মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েকদিনের চলমান শ্রমিক অসন্তোষে কারখানা কর্তৃপক্ষের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনের কারখানা খরচের পাশাপাশি বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় এরইমধ্যে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে মালিকপক্ষের পাশাপাশি শ্রমিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করছেন শ্রমিক নেতারা। তাই শিগগিরই বিষয়টি সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
শনিবার সকাল আটটার দিকে জিরাবো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সিনহা নিট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কারখানার সামনের ফটকে স্কচটেপ দিয়ে কারখানার কয়েকজন নিয়োগ বন্ধের নোটিশ লাগাচ্ছিলেন। একই ফটকে আগে থেকে ঝোলানো ছিল কারখানা বন্ধের ঘোষণা। নিশ্চিন্তপুর এলাকায় নিউএইজ গ্রুপের কারখানাগুলো, নরসিংহপুর এলাকায় হা-মীম গ্রুপের কারখানাগুলোতেও একই নোটিশ দেখা গেছে।
হা-মীম গ্রুপের নারী শ্রমিক জুলেখা আক্তার বলেন, মালিকরা কারখানা বন্ধ করেছে, আবার মন চাইলে খুলে দেবে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী হেলপারদের বেতন ১৭ হাজার এবং অপারেটরদের বেতন ২৩ হাজার টাকা করতে হবে। আর যদি তা না করা হয় তাহলে কোম্পানি থেকে আমাদের সার্ভিস কোয়ার্টার খুলে দিক। লাঞ্চের ব্যবস্থা করে দিক আর দ্রব্যমূল্যের দাম কমিয়ে দিক। এগুলো করলেই আমাদের চলবে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এস এম মান্নান কচি বলেন, ‘যতদিন পরিস্থিতি শান্ত না হবে, ততদিন কারখানা বন্ধের পাশাপাশি নিয়োগও বন্ধ থাকবে।’
বিজিএমইএ’র এই সিদ্ধান্তকে শ্রমিকদের ওপর চাপ হিসেবে দেখছেন এই খাতের শ্রমিক নেতারা। তারা বলছেন, এভাবে কারখানা বন্ধ, বেতন বন্ধ নীতি নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য লীগের সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার হোসেন বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের জেরে বন্ধ ঘোষণা করা ১৩০টি কারখানায় কমপক্ষে দুই লাখ শ্রমিক কর্মরত আছেন। ১৩ (১) ধারায় কারখানা বন্ধ হওয়ায় আমরা শ্রমিক নেতারা উদ্বিগ্ন। আমরা চাই শিল্পের চাকাও ঘুরুক, শ্রমিকেরাও বাঁচুক। তাই মালিক পক্ষকে দ্রুত সমস্যার সমাধান করে কারখানা খুলে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
দি রোজ ড্রেসেস লিমিটেড কারখানার ম্যানেজার সাধারণ কুমার দে বলেন, চলমান শ্রমিক আন্দোলনে গত কয়েকদিন ধরে শ্রমিকরা ঠিকমতো কাজ করছে না। কারখানায় এসে হাজিরা দিয়ে চলে গেছে। বহিরাগতদের সহায়তায় উশৃঙ্খল শ্রমিকরা কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর করেছে। যে কারণে কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন আমাদের শুধুমাত্র কারখানা খরচ রয়েছে ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে কারখানায় প্রচুর কাজ থাকলেও গত কয়েকদিনে শ্রমিকরা কাজ না করায় আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে সময়মতো বায়ারের অর্ডার অনুযায়ী কাজ সরবরাহ সম্ভব হবে না। তাতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন শুধুমাত্র পুলিশ দিয়ে দমন করা সম্ভব নয়। শ্রমিক এবং মালিকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়, মজুরি বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তর রয়েছে। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কোনো ভূমিকা লক্ষ করা যায়নি। বর্তমানে কারখানাগুলোতে কাজ রয়েছে এবং শ্রমিকদেরও কাজ করার ইচ্ছা আছে। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান, যত দ্রুত সম্ভব শ্রমিক ও মালিকদের সাথে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করতে হবে।
অন্যদিকে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মুখে কারখানায় ভাঙচুর, লুটপাটে ক্ষয়ক্ষতির বিষয় উল্লেখ কর শতাধিক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচটি মামলায় চারজনকে আটক করা হয়েছে।
