বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য টমাস জেডেচভস্কি।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভাবমূর্তি এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ক্ষুন্ন করার জন্য অপপ্রচারের প্রচারণা ছিল আলোচনার মূল বিষয়।
বক্তারা সুস্থ গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য ইইউ ও বাংলাদেশের মধ্যে দৃঢ় বন্ধুত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোচনা করেন এবং জোর দেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, কূটনৈতিক, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশের সুশীল সমাজের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।
বক্তাদের মধ্যে ছিলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাধারণ মানুষের আইনের মাধ্যমে ক্ষমতায়নের (ইএলসিওপি) চেয়ারম্যান ডক্টর মিজানুর রহমান, স্টাডি সার্কেল লন্ডনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, অক্সফোর্ড ম্যাট্রিক্সের রায়হান রশীদ এবং টমাস জেডেচভস্কি।
স্বাগত বক্তব্যে আলোচনার আয়োজক টমাস জেডেচভস্কি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি গর্ব করে বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৯.৫ শতাংশ ইইউ থেকে আসে এবং তারা একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শিল্প অর্থনীতিতে রূপান্তরের বড় অংশ।
তিনি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার বাঘ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে ইইউ চিন্তা করছে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে সাহায্য করার এবং বছরের পর বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের ইতিবাচক উন্নয়নগুলো সবাইকে জানানো।
টমাস জেডেচভস্কি আলোচনার সহ-উপস্থাপক সৈয়দ মোজাম্মেল আলীকে তার মতামত জানাতে আমন্ত্রণ জানান।
মোজাম্মেল আলী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বিশ্বব্যাপী অগ্রগতি তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিকে ঘিরে অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছিল যা ইউরোপীয় ইউনিয়নেও সমালোচনা তৈরি করেছিল।
তিনি আরও বলেন, মূলত বাংলাদেশের অধিকাংশ খবরই সঠিক তদন্ত ও সূত্র ছাড়াই প্রচার করা হচ্ছে। গণমাধ্যমগুলো কখনই তথ্যের বৈধতায় ক্রস-চেক করে না। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অধিক শক্তি প্রয়োগ করার কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং এটি প্রতিটি দেশের জন্য খুব সাধারণ, এটি এমন নয় যে বাংলাদেশই এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করছে। আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন। তবে সরকার যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
এরপর ড. রায়হান রশীদ বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে তার মতামত তুলে ধরেন।
ড. রশিদ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস দিয়ে শুরু করে বলেন, মানবাধিকার আন্দোলনই প্রথম এই দেশকে সৃষ্টি করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সাংবিধানিক মূল্য দিয়ে জনগণের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব দিয়েছে। তারপর দেশটি মানবাধিকার সংক্রান্ত বহুসংখ্যক আন্তর্জাতিক কনভেনশনের পক্ষ হয়ে ওঠে। এমনকি ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য বাংলাদেশ সীমান্ত উন্মুক্ত করেছে, যা তাদের জাতীয়তা নির্বিশেষে জনগণের অধিকার সুরক্ষিত করার প্রতিশ্রুতিও চিহ্নিত করেছে। তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ হওয়ায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ছিল মাত্র ৪৯.৫ শতাংশ এবং এখন এই হার ৮৫.৮৫ শতাংশ।
ডা. রায়হান রশীদের বক্তব্যের পর অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান তার মতামত তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের অধিকারও একটি মূল্যবান মানবাধিকার। দেশটি শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ নির্মূল, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে মানবাধিকারের প্রশ্নটা অনেক আগেই উত্থাপিত হওয়া উচিত ছিল যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তারপর প্রায় ২১ বছর ধরে খুনিরা মুক্ত ছিল এবং কোনো প্রকার বিচার হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি মানবাধিকারের উন্নয়ন করেছে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য পশ্চিমা মিডিয়ার আলোচনায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভুয়া খবর প্রচার করে প্রপাগাণ্ডা ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
আলোচনার পর উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এনজিও, আইএনজিও, সমাজকল্যাণ কর্মী, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিরা ছিলেন। উন্মুক্ত আলোচনা অধিবেশনের পর, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে সাহায্য করার অঙ্গীকার নিয়ে আয়োজক টমাস জেডেচভস্কি আবারও সেশনে উপস্থিত থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
