বাংলাদেশের সঙ্গে বড় শক্তিগুলো সম্পৃক্ত হতে চায়

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৫৬ পিএম

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত উত্থানটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এ কারণে বিশ্বের পরাশক্তি বা অর্থনীতির বড় অংশীজনরা ভূ-কৌশলগত বা ভূ-রাজনীতি বা ভূ-অর্থনীতির যে কোনো দিক থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে এনগেইজ বা সম্পৃক্ত হওয়ার জন্য আগ্রহী। আগ্রহী বলেই স্বাভাবিকভাবে তারা বাংলাদেশের মতো দেশের সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করবে এবং করছে। এই হিসেবে যেটা দেখা যায়, বাংলাদেশের যে চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মার্কেট ডেপথ অর্থাৎ বাজারের যে বিস্তৃতি এবং তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানামূখী প্রবণতার কারণে খুব স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমা বিশ্ব বলেন আর চীন বা বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এছাড়া বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী, অন্যদিকে বাংলাদেশকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় এক ধরনের রাজনৈতিক বলয়ও তৈরি হয়েছে। মায়ানমার ইস্যুটাও জিও স্ট্র্যাটিজিকভাবে খুবই সেনসিটিভ, যার সঙ্গে বিশে^র সুপার পাওয়ারগুলো জড়িত। যেমন চায়না, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ফ্রান্স এবং জাপান। সুতরাং এই জায়গাতে বাংলাদেশের বিষয়ে আরেকটা গ্লোবাল অ্যাটেনশান রয়েছে। পাশাপশি বাংলাদেশের মৌলিক অবস্থান হচ্ছে বহুপাক্ষিকতা। এই পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যেও বাংলাদেশ একটা ভারসাম্যমূলক অবস্থান বজায় রাখতে পেরেছে। আমার মনে হয় এটাও বিশ্বশক্তিগুলো খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে এসেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির স্থিতিশীলতা, ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির সঙ্গেও তারা নিজেদের জড়িয়ে ফেলছে। কারণ, তাদের প্রচুর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় বাংলাদেশের সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এই কারণে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর তাদের কড়া নজর থাকবে। তবে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের জাতীয় স্বার্থ। সেটা বাণিজ্যসম্পর্কিত হতে পারে, বিনিয়োগসম্পর্কিত হতে পারে আবার নিরাপত্তা কিংবা ভূ-কৌশলগত বিষয়ও হতে পারে। যে কোনো বিষয়েই সেটা হতে পারে। কারণ একেকটা দেশের স্বার্থ একেক রকম। অগ্রাধিকারও একেক রকম।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের বাংলাদেশ সফরে তিনটি বার্তা রয়েছে। তিনটি বার্তা মানে তিনটি অন্তর্নিহিত অর্থ রয়েছে। এক. রাশিয়ার বাংলাদেশের প্রতি কৌশলগত আগ্রহ তৈরি হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের আপেক্ষিক নিরপেক্ষ অবস্থানের জন্য রাশিয়া বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে। দুই. বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও রাশিয়া বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অর্থায়ন থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশীদার। পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের একটা প্রতিরক্ষা বিষয়ক স্বার্থ তৈরি হয়েছে।  ফলে তাদের বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণে কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিন. রাশিয়া যেহেতু এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্যাংশান বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে কারণে তার জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রা (অল্টারনেটিভ কারেন্সি) খুঁজে বের করা জরুরি। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশই মনে করছে যে এই ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা থাকা দরকার। এটাও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

অন্যদিকে রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও বাংলাদেশের জন্য আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল খাদ্যনিরাপত্তা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যতক্ষণ পর্যন্ত না থামছে ততক্ষণ সারা বিশে^র জন্যই খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে থাকবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু এই বিষয়টাকে আলোচনার মধ্যে রেখেছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গা ইস্যু। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টিকারী মায়ানমারের বড় কৌশলগত মিত্র রাশিয়া। এ বিষয়ে রাশিয়ার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ আশা করতে পারে। আমার মনে হয় এটা রাশিয়ার পক্ষে করা সম্ভব। কারণ মায়ানমারকে কেন্দ্র করে চীন-রাশিয়ার এক ধরনের বলয় আছে, সেটা বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা বাংলাদেশের জন্য ভালো।

ল্যাভরভের সফর শেষে নয়াদিল্লিতে যে জি-২০ সম্মেলন হলো সেখানে অনেকগুলো মাইলফলক সূচিত হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই সমে¥লনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেখা-সাক্ষাৎ একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই দেখা-সাক্ষাৎ একটা রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বিষয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়েছে। এই ধরনের রাজনৈতিক বোঝাপড়া যে কোনো রাষ্ট্রের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ভারতের আস্থার জায়গাটা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়েছে। এখানে বাংলাদেশের অনেকগুলো এজেন্ডাও রয়েছে, যেগুলো হয়তো আমরা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেখতে পাব। আরেকটা জটিল পয়েন্ট হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে যে বিষয়গুলো জড়িত সেসবের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দুর্নীতি দমন, জৈবজ্বালানি প্রভৃতিতে বাংলাদেশের একটা অবস্থান আছে। কিছু কিছু জায়গায় বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা আছে। বিষয়গুলো জি-২০-এ আলোচিত হয়েছে। এগুলো আমাদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। এসব দিক থেকে দেখলেও জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জি-২০ এর মধ্যেও ক্ষমতার রাজনীতি আছে। এর ধ্রুপদী উদাহরণ হলো -  চীন, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং ভারত আরও যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির জন্য এক ধরনের মতৈক্যে এসেছে। মুশকিল হচ্ছে এটা করতে গেলে পাকিস্তান, আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারত বা চীনের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। অন্যদিকে পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায় এক দেশ আরেক দেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। এ পরিস্থিতিতে কোন মুদ্রায় বাণিজ্য হবে তা নিয়ে বিশ্বে একটা সংকট চলমান আছে। এই সংকটের মুখে ব্রিকসে বিকল্প একটা ব্যাংক তৈরি করা হলো। কিন্তু সেই ব্যাংক কতটা ফলপ্রসূ হবে এবং যে ব্যাংকিং সিস্টেম বিশ্বে বহাল আছে সেটার বিপরীতে নতুন কী তারা দিতে পারবে সেটা নিয়েও প্রশ্নের অবকাশ আছে। সুতরাং এ পরিস্থিতিতে জি-২০-এ বাংলাদেশের অবস্থান জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে ঠিক আছে। তবে ব্রিকসের মতো এখানেও সদস্যপদ নিয়ে অতি উৎসাহী হওয়ার কিছু নেই।

জি-২০ সম্মেলনের পরপরই ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরেও বিশ্বে বাংলাদেশের একটা বড় ভূমিকা দৃশ্যমান হয়েছে। একটা হলো ফরাসি অর্থনীতি এখন মোটামুটি একটা জটিল অবস্থায় আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো বা অন্যান্য যে সংস্থা আছে সেগুলোর সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কে জটিলতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা চুক্তি অকাসে ফ্রান্সের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সাবমেরিন সরবরাহ করার কথা হয়েছিল, কিন্তু সেটা হয়নি। আমার মনে হয় এ কারণে ফ্রান্স খুব গুরুত্বের সঙ্গে তার এক্সপোর্ট পোর্টফোলিওর মধ্যে প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংযোগ, সাইবার স্পেস বিষয়ক প্রযুক্তি, এয়ার বাস, স্যাটেলাইট, রাফায়েলের মতো যুদ্ধবিমান বিক্রির বাজার খুঁজছে। হয়তো তারা বাংলাদেশকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখছে। সম্প্রতি আফ্রিকাতে যে ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো ঘটছে এবং এর ফলে সেখানে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক অধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সুতরাং তার জন্য বাংলাদেশের মতো বাজারগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের যে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এবং বঙ্গোপসাগরীয় ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হয়েছে সেটাও একটা কারণ। আমি বাংলাদেশকে সবসময় ‘অনুক্ত শক্তি’ বলি। এ শক্তিকে কেউ স্বীকার করত না, কিন্তু শক্তিটা আছে। এখন অবশ্য স্বীকারও করে। কারণ একের পর এক পরাশক্তিগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন বাংলাদেশে আসছেন, যাচ্ছেন। ১৭ কোটি মানুষের একটা সম্ভাবনাময় অর্থনীতি যে কারোর জন্যই খুব লোভনীয়। সুতরাং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে ঘিরে যে ‘অনুক্ত শক্তি’র  বাংলাদেশ তার উপস্থিতি বিশ্বশক্তিগুলো এখন অনুধাবন করছে।

তবে এখানে মনে রাখা দরকার, ক্ষমতার যে বৈশ্বিক সমীকরণের মধ্যে বাংলাদেশের উত্থান, তাকে ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত কাঠামোগত সংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কার এবং আর্থিক খাতের সংস্কার খুব জরুরি। আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পেতে চাই, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের যারা অংশীজন তাদের প্রত্যেকেরই একটা জাতীয় ঐকমত্যের জায়গা থেকে দেশের এই উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কেবলমাত্র একটা দলপ্রাণ জায়গা থেকে একে ব্যাখ্যা করলে এর টেকসই উপযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। এজন্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটাকে সুসংহত করা প্রয়োজন, যাতে আমরা লম্বা সময় ধরে এর সুবিধাটা নিতে পারি। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলেরই উচিত দলগত জায়গা থেকে না দেখে সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে বিষয়গুলো বিবেচনা করা। ভবিষ্যতে যে দলই বা যারাই ক্ষমতায় আসুক তারাই এর সুফল পাবেন, যেটা বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশ্বশক্তির মনোযোগ কেড়ে নেওয়া বাংলাদেশের এই উত্থানটা ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে বিদেশিদের কথাবার্তায় মনে হতে পারে যে পরাশক্তিগুলো সামনের নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনে ফ্রান্সের বড় রকমের কোনো ভূমিকা নেই। কিছুটা ভূমিকা থাকলে সেটা তিনটা দেশের আছে চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চীন আর ভারতের অবস্থানটা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশে কোনো অস্থিতিশীলতা দেখতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র যেটা চায়, সেটা হচ্ছে একটা জবাবদিহির ব্যবস্থা, সেটা অর্থনৈতিক এবং নির্বাচন সব কিছুতেই। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্যই এটা দরকার। সুতরাং আমার মনে হয়, চীন এবং ভারতকে সঙ্গে নিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও বাড়ানো উচিত।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত