যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হয়, একটি দেশের শিল্পের অবকাঠামোর মেরুদণ্ড ততটাই ভেঙে পড়ে। আবার যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শরণার্থীদের দেশে ফেরার সম্ভাবনা কমে যায়। যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইউক্রেন তাদের বড় শহরগুলো সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নটি সামনে আসছে। তারা তাদের অর্থনীতি সচল রাখতে পারবে কি না কিংবা স্বাধীন একটা সরকার বজায় রাখতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পশ্চিমারা যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটা তারা কবে পাবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো একটা মন্দা ও বাজেট ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ইউক্রেনের পুনর্গঠন ব্যয় নিশ্চিত করেই আরও অনেক বেশি বাড়বে। আর বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ইউক্রেন পুনর্গঠনের জন্য প্রতিশ্রুত সহযোগিতা ছাড় করতে কয়েক দশক সময় লেগে যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপে শান্তির ধারণাটিই মূল মনোযোগ পেয়েছে।
মূলত দুই ধরনের নৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ইউরোপ গড়ে উঠেছে। প্রথম নৈতিক ব্যবস্থাটি হলো অ্যাগোরা, যা প্রাচীন গ্রিসের বাজার ও সমবেত হওয়ার স্থানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে আমাদের যা কিছু আছে, তা অন্যদের সঙ্গে বিনিময় করে আমরা আরও বেশি কিছু অর্জন করব। আমরা পণ্য, ভাবনা, জিনিসপত্র, গল্প ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করি। অ্যাগোরা ইতিবাচক একটি বিনিময়ব্যবস্থা, যেখানে সবাই জিততে পারে। রাশিয়া এখন ইউরোপের সঙ্গে একটা যুদ্ধে লিপ্ত। এই বাস্তবতাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার সময় এসেছে। ২০০৩ সালে দার্শিনব ইয়েগেন হ্যাবেরমাস ও জ্যাক দেরিদা জার্মানি ও ফ্রান্সের কয়েকটি শীর্ষ পত্রিকায় একটি যৌথ নিবন্ধ প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসনের সমালোচনা করে তারা ইউরোপীয়দের এ যুদ্ধ থেকে বাধ্যতামূলক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সাম্রাজ্যবাদী আকাক্সক্ষা নিয়ে হ্যাবেরমাস ও দেরিদার সমালোচনা ছিল যৌক্তিক। সেই লেখায় তারা বলেছিলেন, সাম্রাজ্য-উত্তর ভবিষ্যৎ বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে ইউরোপ। এটি অত্যন্ত সুন্দর ধারণা। কিন্তু আজ যখন ইউক্রেনের ওপর রাশিয়া আগ্রাসন চালাচ্ছে, তখন হ্যাবেরমাস ও দেরিদার বলা সেই সাম্রাজ্য-উত্তর বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করা বাস্তবে কতটা সম্ভব? হ্যাবেরমাস ও দেরিদা এমন একটা ইউরোপের কল্পনা করেছিলেন, যে ইউরোপ সংলাপ, পারস্পরিক আলাপ ও সব ধরনের ভিন্নতাকে আলিঙ্গন করে সামনে এগিয়ে যাবে। এটা নিশ্চিতভাবেই মর্যাদাকর একটি ধারণা। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ধারণা মন্দ কিছুর মুখোমুখি হলেই ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় নৈতিক ব্যবস্থাটি হলো অ্যাগন। এটি হলো যুদ্ধক্ষেত্র। আমরা অ্যাগনে প্রবেশ করি বিনিময় করার জন্য নয়, লড়াই করার জন্য। আমরা এখানে জয়ের স্বপ্ন দেখি, কিন্তু পরাজয়ের জন্যও আমরা প্রস্তুত থাকি।
এ ক্ষেত্রে এরও জয়, ওরও জয় এ রকম কোনো সমাধান সম্ভব নয়। কেননা, একটি পক্ষকে অবশ্যই পরাজিত হতে হবে। হ্যাবেরমাস ও দেরিদার মধ্যে দার্শনিক চিন্তায় পার্থক্য থাকলেও তারা দুজন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একই ভাবনা তুলে ধরেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন, যুদ্ধকে হটিয়ে বিনিময় প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, তারা যে সমস্যা ধরতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন তা হলো, যুদ্ধ ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। সম্ভাব্য আক্রমণকারীর হাত থেকে নগর রক্ষার জন্য দুর্গ নির্মাণ না করে তাদের সঙ্গে অনন্তকাল ধরে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া যায় না। তারা দুজন ইউরোপকে যেভাবে গড়ে তোলার কল্পনা করেছেন, সেটা নিষ্পাপ কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। এর ২০ বছর পর আমরা একটা ভিন্ন বাস্তবতায় বাস করছি। গণতন্ত্র এখন সরাসরি সাম্রাজ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে না। এখন সাম্রাজ্যই গণতন্ত্রকে আক্রমণ করছে। এই সাম্রাজ্য ও এর কর্র্তৃত্ববাদী মিত্ররা দেখেছে যে গণতান্ত্রিক শিবির দুর্বল আর অরক্ষিত। আর তারা তাদের সেই অ্যাগন বা যুদ্ধের চেতনা হারিয়েছে। সে কারণে, তাদের আক্রমণ ও ধ্বংস করার সুযোগ এসেছে। ৫ অক্টোবর সোচিতে ভলদাই ডিসকাশন ক্লাবে দেওয়া বক্তব্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন যুদ্ধে তার লক্ষ্য কী, সেই রূপরেখা প্রকাশ করেন। তিনি নতুন ভূখণ্ড অধিকারের চেয়ে দনবাস ও ক্রিমিয়াতে সংঘাত থেকে জনসাধারণকে রক্ষা করার কথা বলেন। পুতিনের এই বক্তব্যের মানে এই নয় যে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে রাশিয়া কেবল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ডের জনসাধারণকে রক্ষা করার কাজটিই করবে। ইউক্রেন যদি যুদ্ধ অব্যাহত রাখে, তাহলে বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এখন যে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে, তার থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, ইউক্রেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে, সামরিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হতে পারে, সরকার উৎখাতও হতে পারে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারবে সেটা নিয়েও সন্দিহান অনেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে যুদ্ধকে প্রলম্বিত না হতে দিয়ে একটা বন্দোবস্তের চেষ্টা করা। অনেকে মনে করেন, যত দিন পর্যন্ত সময় লাগুক, যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়া হবে বাইডেনের এই অঙ্গীকারের পেছনে আগামী নির্বাচনে তার প্রচারণার বিষয়টি রয়েছে। কিন্তু জনমত বলছে, এই কৌশল ভুল। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এখন পর্যন্ত ইউক্রেনকে একটা মাত্রায় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল বদলে যায়, সে রকম সমর্থন তারা করবে, সেটা ভাবা ঠিক হবে না। আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে, পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া দেশগুলো গোলাবারুদ ও অন্যান্য সামরিক রসদের ঘাটতিতে পড়েছে। এই সরবরাহ ঘাটতি বহুমুখী সমস্যা তৈরি করছে। যেমন: নিজেদের মজুদ থেকে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করায় ন্যাটো দেশগুলোর নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধে নামতে পারছে না। এর কারণ তাতে করে সাধারণভাবে ইউরোপীয় যুদ্ধ শুরু হবে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগেই র্যান্ড ও অন্যান্য থিংকট্যাংক বলেছিল, রাশিয়ার আক্রমণ থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা কঠিন হবে এবং এতে ইউরোপের পতন ঘটতে পারে। এখন আক্ষরিক অর্থেই ন্যাটোর গোলাবারুদ শেষ হয়ে এসেছে। ফলে পরিস্থিতি আরও অনেক শোচনীয়। ইউক্রেন যুদ্ধ ন্যাটোর বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের মানে হলো ইউরোপের ওপর আক্রমণ। রাশিয়া এখন ইউরোপের সঙ্গে একটা যুদ্ধে লিপ্ত। এই বাস্তবতাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার সময় এসেছে। বিনিময় নৈতিকতা এখন যথেষ্ট নয়।
অনন্ত শান্তি ও সীমাহীন বিনিময় ইউরোপ মহাদেশের এই ধারণার পেছনে একটি লুকানো ভণ্ডামি আছে। বাস্তবে সেটা ন্যাটোর নিরাপত্তা ছাতার নিচেই অর্জন করা সম্ভব। ইউরোপীয়দের লক্ষ্য যদি হয় একটি সাম্রাজ্য-উত্তর বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করা, তাদের অবশ্যই ২০০৩ সালে ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসনের সঙ্গে ২০০৮ সালে জর্জিয়ায়, ২০১৪ সালে ইউক্রেনে, ২০১৫ সালে সিরিয়ায় এবং ২০২২ সালে আবার ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের তুলনা করতে শিখতে হবে। দুইয়ের মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ২০০৩ সালের যুদ্ধ ছিল গণতন্ত্রের নিজেই নিজেকে প্রতারিত করার ফল। সেটা ছিল মোহনীয় সব গণতান্ত্রিক বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী আকাক্সক্ষাকে লুকিয়ে রাখার ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতিয়ে পড়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন মিরশেইমারের কথা মনে করায়। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে করা মন্তব্যের কারণে তাকে ভøাদিমির পুতিনের অন্যায়ের সাফাই গাওয়া এবং রুশ প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে তিনি আসলে সত্য বলেছিলেন। খুব মৌলিক কিছু ধারণার ভিত্তিতে তিনি এই যুদ্ধের উপসংহারে পৌঁছেছিলেন। এই যুদ্ধের সমাধান বিবদমান পক্ষগুলোর সবার জন্য সমান ফলপ্রসূ হবে না। ন্যাটোতে ইউক্রেনের সদস্যপদ লাভ রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়। যখন গাজার ইস্যুটি সামনে এলো, তখন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা উধাও হয়ে গেল। চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্য জড়িয়ে পড়াটা সবার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। সবাই এখন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, দেখার অপেক্ষায়। হিজবুল্লাহ কি যুদ্ধে জড়াবে? যদি ইসরায়েল হামাসকে নিশ্চিহ্ন করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ে, তারা কি ইরান পর্যন্ত যাবে? যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভাব্য সবকিছুই ভাবতে হচ্ছে। এ কারণে ইউক্রেন ইস্যু এখন পেছনে পড়ে গেছে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
