সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থী, আইনজীবী, চিকিৎসককেউ বাদ যাননি। আন্দোলন করতে আসা সবাইকে পিটিয়েছেন রমনা জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) হারুন-অর-রশীদ। এমনকি বাদ যাননি তার সহকর্মী পুলিশ সদস্য ও সাংবাদিকরাও। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বারবার নেতিবাচক খবরের শিরোনাম হলেও তার বিরুদ্ধে কখনোই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ছাত্রলীগ নেতাদের পেটানোর ঘটনায় প্রথমে প্রত্যাহার এবং পরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় তাকে। এতে যেমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে স্বস্তি মিলছে ছাত্রলীগে, তেমনি আক্ষেপ, প্রশ্ন থাকলেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মাঝে।
ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে গত শনিবার রাতে শাহবাগ থানায় তুলে নিয়ে ছাত্রলীগের তিন কেন্দ্রীয় নেতাকে বেদম পেটান এডিসি হারুন। মারধরের শিকার নেতারা হলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নাঈম, বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক শরীফ আহমেদ মুনিম এবং বঙ্গবন্ধু হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান। গুরুতর আহত আনোয়ার হোসেন হাসপাতালে ভর্তি আছেন এখনো। এ ঘটনার পর হারুনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তার সর্বোচ্চ শাস্তি চান সবাই। এ ছাড়া এত বড় ঘটনায় মামলা না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
এ ঘটনায় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বিবৃতি না দেওয়া, রাজপথে আন্দোলনের নির্দেশনা না থাকা, মামলা না করায় শুরুতে ছাত্রলীগে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। একই সঙ্গে ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়নের খোঁটাযুক্ত বিবৃতি আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। ছাত্রলীগ নেতাদের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে কটাক্ষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করছেন। তবে পরে সাময়িক বরখাস্ত করায় কিছুটা দায় কমেছে। বরখাস্ত না হলে কঠোর সমালোচনায় বিদ্ধ হতে হতো কেন্দ্রীয় নেতাদের। সংগঠনটির শীর্ষনেতারা বলছেন, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ছাত্রলীগ বিষয়টি নিয়ে এগিয়েছে এবং ব্যবস্থা নিয়েছে। এটা ছাত্রলীগের স্মার্ট পলিটিকসের উদাহরণ।
ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তীব্রভাবে নিন্দা প্রকাশ করেছে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের পাশে আমরা সার্বক্ষণিক রয়েছি, তাদের চিকিৎসার সব দায়িত্ব বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নিয়েছে। আমরা বাংলাদেশ পুলিশকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছে। উচ্চতর তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তির ব্যবস্থা, সেটাও গ্রহণ করা হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন তারা। আমাদের নেতাকর্মীদের মনে ক্ষোভ ছিল, আবেগ ছিল এটা স্বাভাবিক। দিনশেষে এর মাধ্যমে সবার জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হলো। পাশাপাশি আমরা চাই এ ধরনের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে।’
ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমাদের নেতাকর্মীদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাদের যে দাবিগুলো ছিল, সেগুলো স্বল্পতম সময়ে অ্যাড্রেস করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এটি দাবি আদায়ের আধুনিক এবং চমৎকার কৌশল অবলম্বন করতে সমর্থ হয়েছি। এটি ছাত্রলীগের স্মার্ট পলিটিকসের অনন্য উদাহরণ বলে আমি মনে করি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে এবং শুধু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নয়, সব নাগরিকের সঙ্গে পুলিশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক থাকে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য আমরা আহ্বান জানিয়েছি।’
বিরোধীদলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো সব সময় এডিসি হারুনের বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বহুবার। ছাত্রলীগের তিন নেতাকে বেধড়ক পেটানোর ঘটনায়ও নিন্দা জানিয়েছে তারা। তবে ছাত্রলীগ বলেই বিচার হচ্ছে, বহিষ্কার হচ্ছে অন্যদের ক্ষেত্রে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এই প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এ ছাড়া তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি এবং মামলা না হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ছাত্রনেতারা। একই সঙ্গে আগামীতে যেকোনো পুলিশি হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যার অন্যতম প্রমাণ এ ঘটনা। এত বড় ঘটনায় ছাত্রলীগ সরাসরি প্রতিবাদ করতে পারেনি, মামলা করতে পারেনি। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পুলিশ প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। ছাত্রলীগের চেয়েও পুলিশ সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করতে তাদের বুক কাঁপে না। ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলন সংগ্রামে হারুন নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে। কোনো ঘটনায় তার বিচার হয়নি। হারুন থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্যাতন কিছুটা হয়তো কমবে। যদিও হারুনের সাময়িক বহিষ্কার শুধুই আইওয়াশ বলে আমরা মনে করি।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, ‘সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পুলিশ অন্যায়ভাবে হামলা চালিয়েছে। যার নেতৃত্ব দিয়েছেন এডিসি হারুন। আন্দোলন দমন করার কাজে সরকার তাকে ব্যবহার করেছে। এবার যখন ছাত্রলীগের ওপর হামলা হলো, তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাকে যে বরখাস্ত করা হলো স্পষ্টত মারাত্মক আইন লঙ্ঘন। তার বিরুদ্ধে মাত্রা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এত বড় ঘটনায় কেন মামলা করেনি ছাত্রলীগ, সেটা আমার বুঝে আসে না। আমরা প্রত্যাশা করব এরপর আর কেউ বেআইনিভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা দেবে না। পুলিশি হামলা কোনোভাবেই চলবে না, এটা আমাদের দাবি।’
ছাত্র অধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই সেই এডিসি হারুন, যিনি কিনা শাহবাগ থানায় রিমান্ডরত ছাত্রনেতার মুখে মরিচ ঢেলেছিল। বিরোধী দলকে নিয়মিত নির্যাতন করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাদের মারধরের কারণে ঠিকই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তার মানে ছাত্রলীগের হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বাকিদের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এটা কোনো সমাধান নয়। তার আগের অপকর্মগুলোরও বিচার হওয়া উচিত এবং আগামীতে যেন কেউই এমন নির্যাতন-নিপীড়ন না চালাতে পারে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে। সবার ক্ষেত্রে সমান বিচার হওয়া উচিত।’
এদিকে দেশব্যাপী আলোচিত এ ঘটনায় মামলা না হওয়ায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ না চাওয়ায় এখন পর্যন্ত মামলা করেনি নাঈমের পরিবার। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতির কথা শোনা গেলেও মামলা নয়, পুলিশের বিভাগীয় তদন্তের ওপর আস্থার কথা জানিয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। এ বিষয়ে নাঈম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সব প্রস্তুতি রয়েছে। বিভাগীয় তদন্ত দেখেই আমরা ব্যবস্থা নেব।’
