চীনে মসজিদ বন্ধ ও ধ্বংস করার অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৫৮ এএম

নতুন এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিযোগ তুলেছে যে চীন মসজিদ বন্ধ বা ধ্বংস করে দিচ্ছে অথবা নিজেদের মত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে পুনর্নির্মাণ করছে।

চীনে ইসলাম ধর্মের চর্চা ও প্রসার রোধ করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই কাজগুলো করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ, এমনটাই অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের।

বুধবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসি।

চীনে প্রায় ২ কোটি মুসলমান রয়েছে, যাদেরকে সরকারীভাবে অধার্মিক অ্যাখ্যা দেয়া হলেও দেশটির কর্তৃপক্ষের দাবি তারা ধর্মীয় স্বাধীনতার অনুমতি দিয়ে থাকে। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কঠোরতা বেড়েছে এবং মুসলিমদের উপর আরও নিয়ন্ত্রণ চাইছে বেইজিং।

চীনের বেশিরভাগ মুসলিম দেশটির উত্তর-পশ্চিমে বাস করে, যার মধ্যে রয়েছে জিনজিয়াং, কিংহাই, গানসু এবং নিংজিয়া।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, নিংজিয়ার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের লিয়াওকিয়াও গ্রামে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছয়টির মধ্যে তিনটি মসজিদের গম্বুজ ও মিনার খুলে ফেলা হয়েছে। বাকি মসজিদের প্রধান প্রার্থনা হল ধ্বংস করা হয়েছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত এক স্যাটেলাইট ফুটেজে দেখা যায় যে, লিয়াওকিয়াও গ্রামের একটি মসজিদে ২০১৮ সালের অক্টোবরে মসজিদের মত একটি গোলাকার গম্বুজ দেখা গেলেও দেখায় সেটি জানুয়ারী ২০২০-এ সেখানে একটি চীনা-শৈলী প্যাগোডা দ্বারা প্রতিস্থাপিত দেখা যায়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের নেতা শি জিনপিং এর কমিউনিস্ট পার্টি তার রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং চীনা সংস্কৃতির সাথে ধর্মকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।

২০১৮ সালে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি একটি নথি প্রকাশ করে যেখানে মসজিদ নিয়ন্ত্রণ এবং একত্রীকরণের কথা উল্লেখ ছিল। নথিতে রাজ্য সরকারগুলিকে মসজিদ "আরো বেশি ভেঙে ফেলা, কম নির্মাণ করা এবং সামগ্রিক সংখ্যা সংকুচিত করার প্রচেষ্টা" করার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

নথিতে মসজিদ নির্মাণ, বিন্যাস এবং তহবিল "কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণের" নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

চীনা মুসলিম পণ্ডিত হান্না থেকার বিবিসিকে জানান, নিংজিয়ায় ২০২০ সাল থেকে প্রায় ১৩০০টি মসজিদ বন্ধ বা ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি এই অঞ্চলের মোট মসজিদের এক তৃতীয়াংশ।

এছাড়া নিংজিয়ার সাথে সীমান্তঘেষা গানসু প্রদেশের কর্মকর্তারা পর্যায়ক্রমে মসজিদগুলো বন্ধ, একত্রিত এবং পরিবর্তন করার ঘোষণা দিয়েছে।

তিব্বত এবং জিনজিয়াং-এ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র ধর্মীয় দমন-পীড়ন ছিল, তবে বর্তমানে তা অন্যান্য অঞ্চলেও প্রসারিত হয়েছে বলছে বিবিসি।

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে জিনজিয়াংয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এছাড়া ২০১৮ সালে, কর্তৃপক্ষ চীনের "লিটল মক্কা" নামে পরিচিত প্রদেশের একটি শহর লিনক্সিয়াতে ১৬ বছরের কম বয়সী বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করা বা পড়াশোনা করতে নিষিদ্ধ করেছিল।

অর্থাৎ "সিনিসাইজেশন" বা  চীনা সংস্কৃতি এবং সমাজকে প্রতিফলিত করার জন্য ধর্মীয় বিশ্বাসকেও রূপান্তর করার জন্য মিঃ শির প্রচেষ্টাকে বোঝায়। এবং নিংজিয়া দিয়েই মূলত চীনের সিনিসাইজেশন করতে চাচ্ছেন দেশটির নেতা।

যদিও চীনা সরকারের দাবি মসজিদগুলির একীকরণ মুসলমানদের উপর অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে সাহায্য করে। তবে কিছু হুই মুসলিম সরকারের দাবির সাথে একমত হলেও কিছু বাসিন্দা প্রকাশ্যে এই "সিনিসাইজেশন" নীতির বিরোধিতা করেছে, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ এখনও পর্যন্ত নিরর্থক।

কয়েক বছর ধরে, মসজিদ বন্ধ বা ভেঙে ফেলার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষের পর অনেককে জেলে পাঠানো হয়েছে বা আটক করা হয়েছে।

চীনে দুটি প্রধান মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। হুই এবং উইঘুর। উইঘুরদের বেশিরভাগই জিনজিয়াং-এ বসবাস করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে মার্কিন ভিত্তিক হুই কর্মী মা জুকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, মসজিদ থেকে বাহ্যিক উপাদানগুলো সরানোর পরে, স্থানীয় সরকার ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপের প্রয়োজনীয় সুবিধা যেমন অজু হল এবং নামাজের মঞ্চগুলি সরিয়ে ফেলে। এরপর মসজিদের মানুষের আনাগোনা কমে গেলেই নানা অজুহাতে এসব মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয় বা ভেঙে ফেলা হয়।  

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া ডিরেক্টর ইলেইন পিয়ারসন বলেছেন, সারা বিশ্বের আরব ও মুসলিম নেতাদের উচিত "চীনকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করা"।

চীনের এমন কর্মকাণ্ডে ও সরকারের প্রচারণায় অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত