কক্সবাজারে ট্রেন যোগাযোগ গতি আসবে শিল্পায়নে

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:১০ এএম

নতুন কাজ করতে যত না সহজ, তার চেয়ে অনেক কঠিন পুরনো কাজকে পুনর্নির্মাণ-পূর্বক উপযোগী করে তোলা। চট্টগ্রাম টু কক্সবাজার রেললাইন করতে গিয়ে খুব বেশি ভুগিয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্তদের। কখনো কখনো কাজটি থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়। চট্টগ্রাম টু চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পর্যন্ত আগে থেকেই ৪৮ কিলোমিটারের রেললাইন ছিল। এই লাইনটি ব্রিটিশদের করা। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ১৫০ কিলোমিটার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই লাইনকে সম্প্রসারণ করে সুদূর কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটি এই সরকারই প্রথম গ্রহণ করে। ব্রিটিশ আমলের পুরনো লাইন দিয়ে কক্সবাজারের যোগাযোগ স্থাপন করতে গিয়ে কতবার যে জরিপ কার্য পরিচালনা করতে হয়েছে তার হিসাব নেই। পথে পথে যখন জরিপ কাজ এবং শেষে জায়গা অধিগ্রহণ করা হচ্ছিল, তখন পর্যন্ত কারও বিশ্বাসে ছিল না এই অবিশ্বাস্য ঘটনার আসল রূপটি অতি সহসা ধরা দেবে। এবং একই সঙ্গে চট্টগ্রাম টু দোহাজারী পর্যন্ত পুরনো নড়েবড়ে রাস্তা দিয়ে বৃহৎ পরিসরের ট্রেন চালানো সম্ভব হবে? কারণ আগে থেকে এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন কয়েক জোড়া লক্কড়ঝক্কড় ট্রেন চলাচল করত। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে ট্রেনগুলো এই লেনে চলাচল করত তা যাতায়াত করার উপযোগী ছিল না।

১৯৩১ সালে ব্রিটিশের করা পুরনো জরাজীর্ণ কালুরঘাট সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচলে যে সন্দেহের দানা বেঁধে ছিল পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে সে ভয় আতঙ্ক উপরে ফেলেছে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইনটি ২০১০ সালের ৬ জুলাই এ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায়। কাজ ধরতে গিয়ে জমি অধিগ্রহণ এবং অন্যান্য খাতে বহু পরিমাণ ব্যয় বেড়ে যায়। এ জন্য মাঝখানে কয়েক বছর প্রকল্পের কাজ থমকে দাঁড়ায়। ২০১৭ সাল নাগাদ পুনঃবাজেট অনুমোদন লাভ করলে প্রকল্পটি গতি ফিরে পায়। ২০১৮ সালে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কাজটি ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ করার কথা থাকলেও মাঝখানে কয়েক বছর করোনার কারণে আবারও ধীরগতিতে চলতে শুরু করায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্পের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন করা হয়। ৫ নভেম্বর পরীক্ষামূলক প্রথম পরিদর্শন ট্রেন কক্সবাজার গমন করেন। ট্রেন যাওয়ার পথে মানুষের কী যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস তা বর্ণনাতীত। কেউ কেউ নেচে গেয়ে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে মোবাইলে সেলফি তুলে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ করেছে। এই প্রথম কক্সবাজার অভিমুখে ঘন ঘন ট্রেনের হুইসেল বাজিয়ে যাওয়ার পথে ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষরা তখন ট্রেনের রাস্তায় ওঠে আসে নতুন অতিথিকে সাদরে বরণ করতে। এ যেন বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার! অনেকে এই অতিথিকে এভাবে দেখবে কল্পনাতেও ভাবেনি, তাই অকস্মাৎ ছুঁয়ে চোখেমুখে আনন্দ অশ্রু বর্ষণ করেছে। দর্শনার্থীদের ভিড়ের কারণে সেদিন পরিদর্শক টিম অনেক জায়গায় ঠিকমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হিমশিম খেয়েছে আবার অনেক জায়গায় করতেও পারেনি।

রেললাইন, স্টেশন, সেতু, কালভার্ট নির্মাণে সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহায়তা দিয়েছে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা, বাকি ৪ হাজার ১১ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দিয়েছে। নতুন এই রেললাইন চালু করতে গিয়ে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬৩ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুনভাবে স্টেশন করা হয়েছে ৯টি। নতুন স্টেশনগুলো হলো দোহাজারী স্টেশন, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও সর্বশেষ কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন। আর চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত আগের রেল স্টেশনগুলো ছিল ঝাউতলা, ষোলশহর, জানালীহাট, গোমদ-ী, বেঙ্গুরা, ধলঘাট, খানমোহনা, পটিয়া, চক্রশালা, খানমোহনা, হাসিমপুর, দোহাজারী। সম্প্রতি কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল নির্মিত হয়েছে। এই দুই রোডই দক্ষিণ চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোন্নয়নে বিপুল অবদান রাখবে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা সুদৃঢ় কক্সবাজার-টেকনাফ পর্যন্ত সরকার এবং ব্যক্তি মালিকানায় প্রচুর বড় বড় প্রকল্প ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীতে বৃহৎ বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হয়েছে। কক্সবাজারে বিশে^র দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত তো আছেই। এ ছাড়া চকরিয়া চিংড়ি প্রজেক্ট ও লবণশিল্পের জন্য বিখ্যাত। মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গড়ে তোলা হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র। আছে চুনতী অভয়ারণ্য, ডুলাহাজারা খ্রিস্টিয়ান হাসপাতাল, চন্দনাইশে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, বাঁশখালীতে ইকোপার্ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ফলে টেকনাফ, কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী থেকে খুব সহজে পণ্যসামগ্রী চট্টগ্রাম শহর হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়া আনোয়ারা উপজেলায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার (কাফকো), চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউফল), পারকি বিচ, কর্ণফুলী উপজেলায় কেইপিজেড ও ইয়ংওয়ানের মতো বিশ^বিখ্যাত শিল্পপ্রতিষ্ঠান শতাধিক ফ্যাক্টরি খুলেছে যেখানে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পটিয়া ও বোয়ালখালীতেও বহু গার্মেন্ট শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং টেকনাফ, কক্সবাজার পর্যন্ত বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকলেও যোগাযোগব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। তাই কর্মরত শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা, দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী এবং চট্টগ্রাম শহর তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামে ব্যবসায়ী ও অফিস-আদালতে কর্মরতদের সীমাহীন কষ্টের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। ট্রেন যোগাযোগের ফলে নিশ্চিতভাবেই, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নতুন শিল্পায়নে প্রবল গতি আসবে।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত