বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের (এসইএআরও) পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম কোনো বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এই পদে নির্বাচিত হলেন। আগামী পাঁচ বছর এই পদে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।
গতকাল বুধবার ভারতের নয়াদিল্লিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে এই পদে ভোটাভুটি হয়। ওই পদের জন্য সায়মা ওয়াজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নেপালের ড. শম্ভু প্রসাদ আচার্য। নির্বাচনে ড. সায়মা ওয়াজেদ আট ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন মাত্র ২ ভোট।
বর্তমানে আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে এখন দায়িত্ব পালন করছেন ভারতের পুনম ক্ষেত্রপাল। সায়মা ওয়াজেদ দায়িত্ব গ্রহণ করলে তিনিই হবেন প্রথম বাংলাদেশি যিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হলেন। এর আগে বাংলাদেশের কেউই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক প্রধান পদে নির্বাচিত হননি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে মোট ১১টি দেশ প্রতিনিধিত্ব করে। এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞার কারণে মিয়ানমারের সদস্যপদ স্থগিত রয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে সরকার সায়মা ওয়াজেদকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন দেয় ও প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের প্রার্থীকে সমর্থন দেয়। সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের এই বিজয় বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কর্মরত ব্যক্তিত্বরা।
নির্বাচিত হওয়ার খবরটি সায়মা ওয়াজেদ তার টুইটারে জানান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত করায় আমি ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ধন্যবাদ জানাই। আমাদের অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যে অবদানের জন্য আমি বিদায়ী পরিচালক ড. পুনম ক্ষেত্রপাল সিংয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওয়েবপেজে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরবর্তী আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। সংস্থার সদস্য দেশগুলো তাকে নির্বাচিত করে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ২০২৪ সালের ২২-২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় ডব্লিউএইচওর ১৫৪তম অধিবেশনে এই মনোনয়ন জমা দেওয়া হবে। নবনিযুক্ত আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ আগামী ১ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গতকাল দুপুরে তার দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ আমরা একটা সুখবর পেয়েছি। খুবই সুখবর। আমরা অনেক দিন ধরেই এ নির্বাচনের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।’
নির্বাচিত হওয়ার পরপরই নয়াদিল্লি থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, সুখবর বাংলাদেশ! সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) এর আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ৮-২ ভোটে নির্বাচিত।
প্রথম কোনো বাংলাদেশি হিসেবে এই পদে নির্বাচিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। গতকাল তিনি এক অভিনন্দন বার্তায় বলেন, ড. সায়মা ওয়াজেদ নির্বাচিত হওয়ায় এ অঞ্চলের দেশসমূহে জনস্বাস্থ্য নীতি ও অনুশীলনে তার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করতে পারবেন। বাংলাদেশের জনগণসহ সমগ্র বিশ্বের মানুষ বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।
অভিনন্দন জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ড. সায়মা ওয়াজেদের এই পদে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে ‘বাংলাদেশের পক্ষে অসামান্য অর্জন’ বলে অভিহিত করা হয়।
অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বিষয়ক বাংলাদেশ জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা প্যানেলেরও সদস্য। বাংলাদেশে অটিজম-আক্রান্ত ব্যক্তিদের মুখপাত্র হিসেবে উদ্ভাবনী কাজের জন্য ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ‘অটিজম-বিষয়ক শুভেচ্ছা দূত’ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
এসইএআরও-এর আঞ্চলিক পরিচালক পদে বাংলাদেশ সরকারের মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে এ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য নীতি ও অনুশীলনে তার দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করার পরিকল্পনা করবেন তিনি। আমি অংশীদারত্বে কাজ করতে বিশ্বাসী এবং কমিউনিটির কথা শুনে স্থায়ী সমাধান তৈরি করতে আগ্রহী। এটি আজ পর্যন্ত আমার কাজকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে এবং এটি আমি এই ভূমিকায় নিয়ে আসব বলে আশা করি।’
সায়মা ওয়াজেদ ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে স্নাতকোত্তর করেন। ২০০৪ সালে স্কুল সাইকোলজির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি পান। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। তার সেই গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সস থেকে ‘শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম এবং স্নায়বিক জটিলতা নিয়ে কাজ করছেন সায়মা ওয়াজেদ। ২০১১ সালে ঢাকায় অটিজমবিষয়ক প্রথম দক্ষিণ এশীয় সম্মেলন আয়োজনের মূল ভূমিকায় ছিলেন তিনি। ২০১৩ সাল থেকে ডব্লিউএইচওতে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। ২০১৪ সালে সংস্থাটি তাকে ডব্লিউএইচও এক্সিলেন্স পুরস্কারে ভূষিত করে।
গত আগস্টে চ্যাথাম হাউজের গ্লোবাল হেলথ প্রোগ্রামের একজন সহযোগী ফেলো হিসেবে যোগ দেন সায়মা ওয়াজেদ। ২০২২ সাল থেকে তিনি সেখানে ইউনিভার্সাল হেলথ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
