আমাদের বিকাশ ঠেকায় কে?

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৩, ১১:৩৭ পিএম

ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ে ২৫ বছরের পথচলায় আমি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হই বাংলাদেশের মানুষের থেমে না থাকা, যেকোনো পরিস্থিতি থেকেই ঘুরে দাঁড়ানো আর অদম্য স্পৃহা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেখে। যেমনটা সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে তুলনা করা হয়েছিল তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে সেই বাংলাদেশই এখন বিশ্বের বুকে অর্থনীতির বিস্ময়। হার না মেনে যেকোনোভাবে সফল হওয়ার এই শক্তিতেই তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৪৬০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা মাত্র এক যুগ আগে ২০১১ সালে ছিল ১২৮.৬৪ বিলিয়ন ডলার। তাদের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২৬৮৮ ডলার, যা ২০১১ সালে ছিল ৮৫৬ ডলার।

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই ছোট্ট কিন্তু জনবহুল দেশটির মানুষ ঝড়, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সঙ্গে করে বাঁচে। প্রায়শই তাকে এসব দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হলেও সে প্রতিবারই সাহস নিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ায়। যে এলাকাটি বন্যার পানির নিচে ছিল, সেখানে পানি নেমে যাওয়ার পর গেলে দেখা যাবে মানুষ নিজেদের উদ্যোগে কী অসাধারণভাবে আবার ফিরছে জীবন ও জীবিকার কাছে। নিজের উদ্যোগে প্রতি মুহূর্তে নিজের সমস্যা সমাধান করে এগিয়ে চলে এ দেশের মানুষ। সারা দেশের যে কোনো প্রান্তে গেলেই দেখা মেলে সামান্য পুঁজি নিয়ে, ছোট্ট একটা টুকরিতে করে নিজের আর পরিবারের হাল ধরতে সংগ্রাম করছেন কোনো প্রান্তিক উদ্যোক্তা।

সবমিলিয়ে বাংলাদেশের মানুষের ‘আনস্টপেবল স্পিরিট’ আছে। কোনো বাধাই যা থামাতে পারে না। দেশের মানুষের এই অদম্য শক্তিকে বিকাশের পক্ষ থেকে আমার স্যালুট জানিয়েছি ‘আমাদের বিকাশ ঠেকায় কে’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে।

আমাদের এই ক্যাম্পেইনের প্রোটাগনিস্ট বা প্রধান চরিত্র ছিল পেশাদার বক্সার সুর কৃষ্ণ চাকমা। পাহাড়ে বেড়ে ওঠা সুরের পেশাদার বক্সার হয়ে ওঠার গল্পটা সহজ নয়। ছোটবেলায় বাবাকে হারানোর পর তার বিকেএসপি যাত্রা এবং বক্সিংয়ের মতো ভিন্নধারার খেলায় নিজেকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো কিছুই তৈরি করে রাখা ছিল না। হার না মানার প্রত্যয় আর সফল হওয়ার মন্ত্র নিয়ে সুর দেশের জন্য বয়ে এনেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। সব প্রতিকূলতা পেরিয়েই সুরের এই সফলতা।

নানান ক্ষেত্রে এরকম অসংখ্য সুরের অদম্য শক্তিতে আজ আমরা বিশ্বের বুকে এক অগ্রসরমান জাতি। এগিয়ে যাওয়ার এই পথে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে যুক্ত করা ছিল সময়ের দাবি। সেই প্রেক্ষাপটেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবা দেওয়ার সূচনা ছিল যুগান্তকারী। সে লক্ষ্যেই একযুগ আগে যাত্রা শুরু করে বিকাশ। ক্যাশ টাকায় লেনদেনে অভ্যস্ত মানুষকে মোবাইলের মাধ্যমে ডিজিটাল টাকায় লেনদেন করার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যেই সেবার সঙ্গে আগে কখনো মানুষের পরিচয় হয়নি সেই সেবা সম্পর্কে তাদের জানানো, তাদের কাছে সেবাটি সহজলভ্য করা আর বিশ্বস্ত করে তোলা।

গত ১২বছর ধরে সারা দেশের ৩ লাখ ৩০ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি প্রান্তে বিকাশ সেবা সহজলভ্য করে তোলার এই কঠিন পথ চলতে আমরা থেমে যাইনি। ফলে আজ সাত কোটি গ্রাহকের এক বিশাল পরিবার বিকাশ।

মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনকে সহজ করে তাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়ে তাদের সম্ভাবনার বা এগিয়ে চলার সহযোগী হয়ে উঠেছে বিকাশ। কেবল সেবা আনা নয়, সেই সেবা কীভাবে ব্যবহার করতে হবে সেই ডিজিটাল লিটারেসি তৈরিতেও ভূমিকা রাখতে পেরে বিকাশ আনন্দিত। আজ দেশের অসংখ্য মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাপনে, সংগ্রাম আর সাফল্যে তাদের সঙ্গী থাকতে পারাটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার। সেই অনুপ্রেরণা নিয়ে বিকাশের একযুগ পূর্তিতে আমরা হাজির হয়েছি ‘আমাদের বিকাশকে ঠেকায় কে?’ বার্তা নিয়ে।

১২ বছর ধরে নানান রকম গ্রাহক-কেন্দ্রিক সেবা যুক্ত হয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে বিকাশ। একসময় টাকা পাঠানো, ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট সেবা থাকলেও এখন মোবাইল রিচার্জ করা, যেকোনো ধরনের বিল পরিশোধ করা, পেমেন্ট করা, ব্যাংকের ডিজিটাল ঋণ, ব্যাংকে সেভিংসের মতো অসংখ্য সেবায় বিকাশ এখন প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। সেবাকে ২৪ ঘণ্টা গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর পেছনে অসংখ্য জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হলেও গ্রাহকের কাছে তা পৌঁছানো হচ্ছে সবচেয়ে সহজ করে। এই সব প্রচেষ্টায় সাড়ে তিন কোটি পরিবারে সাত কোটি বিকাশ গ্রাহক অর্থাৎ প্রতিটি পরিবারে কমপক্ষে দুটো বিকাশ ব্যবহার হচ্ছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সব বাংলাদেশির জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে বিকাশ।

দেশের কোটি মানুষের আর্থিক লেনদেনেও এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এমএফএস-এর কল্যাণে এখন মানুষের হাতের মুঠোয় সব ধরনের আর্থিক সেবা। দ্য গ্লোবাল ফিনডেক্স ডাটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে যেকোনো ধরনের ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট সেবা গ্রহণ করতেন প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ। মোবাইল ব্যাংকিং সেবার কল্যাণে ২০২১ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৩ শতাংশে। এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছেন সহজেই।

আগামীর বাংলাদেশ স্মার্ট বাংলাদেশ। ক্যাশলস ইকোসিস্টেম তৈরিতে সব পক্ষের সম্মিলিত এগিয়ে চলার প্রত্যয় আমাদের সফল করে তুলবে। আগামীতে গ্রাহক যেন সব ধরনের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তার জন্য সবচেয়ে ভালো এবং প্রযোজ্য সিদ্ধান্তটা নিতে পারে তেমন করে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছি আমরা। একটা উদাহরণ দিই, একজন খুচরা পণ্য বিক্রেতা, হঠাৎ দেখলেন পণ্য পাচ্ছেন নির্ধারিত মূল্যের কম দামে। তার কাছে হয়তো টাকা নেই। কিন্তু বিকাশ আছে। তিনি বিকাশ থেকে মুহূর্তেই একটা জামানাতবিহীন লোন নিয়ে নিতে পারবেন। তার পণ্য বিক্রি শেষে তা পরিশোধও করে দিতে পারবেন। এই যে মুহূর্তে যা প্রয়োজন ঠিক সেই মুহূর্তে সেই সেবা গ্রাহকের কাছে সহজলভ্য করাই আমাদের লক্ষ্য। যেন গ্রাহক প্রযুক্তিগত এই বিকাশ সেবাকে পাশে নিয়ে দৃপ্ততার সঙ্গে বলে ওঠেন ‘আমাদের বিকাশ ঠেকায় কে?’

লেখক : চিফ মার্কেটিং অফিসার, বিকাশ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত