বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ সংঘাতমুখী তা জাতিসংঘ বা বিদেশি কারও বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনীতি না বোঝা বা রাজনীতিতে অনাগ্রহীরাও তা নেতানেত্রীদের কথাবার্তা ও আচরণে উপলব্ধি করছেন। কিন্তু, কে বুঝে তাদের এ উপলব্ধি? কে শোনে তাদের কথা? অবশ্য, বলার মতো সিভিল সোসাইটিও গড়ে ওঠেনি। তবে, বিদেশিদের কথা টুকটাক শোনার অভ্যাস আছে আমাদের রাজনীতিকদের। সেটাও নিজের মন মতো হলে। আবার স্যাংশন-রেস্ট্রিকশনের ভয় বা কোনো প্রাপ্তির লক্ষণ দেখলে আচ্ছা মতোই শোনেন। কেবল শোনেনই না, তাদের কথা মতো আরও কত কিছু করেনও। এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ বলেছে, ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে। নইলে সামনে বাজে পরিস্থিতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সতর্কবার্তা আরও কঠোর। বিরোধীদের মাথায় ইউরেনিয়াম ঢালতে চাওয়ার মতো উসকানিমূলক বক্তব্য সংঘাতকে উসকে দিতে পারে বলে শঙ্কা জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ভাষা, বার্তা এবং ভবিষ্যদ্বাণী আরও তেজি।
এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-ইইউভুক্ত দেশগুলো আরও আগে থেকেই খোঁচাখুঁচি বন্ধের ডাক-দোহাই দিয়ে আসছে। কিন্তু, ফলাফল এখন পর্যন্ত জিরো। বরং মাইনাস পর্যায়ে। পা ভেঙে দেওয়া, মাজা ভেঙে দেওয়া, ঘাড় মটকে দেওয়া পর্যন্তই নয়। বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে যুবলীগকে দেখলে শয়তানও ভয়ে পালায়, ঢাকায় ঢুকতে না দেওয়া, বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া, মরণযাত্রায় শামিল করে দেওয়ার মতো উৎকট হুঙ্কার পর্যন্ত উচ্চারিত হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পের জন্য আমদানি করা ইউরেনিয়াম বিরোধী দলের মাথায় ঢেলে দেওয়ার হুঙ্কারটি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সহিংসতা উসকে দেওয়া বক্তব্যের বিচার হয় না মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের প্রতিবেদনে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রিপোর্টের ভাষা আরও খোলামেলা। সেখানে বলা হয়েছে, সহিংস হতে পারে নির্বাচন, আসতে পারে নিষেধাজ্ঞা। গ্রুপটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সহিংস হয়ে উঠতে পারে। একদিকে বিরোধীদের দাবি মানছে না সরকার। আরেকদিকে দিচ্ছে অবিরাম হুঙ্কার। এতে বাংলাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সমর্থকরা রাজপথের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। হামলা হতে পারে দলীয় অফিস ও প্রার্থীদের ওপর। সরকারের বিরোধিতায় আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে ইসলামপন্থি গ্রুপগুলো। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট-কেএনএফ নামক সংগঠনটিও নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। রিপোর্টটিতে আরও বলা হয়, আগামী জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বা পরে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। জালিয়াতির বা বিতর্কিত নির্বাচন হলে তাতে তীব্র সরকারবিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভ হতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অন্য দেশগুলো নিষেধাজ্ঞার তীব্রতা বাড়াতে পারে। সরকার তখন অধিক পরিমাণে ভারত ও চীনের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এক পর্যায়ে বিশেষ কোনো বাহিনী ক্ষমতা টেকওভার করতে পারে এমন শঙ্কার কথা পর্যন্ত এসেছে তাদের রিপোর্টে।
টান টান উত্তেজনা এবং শঙ্কা থাকলেও দৃশ্যত পরিস্থিতি এখনো ২০০৬ সালের অক্টোবরের পর্যায়ে যায়নি। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-মন্ত্রীদের হুমকি-ধমকি, বিরোধী দলের নেতাদের ‘সরকার পালাবার পথ পাবে না’ হুঁশিয়ারি চললেও এখন পর্যন্ত রক্তাক্ত পর্ব দেখতে হয়নি। গর্জন দৃষ্টে বর্ষণ না হওয়া এখানে অবশ্যই ইতিবাচক। সরকারি তরফে বিএনপিকে উত্তেজিত করার চেষ্টা লক্ষণীয়। বিরোধী দলের অন্দোলনকে হোমিওপ্যাথিক, হামাগুড়ি, গান্ধীবাদী ইত্যাদি নামে তাচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্যে পরিষ্কার। এমনিতেই এ সরকারের কয়েক মন্ত্রী ও দলের কিছু নেতা হুমকি-হুঙ্কারের জন্য বেশ আলোচিত। কাঁচাকথার ছ্যাবলামিতে কিংবদন্তির মতো আছেন কয়েকজন। তারা বেশ বিনোদনও জোগান। ঘুষকে স্পিডমানি, সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হ্যাক হয়ে যাওয়াকে সামান্য টাকা, বিদেশে অর্থপাচারকে অর্থ রপ্তানি, বাংলাদেশে এখন গরুও ভাত খায়, বাঙালি ভাত বেশি খাওয়ায় চালের দাম বেড়ে যাওয়া, ভারতের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, হাতিরঝিলে গেলে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর ব্যাংকক মনে হয়, বুড়িগঙ্গার পাড়ে গেলে টেমস নদী দেখা হয়ে যাবে, বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ইউরোপের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার পর্যায়ে, যানজট-ডেঙ্গু দেশের উন্নয়নের প্রমাণ ইত্যাদি কথায় মানুষকে কষ্ট দিয়ে কেবল বদদোয়া কামান বললে কম বলা হবে। তারা একদম মাগনা বিনোদনও জোগান দিচ্ছেন মানুষকে। এক সময় দিলদার, হাসমত, টেলি সামাদ, খান জয়নুলদের কৌতুক বা কমিক দেখে যে বিনোদন মিলত, এর চেয়ে ঢের বেশি বিনোদন নিশ্চিত হয় তাদের মাধ্যমে।
বিনোদনের চেয়ে এখন ভয়ের জোগান বেশি হয়ে যাচ্ছে। তাদের শব্দ-বাক্য সমাজকেও কম আক্রান্ত করছে না। তলে তলে, খেলা হবে ছাড়াও তাদের নানা ভঙ্গি ও রাজনীতির কুকথা সমাজে এমনকি ঘরকেও নোংরা করছে। ‘খেলা হবে’র মতো ‘তলে তলে’ও পাবলিক খায় ভালো মর্মে প্রকাশ্যে সাফাই গাওয়া হয়েছে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে। কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে কত কথাই বলতে হয় এ যুক্তিও দেওয়া হয়েছে। কর্মীরা যুক্তিতে সায় দিয়ে হাততালি দিয়েছে। এতে কদিন আগে ‘খেলা হবে’র মৃদু সমালোচনা করা দলের প্রবীণ এবং বোধজ্ঞানসম্পন্নরা চুপসে গেছেন। তারা বুঝে গেছেন নিষ্ঠুর বাস্তবতা। রাজনৈতিক নেতারা সবার কাছে না হলেও দলের কর্মীদের কাছে আইকনের মতো। তাদের দ্বারা প্রভাবিতও। তা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে স্পর্শ দেয়। সেই ছোঁয়ায় ‘ফাইট্টা যায় ফাইট্টা যায় বা টিপ্পা দে টিপ্পা দে’ গানও পাবলিক ভালো খায়।
রাজনীতির ময়দানে লড়াইটা বহুমুখী। রাজনীতিকদের কথাও বহুমুখী। তাদের শেষ কথা বলে কিছু নেই। তারা মিথ্যাও বলেন না। সকাল-দুপুর, বিকেল-সন্ধ্যা-রাতসহ বিভিন্ন প্রহরে যখন যা বলেন সবই তখনকার জন্য সত্য। এ সত্য এখন সহিংসতার বার্তায় এসে ঠেকেছে, যা সুস্থ-বিবেকবান যে কারও জন্য কষ্টের-উদ্বেগের। সাধারণ জনগণ মোটেই রাজনীতিকদের পীর-সন্ন্যাসী ভাবেন না। সচরাচর রাজনীতিকদের কাছে তারা সত্যকথা আশাও করেন না। ধরেই নেন, তাদের কথা ঠিক নেই। তাই বলে অহরহ আস্তিন গুটানো, ভ্যাংচি কেটে খিঁচুনি, হুঙ্কার-পাল্টা হুঙ্কারে এভাবে ভয়ে ফেলাও মেনে নিতে হবে? তাদের কথায় এক, কাজে আরেক তা মানতে-বুঝতে মানুষ অভ্যস্ত হতে বাধ্য। এখন ভয়ে পড়তেও বাধ্য? এক সময় বলা হতো, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার হলো কাব্যিক, শাসন গদ্যময়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক গদ্য-পদ্য এখন ঠিকঠিকানাহীন। সামনে নির্বাচন। রাজনীতিতে বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য আসবে। তা অতিমাত্রায় হওয়ার যাবতীয় বাস্তবতাও বিদ্যমান। তাই বলে একেবারে নোংরা-কদাকার খিঁচুনি হজম করাও অবধারিত? নাকি নিয়তি? নাট্যজন মামুনুর রশীদ রুচির দুর্ভিক্ষের কথা বলে নাকানি-চুবানিতে পড়ে গিয়েছিলেন। সাহস করে কেউ জানতেও চাইলেন না তিনি কী উদ্দেশ্যে, কী বোঝাতে চেয়েছিলেন। বেচারা বোবার মতো দমে গেছেন।
