ধর্ষণ ও পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টা

৪০ দিন পর আইসিউতে মেয়েটি, জীবন নিয়ে শঙ্কা

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৩১ পিএম

অপারেশনের পর হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়ে আইসিউতে চলে গেছে সেই মেয়েটি। বগুড়ার শিবগঞ্জে ধর্ষণের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার শিকার মেয়েটি মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে গত ৪০ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ১৭ বছর বয়সী মেয়েটির একটা বড় ধরনের অপারেশন হয়। অপারেশনের চলাকালীন বা পরবর্তী সময়ে মেয়েটির হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর থেকে তাকে ঢামেকের আইসিউতে রাখা হয়েছে। বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. আশিকুর রহমান।

সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি ফোনে বলেন, মেয়েটির অবস্থা ভালো নয়। অপারেশন চলাকালীন সময়ে বা এরপর তার হার্ট অ্যাটাক হয়। এখন তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে আইসিউতে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও আমাদের বিভাগের চিকিৎসকরা মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। বিকেল ৩টার দিকে তাকে অপারেশন থেকে বের করা হয়।

তিনি বলেন, তার শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে খুব বেশি। তার অবস্থা ভালো নয়। আজ তার বেশ বড় একটা অপারেশন ছিল। ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর বাকী অংশ কেটে ফেলা হয়। এর আগেও এই আঙ্গুলের একটা অংশ কেটে ফেলা হয়েছিল।

এদিকে শঙ্কা আর উদ্বিগ্ন হয়ে আইসিইউর সামনের সময় কাটাচ্ছেন মেয়েটির বাবা মা। মেয়েটির বাবা কাঁদতে কাঁদতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার মেয়েটি নড়াচড়া করতেছে না। আমার বাচ্চা টা বাঁচবে কি না জানি না। যেকোনোভাবে আমার মেয়েটি ফিরে আসুক বলেই তিনি কান্না শুরু করে দেন।

এর আগে হাসপাতালে ভর্তি মেয়েটি গত শনিবার দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময় বিচার পাওয়া নিয়ে নিজের দুশ্চিন্তার কথা জানায়। মেয়েটি বলে, যে আমার এই অবস্থা করেছে,পুলিশ কি তাকে ছেড়ে দেবে?আমি কি বিচার পাবো?

এ সময় মেয়েটি বলে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, সারা শরীর প্রচণ্ড ব্যাথা। নড়া চড়া করতে পারি না।

সম্প্রতি দেশে কন্যাশিশু ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ছে যার প্রধান কারণ সামাজিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বলে মনে করেন মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, দাপুটে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে। যে যে তার ক্ষমতা দেখাচ্ছে। আমাদের শিক্ষানীতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। বিচারহীনতার জায়গা বন্ধ করে অপরাধীদের শাস্তি আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের গত ছয় মাসের নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময় ৭৭৯ জন কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়। ধর্ষণের শিকার হয় ২২৩ জন কন্যাশিশু। একই সময় ১০৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। নারীর চেয়ে শিশুধর্ষণের শিকার হয় ১০৬ শতাংশ বেশি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ বলছে, এক বছরে শিশু নির্যাতন বেড়েছে ৫ শতাংশ। গত ছয় মাসে ২৪৬ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। এ সময় আত্মহত্যা করেছে ৪৫ শিশু। বিভিন্ন সময়ে মোট ৮৭ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে চার শিশুর।

জানা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বগুড়ার শিবগঞ্জের আটমূল ইউনিয়নের ১৭ বছর বয়সী মেয়েটিকে প্রথমে ধর্ষণ করেন একই গ্রামের যুবক সাইফুল ইসলাম। মেয়েটি স্থানীয় মাদ্রাসায় আলীমে পড়াশনা করতো। সাইফুল মেয়েটির বাবা মাসুদুর রহমানের দুই চাচাতো ভাই রঞ্জু ও নাইমের সহযোগিতায় মেয়েটির ঘরে প্রবেশ করে। এ সময় মাসুদুর রহমান তার স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে ছিলেন। তার বৃদ্ধ মা পাশের ঘরে নামাজ পড়ছিলেন যা আগে থেকেই জানতেন নাইম ও রঞ্জু। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল এ সুযোগে সবার অগোচরে মেয়েটিকে একা পেয়ে সাইফুল ধর্ষণ করেন এবং এক পর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে হত্যার উদ্দেশ্যে চটের বস্তা ও কাপড় দিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

আগুনের আঁচে মেয়েটির জ্ঞান ফিরলে সে আগুন শরীরে নিয়ে দৌড়ে তার আরেক চাচা কামরুজ্জামানের বাড়িতে যায়। সেখানে সাইফুলের নাম উল্লেখ করে ঘটনার কথা জানায়। এরপর কামরুজ্জামান ও প্রতিবেশীরা মিলে মেয়েটিকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন এরপর সেখান থেকে সেদিন ই ঢাকায় নিয়ে আসেন।

এদিকে ঘটনার পর এলাকাবাসী সাইফুলকে ধরে পুলিশে দেন। পরদিন মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে বগুড়ার শিবগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণসহ শরীরে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সাইফুল ছাড়াও আসামি করা হয় রঞ্জু ও নাইমকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত