জগমোহন ডালমিয়াকে এত নিশ্চিন্ত এবং উজ্জ্বল দেখিয়েছিল যেন সব সেটিং করে ফেলেছেন। উত্তরে বললেন, ‘আপনার কোনো সন্দেহ আছে নাকি আমাদের বিশ্বকাপ জেতার ব্যাপারে?’
২০০৩। জোহানেসবার্গের স্যান্ডটন সান হোটেলের লবিতে তৎকালীন ভারতীয় বোর্ড প্রধানের সঙ্গে দেখা। পরের ২৪ ঘণ্টায় সৌরভের ভারত ফাইনাল খেলবে পন্টিংয়ের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ডালমিয়াকে এমন আত্মবিশ্বাসী দেখে গভীর আশ্চর্য লেগেছিল। একটু আগে ওয়ান্ডারার্স মাঠ থেকে গ্লেন ম্যাকগ্রার অনুলিখন করে বেরিয়েছি। যেখানে তিনি আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকরতম বোলার বলছেন, ‘পোর্ট এলিজাবেথের সেমিফাইনালের স্পিনিং উইকেটে তা-ও আমাদের পেড়ে ফেলার চান্স ছিল। কিন্তু এখানে পৌঁছে যাওয়ার পর আর আপনাদের কোনো চান্স নেই।’ সেখানে ডালমিয়া তিনি কোন ক্রিকেটিং দৃষ্টিকোণে এমন নিশ্চিত থাকছেন? পরের দিন বিজিত টিমকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার বিশেষ বিমানের ব্যবস্থা।
জো বার্গ-মুম্বই। ফ্লাইটে উঠে ডানদিকে ইকোনমি ক্লাসের দিকে যাচ্ছি। বিজনেস ক্লাসের পেছনের সিটে সদ্য জায়গা করতে থাকা অতিথির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। ডালমিয়া। ভাবলাম লজ্জায় চোখটা নিচু করবেন। কোনো লক্ষণ নেই। আমি কিছু শুরুর আগে নিজেই শুরু করলেন, ‘সব কথা হয়ে গেছে। ফ্লাইটের মধ্যেই মিটিং হবে শচিন, সৌরভ আর অনিলের সঙ্গে। পরের ওয়ার্ল্ড কাপে যাতে শেষ বাধাটাও পেরিয়ে যাই।’
মিটিং হলোও। কী করে পেস বোলার তোলার তোড় দেশে অব্যাহত রাখা যায়? কী করে জাতীয় ক্রিকেট একাডেমিকে আরও অর্থবহ করে তোলা যায়? ট্যালেন্ট রিসার্চ উইংকে কী করে আরও ধারালো করা যায়? জন রাইট খুব ভালো কাজ করছেন। কিন্তু শেষ ধাপ পেরোতে তার চেয়ে ভালো আর কারও খোঁজ কি পাওয়া যায়?
ইতিহাস বলবে, পরের বিশ্বকাপ ভারতের ভয়াবহ গিয়েছিল। আবার ইতিহাস বলবে, ওই ফ্লাইটযাত্রার মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন বীজ বুনে দিয়েছিল ২০০৪-১১ ভারতের অবিস্মরণীয় সব ক্রিকেট স্মৃতিচিহ্নের। দুটো বিশ্বকাপ। অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ ড্র রক্ষা। পাকিস্তানে টেস্ট ও ওয়ানডে জয়। ইংল্যান্ডে জয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যুগ্ম জয়। ট্যালেন্ট স্কিমের মাধ্যমে ধোনির উত্থান। সবকিছু এই সময়ে।
ঘটনার সারমর্ম ব্যর্থতায় আলোড়িত হয়ে ভেসে যেতে নেই। মাথা ঠান্ডা রেখে তখন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। যেগুলো আগে নেওয়া যায়নি ব্যর্থতা প্রশাসককে সেই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ দেয়। কলকাতা মাঠের এক ফুটবল প্রশাসক ঠাট্টাচ্ছলে আমায় বলেছিলেন, ‘সাকসেস আমাদের কাজ করার সময় নয়। তখন প্লেয়ারের টাইম। আমাদের কাজ করার স্কোপ ব্যর্থতায়। তখন কোনো তারকাবাজি বরদাশত না করে এগোনোর সুযোগ পাওয়া যায়। পাবলিকও তখন প্রশাসকের সঙ্গে থাকে।’
বাংলাদেশ টিমকে বিশ^ ক্রিকেট উৎসবের সবচেয়ে গৌরবজনক সময়ে সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যেতে দেখে কোথাও মনে হচ্ছে একমাত্র সমস্যা টিম নয়, টিমকে ঘিরে তার যে বহির্জগৎ সেখানেও। কাল রাত্তিরে ভারত-ইংল্যান্ড ম্যাচে ধারাভাষ্য দেওয়ার ফাঁকে আতহার আলি খানের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। টিমের খারাপ পারফরম্যান্সে দৃশ্যত মুহ্যমান থাকা আতহার মনে করেন স্পোর্টসে এক একটা সময় হয় যখন বুদ্ধিতে পতনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বলছিলেন, ‘আমাদের এই টিমটাই তো ভারতকে এক বছর আগে হারিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে জিতে এসেছে। টিম জাস্ট দাঁড়িয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের কী অবস্থা দেখছেন না। বোর্ডই বা কী করবে প্লেয়ার খেলতে না পারলে?’
একমত হতে পারিনি। তর্ক চলতে চলতে পরের স্টিন্টে দুজনেরই ডাক পড়ে গেল। কিন্তু এখানে আধডজন টোটকার কথা লিখতে চাই। চল্লিশ বছর ক্রিকেট রিপোর্টিংয়ের সুবাদে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কিছু ফাঁকফোকর নিয়ত চোখে পড়ে। অকপটে সেগুলো বলছি।
যদি ভিনদেশীয় সাংবাদিকের অযাচিত কড়া প্রেসক্রিপশন মনে হয়। অনুগ্রহ করে মাথায় রাখবেন যে ছোটবেলা থেকে সিলেট-ঢাকা দক্ষিণের কানিশাইল গ্রামে তাদের পূর্বপুরুষের পুকুরঘেঁষা বড় বাড়ির কথা শুনে বড় হয়েছে। কখনো দেখার সুযোগ পায়নি তারও কথাগুলো লিখতে ভালো লাগছে না। কিন্তু সেই বিখ্যাত প্রবচনটা আমাদের সবার মনে রাখা উচিত কঠিন সমস্যার দাওয়াই বাধ্যতামূলকভাবে হতে হবে তেতো। আর সেটা বিশ্বজনীন। অঞ্চল বা দেশভিত্তিক নয়।
১. বাংলাদেশ ২০৩১ সালে যে নৌকাসদৃশ স্টেডিয়ামের মাধ্যমে বিশ্বকাপ উদ্বোধন ঘটাবে তা কলকাতা মিডিয়ায় ইতিমধ্যে সাদরে বিজ্ঞাপিত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো স্থাপত্য। কিন্তু স্টেডিয়াম দিয়ে কী হবে? যদি তার ভেতরকার বাইশ গজে যা ঘটবে তা কুৎসিত হয়। এখনই বরং ক্রিকেট টিমের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া উচিত অপারেশন ২০৩১। একটা ক্রিকেট কাঠামো নতুনভাবে তৈরি করে তার রূপায়ণে সময় লাগে। রোম যেমন রাতারাতি তৈরি হয়নি, তেমনি একটা ক্রিকেট টিমও এক সপ্তাহে ডানা মেলে দাঁড়াতে পারে না।
২. আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখন যে চেহারায় নিয়ত বিবর্তিত হচ্ছে তার চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া অপেশাদার কাঠামোসংবলিত উপমহাদেশীয় ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষে সম্ভব নয়। ভারতের মতো ধনী এবং শক্তিশালী ক্রিকেট বোর্ড যখন পারে না, বাংলাদেশ সেটা সহজেই করে ফেলবে এমন ভ্রমাত্মক ধারণায় আচ্ছন্ন থাকার মানে হয় না। বরং ফ্র্যাঞ্চাইজিরা যদি স্থানীয় প্লেয়ার তৈরির মাধ্যমে সাহায্য করে, সেটা জাতীয় দলেরই কাজে আসে। মনে রাখবেন জাসপ্রিত বুমরা এবং হার্দিক পান্ডিয়া দুজনকেই তুলে এনেছে মুম্বই ইন্ডিয়ানসের স্পটাররা। প্রথমজনকে জন রাইট এবং পরের জনকে কিরণ মোরে। তার ফসল তুলছে ভারতীয় বোর্ড।
৩. সাকিব আল হাসানের গুরুত্ব রাতারাতি কমিয়ে আনা। ক্যাপ্টেন্সি থেকে তিনি নিজে যাওয়ার আগে সসম্মানে অব্যাহতি দেওয়া। সাকিব পর্যায়ের কোনো ক্রিকেটার টিমে থাকলে সে বাড়তি গুরুত্ব পাবেই। কিন্তু পরিচালক গোষ্ঠীর মাথায় রাখতে হবে টেন্ডুলকার, লারা বা বোথামরা ক্যাপ্টেন হিসেবে অসাফল্য। মহাতারকা আর মহা অধিনায়ক দুটো এক সরণি হাঁটবেই তার কোনো মানে নেই। ভিভকে একবার ক্রিস গেইলের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে সমালোচনা করতে শুনেছিলাম। লোকেশনটা আজও মনে আছে। পার্ক সার্কাস ব্রিজ থেকে নামার সময়। কেন মনে আছে? কারণ গাড়ির আরেক আরোহী ছিলেন স্টিভ ওয়াহ। একটা ডিনারে ওদের নিয়ে যাচ্ছিলাম। ভিভকে বলার চেষ্টা করছিলাম যে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লে কী আসবে-যাবে? ফ্র্যাঞ্চাইজি দুনিয়ায় ক্রিস গেইল এখন সুপার হিরো। ভিভ বলেছিলেন, ‘দুটো সিরিজ বাদ পড়লে জানবে দেশের হয়ে খেলা কতটা গর্বের। টাকা তো ওর চেয়ে আমার দেশের শিল্পপতির বেশি আছে। কিন্তু শিল্পপতির যা নেই তা হলো ওর বুকের ক্রেস্ট।’ ঘাড় নেড়েছিলেন স্টিভ, ‘ওই থলেটা তুমি পাচ্ছ দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে বলে।’ সাকিবকে সাময়িক আত্মসংশোধনের সময় দিলে টিম আর কত খারাপ খেলবে? ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ টিমকে আমরা সাকিব ছাড়া এই বিশ^কাপে লড়তে দেখেছি। লড়াই তো করেছে।
৪. বিশ্ব ক্রিকেটের কোনো বড় নাম নিয়ে আসা যিনি উজ্জ্বল তারা এবং একই সঙ্গে চিন্তাভাবনায় দিশারী। দ্রুত কোনো রুটম্যাপ অনুসরণ করতে হবে, যিনি হদিস দিতে পারবেন। নমুনা চাই? কপিল নন, কুম্বলে। গাওয়ার নন, হুসেন। আকরাম নন, মিসবাহ। রোহিত নন, ধোনি। অরবিন্দ নন, সঙ্গকারা। লক্ষ্মণ নন, সৌরভ। বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবার আগে চাই দিশা। হাথুরুসিংহে মাইনে করা ভালো কোচ হতে পারেন। কিন্তু তেমন স্টেনোগ্রাফার দিয়ে এই মুহূর্তে চলবে না। ক্রিকেটার এবং গভীর মননশীল কাউকে চিফ মেন্টর হিসেবে চাই। মাশরাফী রোডম্যাপ অনুসরণের জন্য মানুষ হিসেবে খুব উপযুক্ত। কিন্তু ক্রিকেট কাঠামোর রোডম্যাপ তৈরির জন্য বিদেশি অন্য কাউকে লাগবে। বিরাট নাম এবং একই সঙ্গে যার মধ্যে আধুনিক চিন্তার ঘরানা রয়েছে। যে জানে কী করে প্লেয়ার তৈরি করতে হয়। কীভাবে বিজ্ঞানসম্মত ট্রেনিং আজকালকার দিনে হচ্ছে।
৫. জো বার্গ-মুম্বই যে ফ্লাইটের কথা শুরুতে লিখেছি তাতে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত সৌরভ-ডালমিয়ারা মিলে নিয়েছিলেন। জাতীয় ক্রিকেট একাডেমিকে সর্বশক্তি দিয়ে মান্যতা দেওয়া। আজ যত দিন যাচ্ছে তার ফসল তুলছে ভারত। মিরপুর স্টেডিয়ামে যে ক্রিকেট একাডেমি রয়েছে তার সম্পর্কে যতটুকু শোনা, এর সর্বাত্মক সংস্কার দরকার। শুধু বড় নাম ভাড়া করলে হবে না। তার উপযুক্ত সহকারীও বিদেশ থেকে আনতে হবে। আইটির ঠিকঠাক লোক চাই। চাই ঠিক সাইড আর্ম থ্রোয়ার। ভারতীয় দলে এখন এই থ্রোয়ারের সংখ্যা চার। আধুনিক ক্রিকেটে থ্রোয়িং প্র্যাকটিস এতটাই গুরুত্বপূর্ণ। চাই এমন মাপের ফিজিও, যাকে তারকারা টিমের সঙ্গে রাখতে চাইবে। কিন্তু বোর্ড তাকে জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির বাইরে ছাড়বে না। কারণ সেখানে অনেক বেশিসংখ্যক পেশাদারকে সে সাহায্য করতে পারবে। অনেকের মনে হবে বাংলাদেশ তো এত কিছু না করেও অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে দারুণ করেছে। গত বিশ্বকাপে চমকপ্রদ খেলেছিল। তখন তো এসবের প্রয়োজন হয়নি। উত্তর খুব সহজ। অনেক কিছু সিস্টেম না থেকেও সহজাতভাবে চলে। ভারত তো কোনো সিস্টেম ছাড়াই দৌড়বিদ মিলখা সিং তৈরি করেছিল। কিন্তু আজ এশিয়ান গেমসে এত ভালো ফল করছে, কারণ সে এত বছর ধরে চেষ্টার পর হালফিল সুসংহত স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া তৈরি করতে পেরেছে। কারখানা ছাড়াও মাল তৈরি হয়। কিন্তু তার জোগান কখনো ধারাবাহিক হতে পারে না।
৬. বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কখনো বিপর্যয়ে দায়িত্বমুক্ত হতে পারে না। খুব পরিষ্কারভাবে বলছি, সাকিবদের হারের দায় একমাত্র সাকিবের নয়। বাংলাদেশের সেরা আন্তর্জাতিক ভাষ্যকার এবং বন্ধু আতহার একমত হবে না। কিন্তু যে দেশে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী টিমের সঙ্গে এত প্যাশন নিয়ে যুক্ত থাকেন, যে দেশের মানুষ বেঁচে থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছে, তার ক্রিকেট পরিচালনা আরও আধুনিকমনস্ক মনন দাবি করে। নাজমুল হোসেন পাপন প্রায় পনেরো বছর ক্রিকেট প্রশাসন চালিয়েছেন নানা ঝড়ঝাপটা সামলে। এখনো চালাচ্ছেন। এবার তারও হয়তো ভাবার সময় যে আস্কিং রেট যখন পনেরোর কাছাকাছি, তখন ম্যাচ জেতানোর লোক কি আমি? না এমন কেউ যে করপোরেটেও সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দিতে পারে? আজকের দুনিয়ায় ক্রীড়া প্রশাসকের ভূমিকা এত গুরুত্বপূর্ণ যে প্লেয়ারের মতো তাকেও একটা সময় পর ভাবতে হয় আর কি দৌড়াব?
আশাহত বাংলাদেশ ক্রিকেট সমর্থকদের নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে ২০২৩ বিশ্বকাপ বড় বিষাক্ত স্বাদ দিয়ে গেল। কিন্তু ভবিষ্যৎ হয়তো একেই তার ক্রিকেটমন্থনের দিকনির্দেশকারী সময় হিসেবে মান্যতা দেবে। যেমন জো বার্গ-মুম্বই কুড়ি বছর আগের সেই ফ্লাইটে সহযাত্রী ক্ষুদ্র অংশটা আজও দেয়!