছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্কের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে চীন। উদ্ভূত পরিস্থিতি ভারতের জন্য উভয় সংকট। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্কের কারণে তারা শেখ হাসিনার পক্ষে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে লড়বে বলে আশার সঞ্চার হয়েছে। অন্যদিকে চীন এখন ঢাকার পক্ষে থাকায় এটিও পরিষ্কার হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকা সম্পর্কের সুবাদে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারত শেখ হাসিনার সহায়তায় কাজ করছে। কিন্তু এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কনভিন্স করতে না পারলে সেটা ভারতের জন্যই ক্ষতিকর হবে।
যদি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়, তাহলে নয়াদিল্লিকে একটি ভারতবিরোধী শক্তির মোকাবিলা করতে হবে। ভারত এ বিষয়টি নিয়ে ভীত। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বিএনপিরও ভালো সম্পর্ক আছে। ফলে ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে চীনের স্বার্থে খুব বড় কোনো প্রভাব পড়বে না।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাষ্ট্র শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলে গেছে। কারণ তিনি চীনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ সাহাব ইনাম খান বলেন, বর্তমান বিতর্কের মূল কেন্দ্রে আছে চীন। বাংলাদেশে চীনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেড়েই চলছে। শুরুটা হয় ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগ দেওয়ার পর বেইজিংয়ের কাছ থেকে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে। এ ছাড়া চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক বন্ধুও। বর্তমানে সিনো-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ডলার। যেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার আর ভারতের সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মূলে আছে প্রতিরক্ষা খাত। এ সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৮০ সাল থেকে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক প্রয়োজনীয়তার ৭২ শতাংশ মেটায় চীন। বাংলাদেশের সামরিক খাতে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির বিষয়টি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের জন্যই চিন্তার বিষয়। ভারতের অনুরোধে চীনকে শেখ হাসিনা সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করতে দেননি।
গত মার্চে শেখ হাসিনা বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলের কাছে পেকুয়ায় বাংলাদেশের প্রথম সাবমেরিন ঘাঁটি উদ্বোধন করেন। এটি তৈরি করা হয়েছে ১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার খরচ করে। এ ঘাঁটি চীন থেকে আনা দুটি সাবমেরিনের ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ঘাঁটি পরিচালনা ও বাংলাদেশের সেনাদের প্রশিক্ষণ দেবে চীন। ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের অস্ত্র কিনেছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনেছে মাত্র ১২৩ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। তারা বাংলাদেশকে ফ্রিগেট এবং সামরিক পরিবহন বিমান দিয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে দুটি সামরিক চুক্তি করতে চায়। সেগুলো হলোÑ দ্য জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি অ্যাগ্রিমেন্ট এবং অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট। কিন্তু এ চুক্তিগুলো করতে বাংলাদেশের সাড়া তেমন নেই। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এসব চুক্তি সামরিক সম্পর্ক শক্তিশালী করবে এবং সামরিকবিষয়ক বাণিজ্য, তথ্য আদান-প্রদান এবং সেনাদের মধ্যে সহায়তা বৃদ্ধি করবে। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক অভিনাশ পালিওয়াল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশকে চীনের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলবে এবং তাদের বিশ্বাস বিএনপি চীনের প্রভাব বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
সংক্ষেপিত ভাষান্তর সাঈদ জুবেরী