গত কদিনের রাজনীতির মাঠের বাস্তবতায় তার সেই ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ বড় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কোনো রাজনৈতিক পক্ষই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বলে না। এমনকি নির্যাতিত কোনো বিরোধী দলও রাজনৈতিক এই নোংরা সংস্কৃতির পরিবর্তনের কথা বলে না। নেতা-নেত্রীর মুক্তি দিতে হবে বলে তারা সেøাগান দেয়, দাবি তোলে। কিন্তু এই দুরবস্থা, তা বদলের কথা কারও মুখে শোনা যায় না। তাদের শ্রেণিচরিত্রটি কাছাকাছি। সবাই ক্ষমতায় থাকলে বিরোধী মত দমনে সিদ্ধহস্ত। আর বিরোধী দলে গেলে গণতন্ত্রের ছবক আওড়ান। এবারের দৃশ্যায়নটির তীব্রতা বেশি। নির্বাচন ও বিরোধী দলের চূড়ান্ত আন্দোলন ঘিরে প্রবল বেগে চলছে বিএনপি নেতাদের মামলার বিচারকাজ। এসব মামলার বিচার কার্যক্রমের গতি সুপারসনিক টাইপের। তা রাতেও চলমান। শতাধিক মামলার এমন গতিময়তা। রাজনীতির মাঠকে আপাতত বিদায় দিয়ে দণ্ড মাথায় নিয়ে তাদের কারও কারও গন্তব্য চৌদ্দ শিকে। সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীর নামে মামলা দেড় লক্ষাধিক। নতুন-পুরনো মামলার মিশেলে আদালত আঙিনায় চক্কর দিতে দিতেই ঘাম ছুটছে তাদের। কাঠগড়া, হাজিরা, জামিন এসবই আসামিদের এখনকার যাপিত জীবন। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক আর কর্মজীবন হয়ে গেছে তছনছ। নতুন করে ভর করেছে মামলার সাজার শঙ্কা। লক্ষণটি মোটেই শুভ নয়। রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতিসহ দেশের যাবতীয় দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্ব পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় বাজার। এই হাটের হাটুরি হতে আগ্রহ সুপার পাওয়ার প্রায় সব দেশেরই। বাংলাদেশ ওই তিন-চার শক্তির পরোক্ষ কেন্দ্র হয়ে উঠতে উঠতে এখন বেশ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠছে। মাত্রাগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তা বেশির চেয়েও বেশি। স্বাভাবিকভাবেই এর সরাসরি শিকার ক্ষমতাসীনরা।
অবধারিতভাবে বিষয়টি এখন বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে আরও নানা পক্ষ। তিক্ত কথাবার্তার ধারা বইছে । গত কয়েক মাস ধরে তিক্ত কথা কম হয়নি। কাণ্ডকীর্তিও কম ঘটেনি। স্যাংশনের পর ভিসানীতি। এতে বিরোধী রাজনৈতিক মহল পুলকিত। এটিও আরেক অশুভ আলামত। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যেতে এবং থাকতে বরাবরই শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর আনুকূল্যপ্রার্থী। যার এক কদাকার জের বহুল আলোচিত ওয়ান ইলেভেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস, ব্রিটেনের আনোয়ার চৌধুরী, জাতিসংঘের রেনাটা লক ডেসালিয়ানসহ বিদেশি কূটনীতিকদের তখনকার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিডর বইয়ে দিয়েছিল। তখনকার ল্যাঠা মেটাতে ঢাকায় এসেছিলেন জাতিসংঘের তখনকার মহাসচিবের বিশেষ দূত ক্রেইগ জেনেসও। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সংবাদ সম্মেলনে বেশ কিছু সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ওই রাজনৈতিক সংকট অব্যাহত থাকলে তা বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। হয়েছিল তা-ই। এই অক্টোবর মাসটির ২৮ তারিখে লগিবৈঠায় লাশের কলঙ্ক। পরে তা ঠেকে ওয়ান ইলেভেনে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
