বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নির্বাচন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই সবাই উন্মুখ হয়ে ছিলেন নির্বাচন নিয়ে। তবে নির্বাচন নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান দুই রকম। সরকারি দল সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। তবে বিএনপি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বিএনপি সরকার পতনের একদফা দাবিতে আন্দোলন করছে। তবে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এগিয়ে যাচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর দৃশ্যত যাত্রা শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী ট্রেনের। এখন সেই ট্রেনের যাত্রী কারা হবে, কৌতূহল তা নিয়েই।
নির্বাচন এলেই তার আগে অনেকগুলো বিশেষণ জুড়ে দিই আমরা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব একটি ভালো নির্বাচন করা। কিন্তু তাদের পক্ষে এই সবগুলো শর্ত পূরণ করা সম্ভব নয়, এটা তাদের এখতিয়ারও নয়। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব। তাদের যে সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা, তাতে এই চারটি শর্ত পূরণ তারা করতেই পারে। এ জন্য দরকার শুধু আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা। কিন্তু অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হওয়ার পরও সেটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নয়, এটা রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব। যত শর্তই পূরণ হোক, এমনকি অংশগ্রহণমূলক হলেও তা যে গ্রহণযোগ্য হবে না, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশের ইতিহাসে নেই। নির্বাচন যত ভালোই হোক, পরাজিত দলের কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে না। ৯১, ৯৬, ২০০১ বা ২০০৮ সালের নির্বাচন সাধারণভাবে নাগরিক সমাজ গ্রহণ করলেও পরাজিত দল আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কাছে তা গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই এটা আগে থেকেই মেনে নেওয়া ভালো, দেবদূতরা এসে নির্বাচন করলেও বাংলাদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।
তার মানে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ হলেও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। তবে আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বাকি রয়ে গেছে। সেটি হলো, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এখন প্রশ্ন হলো, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে কী? একসময় সব রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি চাইলেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন। কিন্তু নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর এবং স্বতন্ত্র নির্বাচন করার যোগ্যতা নির্ধারণের পর ইচ্ছামতো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোই শুধু নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা এখন ৪৯। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে মোটামুটি তিনটি দলের আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি। জামায়াতে ইসলামীর অল্প কিছু ভোট থাকলেও তাদের এখন নিবন্ধন নেই। বাকি দলগুলোর ভোটার সংখ্যা দশমিকের ভগ্নাংশে সীমাবদ্ধ। কিছু দলের ভোটার মাইক্রোস্কোপ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে কিছু আছে আদর্শিক দল। বাকি অধিকাংশই রাজনৈতিক দোকান। নির্বাচনের সময় নানা মেরুকরণ হয়, ওলটপালট হয়। তখন দরকষাকষি করে বড় দলগুলোর কাছ থেকে দুয়েকটি আসন বাগিয়ে নেওয়াই তাদের রাজনীতির লক্ষ্য। এভাবে অনেকে সংসদ পর্যন্ত চলে গেছেন। আসলে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে কী? নিবন্ধিত সবগুলো দল অংশ নিলেই কি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে? এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। নির্বাচনে সব নিবন্ধিত দল অংশ নেয় না। তবে পরপর দুটি নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ধরুন, সবগুলো দল অংশ নিল, কিন্তু ভোটাররা ভোট দিতে আসলেন না, তাহলে কি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে? তার মানে অংশগ্রহণের কোনো নির্ধারিত সংজ্ঞা নেই।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ও মানদ-ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি অংশ নিলেই কেবল নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা হয়। কিন্তু এই তিনটির মধ্যে কোনো দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে কী হবে? নির্বাচন কমিশন কী করবে? একটু পেছনে তাকাই। ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আমরা কেউ কিন্তু সেটিকে অংশগ্রহণমূলক তো নয়ই, ভালো নির্বাচনও বলি না। সে নির্বাচনে ভোটার তো ছিলই না, প্রার্থীও ছিল না। ১৫৪ আসনে প্রার্থীদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাওয়া নজিরবিহীন ঘটনাই বটে। সেটি আইনগতভাবে বৈধ হলেও নৈতিক মানদ-ে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করলেও বিএনপি ২০১৮ সালে এসে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নেয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বড় সবগুলো দলই অংশ নেয়। তারমানে ২০১৮ সালের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল। কিন্তু এটাও সবাই মানবেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকবে ২০১৮ সালের নির্বাচন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৬টি আসন পেয়েছিল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। আরও অনেক ভালো ফলাফল করার মতো জনপ্রিয়তা বিএনপির রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, বিএনপি ২০১৮ সালে সিরিয়াসলি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। পুলিশ ও প্রশাসন মিলে ২০১৮ সালের নির্বাচন তথা নির্বাচনী ব্যবস্থাকেই কলঙ্কিত করেছে এটা ঠিক। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও বিএনপি খুব ভালো ফলাফল করত এমন মনে হয় না। কারণ বিএনপি ২০১৮ সালে নির্বাচনের অংশ নিয়েছিল মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, নিজেদের নিবন্ধন টিকিয়ে রাখা। কারণ পরপর দুটি নির্বাচন বর্জন করলে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যেত। দ্বিতীয়ত, এই সুযোগে মনোনয়ন বাণিজ্য করে কিছু টু পাইস কামিয়ে নেওয়া। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপির গুলশান অফিসের সামনে মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, সেটা প্রমাণ করা। পুলিশ ও প্রশাসন নিখুঁতভাবে বিএনপির চাওয়া পূরণ করেছে। খারাপ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিএনপি-আওয়ামী লীগের পাল্লা সমান সমান হয়ে গেছে। এখন বিএনপি আবার ফিরে গেছে, তাদের আগের অবস্থানে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না তারা। আওয়ামী লীগও সংবিধানের বাইরে যেতে সম্মত নয়। এখন পর্যন্ত যা অবস্থান তাতে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না। কিন্তু বিএনপি আসবে না বলে কি নির্বাচন কমিশন বসে থাকবে? তাদের সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে এগিয়ে যেতেই হবে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো, একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘেœ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। তাদের পছন্দের প্রার্থী বেছে নিতে পারে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলেও, সমঝোতার সম্ভাবনা ফুরিয়ে যায়নি। এখনো চাইলে রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপে বসে সমঝোতায় আসতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শর্তহীন সংলাপের জন্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিকে চিঠি দিয়েছে। শর্তহীন সংলাপে বসলে কোনো না কোনো উপায় বেরিয়ে আসবে। এমনকি চাইলে সংবিধানের আলোকেও একটা ভালো নির্বাচনের উপায় আসতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কথা বলে আসছে। তারা অংশগ্রহণমূলক বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেনি। দেশি-বিদেশি সবাই ভালো নির্বাচনের পরিবেশ চাইতে পারবেন। কিন্তু বিএনপিকে নির্বাচনে আনা তো কারও দায়িত্ব নয়। আর যত যাই হোক, বাংলাদেশে সংবিধানের বাইরে কোনো নির্বাচনীব্যবস্থার পক্ষে ওকালতি করাও যুক্তরাষ্ট্রের কাজ নয়। যে ব্যবস্থা তাদের নিজেদের দেশে নেই, সেটার কথা তারা বলবে কোন মুখে? একটি অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে সবারই দায়িত্ব তাতে অংশ নেওয়া। নির্বাচন যদি খারাপ হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো পালিয়ে যাচ্ছে না, তারাও দেখবে। এটা আওয়ামী লীগও জানে। ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন করার সুযোগ আর নেই।
এরপরও যদি বিএনপি নির্বাচনে না আসে, তারা যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের বদনাম করতে চায়; ক্ষতি বিএনপিরই হবে। বিএনপি নির্বাচনে না এলেও নির্বাচন কমিশনের এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। শুধু নিশ্চিত করতে হবে, জনগণ যেন উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনে অংশ নেয়।
লেখক: বার্তা প্রধান এটিএন নিউজ
