ঢাকা শহরের ব্যস্ত সড়কের পাশে হয়তো অবহেলায় পড়ে আছে কোনো গাছ। গোড়ায় আবর্জনা জমেছে, ধুলা-ময়লায় মলিন হয়ে আছে। তখন যদি দেখেন কেউ সেই গাছের পরিচর্যা করছেন, ময়লা পরিষ্কার করছেন, পানি ঢালছেন গোড়ায়–বুঝে নেবেন তিনি রিকশাচালক জগলুল।
সচরাচর এমন রিকশাচালকের দেখা মেলে না। রাষ্ট্রীয় কোনো উৎসবে যিনি গাছ লাগান, উপহার দেন অন্যদের। গাছের জন্য পানি নিয়ে ঘোরেন। শহুরে গাড়ির ধোঁয়া, ধুলাবালি তাকে পোড়ায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশ দূষণের গ্রাস থেকে মুক্তি দিতে চান তিনি। তাই নিজের স্বল্প সামর্থ্যেই গাছ কেনেন, নিজেই লাগান, উপহারও দেন। নিজের সঙ্গে সব সময় বোতলে পানি রাখেন। রিকশা নিয়ে চলার পথে গাছের নিয়মিত পরিচর্যা করেন।
এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার গাছ লাগিয়েছেন বলে জানান জগলুল। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মাদারীপুর জেলা শহরে শুরু হয় তার এই অভিযান। সেখানে প্রায় আড়াই হাজার গাছ লাগিয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজে উপহার দিয়েছেন। চার মাস পর ঢাকায় ফিরেও সড়কের বিভাজন এবং বিভিন্ন ভবনের সামনে গাছ লাগিয়ে আসছেন তিনি।
তার পুরো নাম গাজী জগলুল মূলক। বয়স প্রায় ৪৯। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার সবটাই ঢাকা শহরে। ভূমিহীন জগলুল রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ভাড়া বাসায় থাকেন। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। প্রায় ২৫ বছর ধরে ঢাকা শহরে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। এর মধ্যে ২০২১ সালে গিয়েছিলেন পিতৃভূমি মাদারীপুরে।
এর কারণ ঢাকার দুর্বিষহ পরিবেশ। এক তো ধুলা-ধোঁয়ায় বিষাক্ত ঢাকার বাতাস। তারওপর রিকশা চালাতে গিয়ে নানা পুলিশি বিড়ম্বনায় পড়তে হতো তাকে। যে কারণে চলে যান মাদারীপুরে। সেখানে শুরু গাছ লাগানোর। মাদারীপুরের বন বিভাগ থেকে ছয় টাকা দরে প্রতিদিন গাছ কিনতেন। সেগুলো রাস্তার দুধারে কিংবা অন্যান্য ফাঁকা জায়গায় রোপণ করতেন। স্কুল ও কলেজে উপহারও দিয়েছেন। মাদারীপুরে চার মাসে তিনি প্রায় আড়াই হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন।
মাদারীপুরে অটোরিকশা চালাতেন জগলুল। কিন্তু মালিককে যে পরিমাণ ভাড়া দিতে হতো, তাতে তার পরিবারের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আবার ফিরতে হয় ঢাকায়। নিজের জন্য একটি পায়ে চালানো রিকশা কেনেন। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা রোজগার তার। এ টাকার মধ্যেই নিজের সংসার চালান, আবার গাছও কেনেন। দেশের কিংবা নিজের যে কোনো উপলক্ষ এলেই তিনি গাছ লাগিয়ে তা উদ্যাপন করেন।
মঙ্গলবার বিকেলে দেশ রূপান্তরের কার্যালয়ে জগলুলের সঙ্গে কথা হয়।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মানুষ গাছ লাগায়, কিন্তু যত্ন নেয় না। এটা খুবই কষ্টের। আমি রিকশা চালানোর সময় রাস্তার পাশের গাছ দেখতে পাই। সেখানে ময়লা থাকলে পরিষ্কার করি, পানি দিই। এটি আমাকে প্রশান্তি দেয়।
তিনি জানান, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন, রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ, পবিত্র ঈদুল আজহা কিংবা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন উপলক্ষ গাছ লাগিয়ে উদ্যাপন করেছেন তিনি।
বললেন, গাছ লাগানো তার নেশা হয়ে গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তিনি মূলত ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। কৃষ্ণচূড়া, গোলাপ, গাঁদা, জবাসহ আরও অনেক নাম বললেন। আর মাদারীপুরে লাগিয়েছেন পেয়ারা, কাঁঠাল, দেবদারু, আকাশমণি, বকুল, কড়ই, মেহগনি গাছ।
জগলুল বলেন, গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা দেখে অনেকে আমাকে পাগল বলে। বাড়ি থেকেও কথা শুনতে হয়। তাও থামি না। আমি চাই, সবাই গাছ লাগাবে এবং তার যত্ন নেবে।
খিলগাঁও আইডিয়াল স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন জগলুল। এসএসসি পরীক্ষা দিলেও পাস করতে পারেননি। আগামী প্রজন্ম তার গাছ থেকে আলো-বাতাস পাবে–গাছ লাগানোর পেছনে এটাই তার অনুপ্রেরণা। প্রত্যেক মাসে প্রায় দেড় হাজার টাকার গাছ কেনেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমার থাকার জায়গা নেই। ভাড়া বাসায় থাকি। আশ্রয়ণ কেন্দ্র প্রকল্পের ঘর চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, কিন্তু পাইনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মরিচ গাছ হলেও লাগাতে। তাই দেশবাসীর কাছে আমার অনুরোধ সবাই গাছ লাগাবেন এবং যত্ন নেবেন’।