রাজীব আশরাফকে ভালোবাসি ক্যান!

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:২০ পিএম

তখনও স্বাধীনতা স্তম্ভ হয়নি মোল্লার দোকানই বলতো জায়গাটাকে, ছবির হাট নামটাও এত প্রচলিত হয়নি। এখনকার মতন এত ভিড়ও ছিল না। সঙ্গে কোনও বন্ধু বা বিশ্বস্ত কেউ না থাকলে বেশি ভেতরেও যেতাম না, এতটাই নির্জন। তার ওপর দিনটা ছিল মেঘলা, সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। আমি আর রাজীব আড্ডা দিচ্ছিলাম উদ্যানে, ছবির হাট থেকে একটু ডান পাশে। আমি একটা সাদা শাড়ি পরে ছিলাম, সাদা শাড়িতে কাদা লাগবে বলে ঘাসের ওপর না বসে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলাম আমরা। আমাদের একটু দূর দিয়েই দুই পুলিশ সদস্য খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে আমাদের দেখতে দেখতে চলে গেল। একটু পর নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করে আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকল। রাজীব বলল, ‘তুমি এখানেই দাঁড়াও, আমি দেখে আসি কী বলে!’

আমি দূর থেকে দেখলাম রাজীব প্রথমে খুব ফরমালি কথা বলল, তারপর হাসি-হাসি মুখে কে জানে কী বলল, বিদায়ের সময় দুই পুলিশের সঙ্গে হ্যান্ডশেকও করল। ও ফিরলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী এত কথা বললা তুমি ওদের সাথে?’ ও বলল, ‘প্রথমেই বললাম, আমি রাজীব আশরাফ, এমনভাবে বললাম, যেন আমার নাম হূমায়ূন আহমেদ’— বলে তার সে কি হাসি! কি যে সুন্দর সেই হাসি!

রাজীব সবাইকেই প্রভাবিত করতে পারত। শুধুমাত্র কথা বলেই। হূমায়ূন আহমেদের মতনই কথার কারিগর ছিল সে। গল্প উপন্যাস লেখার ধৈর্য বা ইচ্ছা হয়তো ওর ছিলই না। কিন্তু এমনটা আমার মনে পড়ে না রাজীবের সঙ্গে দেখা হয়েছে আর ও কোনও না কোনও গল্প বলেনি। সবই সিনেমার গল্প, সিনেমার গল্প মানে সিনেমার প্লট আর স্টোরিলাইন। ও যখন গল্প বলত দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভাসত।

তখন আমি কলাভবনে উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজে পড়ি। আমার বিভাগ পাঁচতলায়। পাশেই ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট, সেখানে পড়ত স্বর্ণা আপু। আমি আর স্বর্ণা আপু মাঝে মাঝে একসাথে চারুকলায় যেতাম। রাজীবের সঙ্গে দেখা হয়ে ওর কথার যাদুতে প্রভাবিত হয়ে অনেকবারই ক্লাস বাংক মেরেছি আমি, স্বর্ণা আপুও দুই-একবার। তবে আপুকে ক্লাস বাংক মারতে রাজি করানো এত সহজ ছিল না, আমি আর রাজীব মিলেও পারিনি এমনও হয়েছে। তো, একদিন রাজীবের সঙ্গে কথা হলো ফোনে। ও বললো, একটা ফিল্মের গল্প ভেবেছে, আমাকে শোনাতে চায়। আমি জানতাম ওর সঙ্গে দেখা করতে চারুকলায় গেলে আর ফেরা হবে না। কাজেই আমি বললাম, আমার পর পর দুই পিরিয়ড ক্লাস আছে, এখন নামতে পারব না। ও কলাভবনে আসুক।

কলাভবনে তখন লিফট ছিল না। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হত। রাজীব আসতে আসতে আমার ক্লাস শুরু হয়ে গেল। আমি ক্লাস থেকে দেখলাম ও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, সকালের সুন্দর রোদে। এত অস্থির ছেলেটা ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকল পুরোটা সময়। তারপর দুই ক্লাসের মাঝখানে যেটুকু সময় তার মধ্যে ও আমাকে গল্পটা শোনাল, করিডোরে দাঁড়িয়েই। আমি শুনছি আর আড়চোখে দেখছি ম্যাম ক্লাসে ঢুকলেন কিনা!

ওই দিনের গল্পটাও মনে পড়ে একটু একটু। এক নিঃসন্তান দম্পতির গল্প, দুটো এতিম বাচ্চার গল্প, সন্তান কামনায় জলে মুদ্রা ছুড়ে ফেলার গল্প, পিতৃমাতৃহীন দুই শিশু-কিশোরের পানিতে ডুব দিয়ে পয়সা তুলে আনার গল্প। আমি নিশ্চিত এই গল্প ও আরও অনেককেই শুনিয়েছে, কেউ যদি গল্পটা মনে করে করে একটা ছোট সিনেমা বানিয়ে ফেলত! রাজীব গল্প শোনাতে পছন্দ করত, ওর মতন স্টোরিটেলার আমি আর দেখিনি। ইশ, রাজীব যদি স্ট্যান্ডআপ কমেডি করত! কি মজাটাই না হত!

image

রাজীবের সব গল্প হত ভীষণ মানবিক, মাঝে মাঝে খুব নিষ্ঠুরও, একদম জীবনের মতন নিষ্ঠুর। যেমন ওর একটা কবিতা আছে আবুল হাসানের মহাবিখ্যাত নিঃসঙ্গতা কবিতার একটা কাউন্টার মতন।

আবুল হাসানের মেয়ে

রাজীব আশরাফ
(উৎসর্গ- কবি পরম গুরু আবুল হাসান)

অতটুকু চায়নি বালিকা
অত শোভা অত স্বাধীনতা
চেয়েছিল আরও কিছু কম
কিন্তু যে ঘটনা ঘটিয়ে গেছে হাওয়া ও আদম
তার দায় থেকে বাঁচাবে কে বালিকাকে?
ব্যর্থ স্বয়ং যেখানে যম!

অতটুকু চায়নি বালিকা
অত শোভা অত স্বাধীনতা
চেয়েছিল আরও কিছু কম
চাহিদার তালিকায় প্রথমেই রেখে
‘ইজ্জত’ ও ‘সম্ভ্রম’
এটা ছিল না বালিকার বয়ঃসন্ধিকালীন রোগ
জন্ম থেকেই সে জানত
বালিকার ভিন্ন নাম সম্ভোগ!

অতটুকু চায়নি বালিকা
অত শোভা অত স্বাধীনতা
চেয়েছিল আরও কিছু কম
পাটক্ষেতে উপর্যুপরি পালাক্রমে সংঘবদ্ধ
তার পরও টিকে থাকে যেন তার দম
আর চেয়েছিল মৃতদেহের প্রতি
বিষপিঁপড়ার সংযম!

এই কবিতাটা প্রথমবার শুনে শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি হয়েছিল আমার। পড়ে নয়, শুনে। অনেকদিন পর্যন্ত নিজের লেখা ওর মুখস্ত থাকত, তারপর নতুন কবিতা লিখে আগেরগুলো আস্তে আস্তে ভুলে যেত। এই লেখাটাকে বাংলা কবিতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। ফেমিনিস্ট ট্যাগ না লাগিয়েও বলা যায়, পুরুষ কবিদের পৌরুষিক বালিকাবিলাসের বিপরীতে ধর্ষণের সংস্কৃতির এই দুনিয়ায় এমন কবিতার প্রয়োজন ছিল। এই লেখাটা অনেক পুরনো। এটা যে থেকে গেছে তার কারণ সম্ভবত এটা ওর মুখস্ত ছিল। শুধু ওর কেন, এই লেখাটা আমার নিজেরও মুখস্ত।

রাজীব মুখে মুখে বলে যেত লাইনের পর লাইন। আগের দিনের ধর্ম প্রচারক, দার্শনিক, চারণ কবি বলা হয় যাদের,তাদের বাণী যেমন মুখে মুখে প্রচলিত থাকত, লালনের গান যেমন, অনেকটা ওই রকম! হোক কলরব যেমন, মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আমি লাস্টবেঞ্চ আমি ব্যাকডোর যেমন ইয়ং জেনারেশনের ঠোঁটের ডগায় থাকে!

আমার ছেলে প্রভুকে আমি কখনও রাইমস শেখাইনি, শিশুদের যে ছোটবেলা থেকেই নতুন কারও সাথে পরিচয় হওয়া মাত্র ‘একটা ছড়া বলো তো’ বলতে লজ্জা পেলে, ‘আচ্ছা তুমি পারো না, পারো? তাহলে বলো!’ ইত্যাদি বলে একটা পরীক্ষার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয় এই বিষয়টা আমার খুব নিষ্ঠুর মনে হত সব সময়। আমার ছেলেকে কেউ এই কথা জিজ্ঞেস করা মাত্র আমি নিজেই বলে দিতাম, ‘না ও ছড়া পারে না, শেখাইনি।‘ পরে বুঝেছি, কবিতা মুখস্ত করার দরকার আছে। এতে স্মৃতিশক্তি বাড়ে আর কবিতার মাত্রা, তাল আর ছন্দ সম্পর্কে ধারণা হয়। সে যা-ই হোক, প্রভুর যখন তিন বছর বয়স একদিন রান্নাঘর থেকে শুনি গুণগুণ করে গান করছে ও, হোক কলরব ফুলগুলি সব লাল না হয়ে নীল হলো ক্যান! প্রভুর এই গল্প শুনে রাজীব যে কি ভীষণ খুশি হয়েছিলো!

রাজীব বলতো, আমিও মার্কেজের মতো আমার বন্ধুদের জন্য লিখি। বন্ধুরা যেন আমাকে আরও বেশি ভালোবাসে! রাজীবকে ওর সব বন্ধুরা ভালোবাসে। কে কেন ভালোবাসে তা বোঝা খুব মুশকিল! এটা তো নিক্তি দিয়ে মাপা সম্ভব নয়! আমি নিজেও ঠিক করে বলতে পারব না ওকে এত ভালোবাসি কেন! ওর হাসিমুখের জন্য! ওর অন্তমিলের ছড়াগুলোর জন্য! ওর আর্ট আর ক্র্যাফটের জন্য! ওর কবিতার জন্য! ওর ফটোগ্রাফির জন্য! ওর সিনেমার জন্য! নাকি ওর এই এত্তো বড় হৃদয়টার জন্য! ওর শরীরে তো কিছু ছিল না! পুরাটাই কলিজা! জীবনকে উল্টেপাল্টে দেখার প্রচণ্ড সাহস, সমাজের অনেক বস্তাপচা রীতিনীতি অস্বীকার করার প্রচণ্ড স্পর্ধা নিয়ে বেঁচেছিল রাজীব! কোনও বন্ধুর থাকার জায়গা নেই, কোনও সমস্যা নেই, রাজীবের বাসায় চলে যাও, একদিন দুই রাত নয়, দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস! দেড়টা ঘর একটা খাট! কোনও ব্যাপার না! যদি হয় সুজন তেঁতুল পাতায় ন’জন। রাজীব ছিল এমনই এক সুজন, সুহৃদ, নিখাদ বন্ধু! কাজেই ওকে কেন এত ভালোবাসে সবাই সেটা একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন। লাল না হয়ে নীল হলো ক্যানের মতনই! এই প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই কারও কাছেই।

লেখক: কবি ও লেখক
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত